বদলে যাচ্ছে বিশ্বের ধর্মীয় মানচিত্র: ২০৫০ সালে কোন ধর্ম হবে সবথেকে শক্তিশালী?

গ্লোবাল ডেমোগ্রাফিক অ্যানালাইসিস

২০৫০ সালে বিশ্বের ধর্মীয় মানচিত্র: ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের সমতা এবং পিউ রিসার্চের ভবিষ্যৎবাণী!

কবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের ধর্মীয় জনমিতিতে আসছে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা থাকলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলে বড় ধরনের রদবদল লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার (Pew Research Center) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০১০ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। Chronicle Point-এর আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব আগামীর সেই বদলে যাওয়া পৃথিবীর চিত্র।

"২০৫০ সালের পৃথিবী হবে ধর্মীয় বৈচিত্র্যে আরও ভিন্নতর। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা প্রায় সমান হবে, যা বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে।"
১. গত এক দশকের রদবদল (২০১০-২০২০)

পিউ রিসার্চের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে বিশ্বের ধর্মীয় দৃশ্যপটে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এসেছে যা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার ২৫.৬% মুসলিম। অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে বৃহত্তম ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও খ্রিস্টানদের হার ৩০.৬% থেকে কমে ২৮.৮%-এ দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় মানুষ দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিমুখ হচ্ছে, যার ফলে 'ধর্মহীন' বা নাস্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন বিশ্ব জনসংখ্যার ২৪.২%-এ পৌঁছেছে।

ধর্মীয় গোষ্ঠী ২০১০ সালের হার (%) ২০২০ সালের হার (%) ২০৫০ সালের প্রজেকশন (%)
মুসলিম ২২.৩% ২৫.৬% ২৯.৭%
খ্রিস্টান ৩১.৪% ২৮.৮% ৩১.৪%*
হিন্দু ১৫.০% ১৪.৯% ১৪.৯%
ধর্মহীন ১৬.৪% ২৪.২% ১৩.২%**
*আফ্রিকায় বৃদ্ধির কারণে সংখ্যা বাড়বে। **বয়স্ক জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে হার কমবে। ২. ২০৫০ সালের প্রজেকশন: যা ঘটবে আগামীর পৃথিবীতে

পিউ রিসার্চের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা হবে প্রায় ২৭৬ কোটি, যা খ্রিস্টানদের (২.৯ বিলিয়ন) প্রায় সমান হবে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই হবেন হয় মুসলিম না হয় খ্রিস্টান। যদি এই বৃদ্ধির হার বজায় থাকে, তবে ২০৭০ সালের পর ইসলাম হবে বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বৃহত্তম ধর্ম।

ভারতের প্রেক্ষাপটে ২০৫০ সাল হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ইন্দোনেশিয়াকেও ছাড়িয়ে যাবে। যদিও দেশটিতে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে, তবুও ভারত হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ। ইউরোপের চিত্রেও বড় পরিবর্তন আসবে; ২০৫০ সাল নাগাদ ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০% হবে মুসলিম।

৩. হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ অবস্থান

বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৪.৯% হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ১.৪ বিলিয়নে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একমাত্র বড় ধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী কিছুটা কমতির দিকে। চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে জন্মহার হ্রাস পাওয়া এবং বয়স্ক জনসংখ্যার আধিক্যই বৌদ্ধ ধর্মের এই নিম্নমুখী হারের প্রধান কারণ।

৪. পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল কারণসমূহ

গবেষকরা প্রধানত দুটি বিষয়কে এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী করছেন:
১. প্রাকৃতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি: মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ জন্মহার এবং তুলনামূলক তরুণ বয়সের আধিক্য তাদের দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
২. ধর্ম পরিবর্তন (Switching): পশ্চিমা বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ধর্মহীন পরিচয় বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তরের হারও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্থিতিশীল রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় কোনো বৈশ্বিক সংঘাত না ঘটলে পিউ রিসার্চের এই পরিসংখ্যানই হতে যাচ্ছে আগামীর বাস্তবতা। সত্যের সন্ধানে Chronicle Point সর্বদা আপনার পাশে আছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ২০৫০ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম কোনটি হবে? উত্তর: ২০৫০ সাল নাগাদ খ্রিস্টান ধর্ম (৩১%) বৃহত্তম থাকলেও ইসলাম ধর্ম (৩০%) প্রায় সমান অবস্থানে পৌঁছে যাবে। তবে ২০৭০ সাল নাগাদ ইসলামই হবে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম।
২. কেন ইউরোপ ও আমেরিকায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমছে? উত্তর: প্রধান কারণ হলো 'রিলিজিয়াস সুইচিং'। পশ্চিমা বিশ্বে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ত্যাগ করে নিজেদের ধর্মহীন বা নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
৩. ভারতে মুসলিম জনসংখ্যার অবস্থান কেমন হবে? উত্তর: ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত হবে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ (ইন্দোনেশিয়াকে ছাড়িয়ে), যদিও ভারতে হিন্দুরাই সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে।
৪. বৌদ্ধ ধর্মের সংখ্যা কেন কমছে? উত্তর: বৌদ্ধ প্রধান দেশগুলোতে (যেমন চীন, জাপান) নিম্ন জন্মহার এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়াই এর প্রধান কারণ।
/* 'async' ব্যবহার করা হয়েছে যাতে মেইন সাইট লোড হতে দেরি না হয় */