বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের মহাবিপত্তি: উচ্চশিক্ষা কি শুধুই কাগজের টুকরো?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের মহাবিপত্তি: উচ্চশিক্ষা কি শুধুই কাগজের টুকরো?
তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গ ও একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশ্বের অন্যতম তরুণ, যেখানে গড় বয়স ২৬-২৭ বছরের মধ্যে। কিন্তু এই মেধাবী তরুণরাই যখন বছরের পর বছর পড়াশোনা শেষ করে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘরে বসে থাকে, তখন তা আর ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। Chronicle Point-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে এই বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির চাকা থমকে দিতে পারে।
১. ডিগ্রি থাকলেও মিলছে না চাকরি
বর্তমান বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি পাওয়া মানেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা—এই ধারণাটি এখন আর কাজ করছে না। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকার। এই সংখ্যাটি গত ৮ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যাদের শিক্ষা নেই, তাদের বেকারত্বের হার মাত্র ১.২৫%, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.৫% ছাড়িয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রি থাকার চেয়ে বরং অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ পাওয়া সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতিকে স্পষ্ট করে।
২. ডিগ্রি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে পরিণত বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৯০-এর দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণহারে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এটি একটি 'ডিগ্রি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট' বা সনদ তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। তথাকথিত এই শিক্ষা মানোন্নয়নের চেয়ে সংখ্যা বাড়ানোর দিকে বেশি জোর দিয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর বাজারে হাজার হাজার স্নাতক নামছে, যাদের অধিকাংশের নেই পর্যাপ্ত কারিগরি দক্ষতা বা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জ্ঞান। ডিগ্রিগুলো কেবল কাগজের টুকরো হিসেবে রয়ে গেছে, কিন্তু হাতে-কলমে কাজের সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
৩. সামাজিক প্রেক্ষিত: বিয়ের বাজারে ডিগ্রির গুরুত্ব
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে ছুটছে কেবল চাকরির আশায় নয়, একটি অদ্ভুত সামাজিক চাপের কারণেও। সমাজ ও বিয়ের বাজারে একটি স্নাতক ডিগ্রির মূল্য অপরিসীম। স্নাতক ছাড়া জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই সামাজিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক মান বা দক্ষতা বিবেচনা না করেই যেকোনো উপায়ে একটি ডিগ্রি অর্জনের চেষ্টা করে। এটি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে এবং কর্মক্ষেত্রের সাথে শিক্ষার কোনো মিল না থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের অসংগতি (Skills Mismatch)
বাংলাদেশের বাজারে কর্মসংস্থান তৈরির চেয়ে বেশি হচ্ছে ডিগ্রির উৎপাদন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রচুর ব্যবসায় শিক্ষা বা এমবিএ পাস করা তরুণ থাকলেও শিল্পখাত বা ব্যাংকিং সেক্টরে তাদের নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না কারণ তাদের দক্ষতার সাথে কাজের চাহিদার কোনো মিল নেই। ব্যাংকের টেলার পজিশনেও এমবিএ ডিগ্রির চাহিদা তৈরি করা হয়েছে, যা হাস্যকর এবং ডিগ্রির অবমূল্যায়ন। শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্নের ডিগ্রির বদলে পরিস্থিতির চাপে অন্য কোনো বিষয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে তাদের কর্মদক্ষতা বিকশিত হচ্ছে না।
৫. বিদেশি দক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা
একটি অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র হলো, স্থানীয় গ্র্যাজুয়েটরা বেকার বসে থাকলেও বাংলাদেশের অনেক শিল্পকারখানা ও সেবা খাতে উচ্চপর্যায়ে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে হচ্ছে। গার্মেন্টস, শিল্প ও সেবা খাতে ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষ কর্মীরা আসছেন কারণ স্থানীয় গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা তাদের সমপর্যায়ের নয়। এটি শুধু আমাদের শিক্ষার মান নয়, বরং আমাদের দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ।
