আমেরিকা কি সত্যিই ইরানে স্থল অভিযান চালাতে যাচ্ছে? ইরানের 'নিরুয়ে ভিজে' বা স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোরা কেন ১ লক্ষ কবর খুড়ে মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানানোর ঘোষণা দিল? আব্রাহাম লিংকন রণতরীতে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের রণসংগীত নিয়ে হাজির হয়েছে ক্রনিকল পয়েন্ট। বিস্তারিত পড়ুন আমাদের মেগা বিশ্লেষণে।
মৃত্যুকূপ প্রস্তুত: আমেরিকার স্থল অভিযান ও ইরানের স্পেশাল ফোর্সের রণকৌশল
বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে এখন টালমাটাল মধ্যপ্রাচ্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন ইরানের সীমানায় কয়েক হাজার স্পেশাল ফোর্স জড়ো করছে, তখন তেহরান এক অভাবনীয় হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের কিংবদন্তি নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সেই বিখ্যাত উক্তি—"আমরা ১ লক্ষ কবর খুড়ে রেখেছি"—এখন ইরানের প্রতিটি সামরিক ঘাঁটির স্লোগানে পরিণত হয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আকাশপথে তারা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু স্থলপথে তারা মার্কিন সেনাদের জন্য নরক তৈরি করতে প্রস্তুত।
১. 'নিরুয়ে ভিজে': ইরানের সেই রহস্যময় স্পেশাল ফোর্সইরানের সামরিক শক্তির একটি বড় অংশ হলো তাদের স্পেশাল ফোর্স, যা স্থানীয় ভাষায় ‘নিরুয়ে ভিজে’ (Niru-ye Vizheh) নামে পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো ৬৫তম এয়ারবর্ন স্পেশাল ফোর্স ব্রিগেড। এছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) অধীনে রয়েছে আরও কয়েক স্তরের কমান্ডো বাহিনী। এই বাহিনীগুলো গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী এবং পাহাড়ি ও মরুভূমি অঞ্চলে লড়াই করার জন্য কয়েক দশক ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তেহরানের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনারা যদি প্যারাট্রুপার হিসেবে আকাশ থেকে নামে, তবে তাদের নামার আগেই ইরানের স্নাইপাররা তাদের লক্ষ্যবস্তু করবে।
সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা আমেরিকার অহংকার—এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার 'আব্রাহাম লিংকন'-এ সফল মিসাইল হামলা চালিয়েছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ আমেরিকা গোপন রাখছে, কিন্তু উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে রণতরীটি তার নির্ধারিত অবস্থান ছেড়ে সাগরের গভীরে পালিয়ে গেছে। এর আগে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে আরও একটি মার্কিন রণতরী আশ্রয় নিয়েছে। ইরানের কামিকাজ ড্রোন এবং অ্যান্টি-শিপ মিসাইল যেভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে, তা আধুনিক সামরিক ইতিহাসে বিরল। এখন পর্যন্ত আমেরিকা ১টি এফ-৩৫ এবং ৩টি এফ-১৫ ফাইটার জেট হারানোর কথা স্বীকার করেছে, যার আর্থিক মূল্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলার।
৩. তুরস্কের এরদোয়ান ও ইরানের নতুন মিত্রতাবর্তমান সংকটে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ভূমিকা ইরানকে বড় ধরণের স্বস্তি দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে এরদোয়ানকে ‘আমার ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করেছেন। তুরস্ক বর্তমানে কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবকে বুঝিয়ে শান্ত রাখছে যাতে তারা এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষ নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়। এই ভূ-রাজনৈতিক চাল ইরানকে একলা লড়াই করার ঝুঁকি থেকে অনেকাংশে রক্ষা করেছে।
Chronicle Point এর বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও নিজস্ব বিশ্লেষণ
ক্রনিকল পয়েন্টের ইনভেস্টিগেটিভ টিম ৩টি বিশেষ কৌশল চিহ্নিত করেছে:
- কবর কৌশলী যুদ্ধ: ইরান জানে তারা আকাশপথে মার্কিন প্রযুক্তির সাথে পারবে না, তাই তারা যুদ্ধকে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং স্থল গেরিলা যুদ্ধে রূপান্তর করছে।
- মনস্তাত্ত্বিক চাপ: ১ লক্ষ কবর খুড়ে রাখার ঘোষণাটি মূলত মার্কিন সেনাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা।
- ডলার বনাম ইউয়ান: সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান এখন তেলের বাজারে ডলার বর্জন করে আমেরিকার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙার চেষ্টা করছে।
ক্রনিকল পয়েন্ট মনে করে, ট্রাম্পের 'এক পা আগানো এবং তিন পা পেছানো' নীতি প্রমাণ করে যে আমেরিকাও একটি রক্তক্ষয়ী স্থল যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কিত।
ইরান আবারও ইসরাইলের পারমাণবিক শহর ডিমোনার নিকটবর্তী রোটেম শিল্পাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই এলাকায় ইসরাইলের ফসফেট এবং অ্যামোনিয়া কারখানা রয়েছে, যা তাদের সমরাস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য। ৮১তম এই হামলার ভিডিও প্রকাশ করে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের কোনো শিল্পাঞ্চলই এখন আর নিরাপদ নয়। হিজবুল্লাহর সাথে লেবানন সীমান্তেও ইসরাইলের মার্কাবা ট্যাংকগুলো একের পর এক ধ্বংস হচ্ছে, যা স্থল অভিযানের একটি ছোট 'ট্রেইলার' মাত্র।