ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যে কি আমেরিকার আধিপত্যের অবসান ঘটছে?
বাগদাদ, ১৩ মার্চ ২০২৬: গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছিল এক অনিবার্য বাস্তবতা। ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তবে সম্প্রতি ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত ঘোষণা এবং বাগদাদ-ওয়াশিংটনের মধ্যকার নতুন নিরাপত্তা চুক্তি এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিশাল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৬ সাল কি তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দাপট শেষের সূচনালগ্ন?
চুক্তির প্রধান দিকগুলো একনজরে:
- মিশন সমাপ্তি: আগামী এক বছরের মধ্যে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।
- নতুন কাঠামো: সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে মার্কিন বাহিনী কেবল কারিগরি ও গোয়েন্দা সহায়তার লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর আওতায় থাকবে।
- নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ: আইসিসের (ISIS) পুনরুত্থান ঠেকানো এখন ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর একক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
- আঞ্চলিক প্রভাব: এই পিছুটান মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কী আছে এই ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তিতে?
বাগদাদ এবং ওয়াশিংটনের দীর্ঘ আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরাকে মোতায়েনকৃত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের মিশন এখন কেবল আনুষ্ঠানিক বিদায়ের অপেক্ষায়। তবে পেন্টাগন জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি ইরাক ত্যাগ করছে না। বরং তারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তে ইরাকি বাহিনীকে কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং ড্রোন নজরদারির মতো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করবে। এটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির একটি অংশ বলেই মনে করছেন অনেকে, যেখানে বিদেশের মাটিতে সামরিক ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও ইরানের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন এই পিছুটান ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে। ইরাকের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান-পন্থী দলগুলোর প্রভাব এমনিতেই বেশি। মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার ফলে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণে তেহরানের হস্তক্ষেপ আরও বাড়বে। অন্যদিকে, আইসিসের মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই সুযোগে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেক রহমানের মতে, "এই সেনা প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করতে পারে, যা পূরণ করার জন্য ইরান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"
বাংলাদেশের ওপর এই পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্বের এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার শূন্যতা যদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে। এছাড়া ইরাক ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে নিয়োজিত কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঢাকার নীতিনির্ধারকদের এই পরিবর্তনের ওপর সতর্ক নজরদারি করা জরুরি।
উপসংহার: নতুন যুদ্ধের সূচনা নাকি স্থায়ি শান্তি?
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কি সত্যিই এই অঞ্চলে শান্তি বয়ে আনবে, নাকি এটি নতুন কোনো প্রক্সি যুদ্ধের সূচনা? সময় এর সঠিক উত্তর দেবে। তবে ২০২৬ সাল যে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমেরিকার এই পিছুটান যদি পরিকল্পিত না হয়, তবে ইরাক আবারও গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: মার্কিন বাহিনী কি পুরোপুরি ইরাক ছেড়ে চলে যাচ্ছে?
উত্তর: না, তারা সরাসরি কমব্যাট রোল বা যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া বন্ধ করছে, তবে কারিগরি ও পরামর্শক হিসেবে কিছু সেনা ইরাকে অবস্থান করবে।
প্রশ্ন: সেনা প্রত্যাহারের ফলে আইসিসের প্রভাব বাড়বে কি?
উত্তর: নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, মার্কিন বিমান সহায়তা ও ইন্টেলিজেন্স ছাড়া ইরাকি বাহিনীর পক্ষে আইসিস ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
প্রশ্ন: এই চুক্তিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা কী?
উত্তর: ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশের মাটিতে সামরিক ব্যয় কমাতে আগ্রহী, যা এই সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।