৬. এআই ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে বাংলাদেশের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সেই প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শেখাচ্ছে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদামত দক্ষতা বা টেকনিক্যাল নলেজ না থাকায় আমাদের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক কর্মবাজার থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি কেবল দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিযোগিতায় ফেলছে।
৭. জেন-জি (Gen Z) ও কাজের ধরন
বর্তমান জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের কাজের মানসিকতা আগের প্রজন্মের চেয়ে ভিন্ন। তারা প্রথাগত 'নাইন-টু-ফাইভ' চাকরিতে দীর্ঘমেয়াদী থাকতে আগ্রহী নয়। তাদের কাছে কাজের পরিবেশ, মানসিক প্রশান্তি এবং ব্যক্তিগত সময়ের গুরুত্ব বেশি। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের রিটেনশন বা ধরে রাখার নীতি পরিবর্তন না করে, তবে শ্রমবাজারে অস্থিতিশীলতা বাড়বে। তরুণরা এখন ক্যারিয়ারকে শুধু চাকরির সাথে মেলাতে চায় না, বরং তারা নিজের পছন্দের জায়গায় কাজ করতে চায়।
৮. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের হার উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। বিনিয়োগ ছাড়া নতুন শিল্প বা প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে না, আর নতুন প্রতিষ্ঠান ছাড়া কর্মসংস্থান তৈরি করা অসম্ভব। বিশ্বব্যাপী চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। এই বিনিয়োগ মন্দার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের তরুণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে।
৯. নারী কর্মসংস্থানের বড় বৈষম্য
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে জেন্ডার গ্যাপ বা নারী-পুরুষের বৈষম্য এখনো প্রকট। পুরুষদের তুলনায় নারীদের কর্মসংস্থানের হার অনেক কম। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত নারীরা কর্মসংস্থানে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে এই বিশাল জনশক্তিকে দক্ষ হিসেবে তৈরি করে কাজে লাগানো ছাড়া উপায় নেই।
১০. উত্তরণের উপায় ও ডিজিটাল শ্রম নিবন্ধন
এই সংকট কাটাতে সরকারকে প্রথমেই একটি 'জাতীয় ডিজিটাল শ্রম নিবন্ধন' তৈরি করতে হবে। দেশের কতজন বেকার, কোন সেক্টরে কতজন কাজ করছে এবং চাকরির বাজারের প্রকৃত চাহিদা কত—এটি না জেনে নীতিনির্ধারণ করা অসম্ভব। একই সাথে, প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে কেবল অদক্ষ শ্রম না পাঠিয়ে দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত জনশক্তিকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যা ইন্ডিয়া বা চায়না অতীতে সফলভাবে করেছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. শিক্ষার লক্ষ্য পরিবর্তন: কেবল সনদের জন্য ডিগ্রি না নিয়ে দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে কারিকুলাম পরিবর্তন জরুরি।
- ২. ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমি মেলবন্ধন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে কোর্স সিলেবাস তৈরি করতে হবে।
- ৩. উদ্যোক্তা তৈরি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ (SME) কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলবে।
- ৪. কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষার প্রতি তরুণদের আকৃষ্ট করতে সরকারি প্রণোদনা বাড়াতে হবে।
- ৫. দক্ষতা যাচাই: কোম্পানিগুলোকে কেবল ডিগ্রির বদলে দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
- ৬. শ্রম বাজার সংস্কার: বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্থানীয়দের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
- ৭. জেন-জি ম্যানেজমেন্ট: корпораট কালচারে আধুনিক কর্মীদের মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন এইচআর পলিসি তৈরি করা উচিত।
- ৮. বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ: শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
- ৯. কর্মসংস্থান বনাম ডিগ্রি: মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর তদারকি জরুরি।
- ১০. প্রবাসী দক্ষ শ্রমিক: মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিমা বিশ্বে কেবল অদক্ষ শ্রমিক নয়, বিশেষজ্ঞ হিসেবে গ্র্যাজুয়েটদের পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা।