গোপনে ইরানকে শক্তিশালী করছে চীন! ইসলামাবাদে আলোচনার মাঝেই কি নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি?
Chronicle Point: পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যখন ইরান এবং আমেরিকা যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট। সিএনএন-এর এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীন গোপনে ইরানকে অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একদিকে শান্তির আলাপ, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে বড় ধরনের সামরিক মেরুকরণ—বিশ্ব কি তবে আরও বড় কোনো সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?
১. শান্তির আলোচনার আড়ালে আমেরিকার শক্তি বৃদ্ধি
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার আবহ থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীরবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২০০০ অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন শুরু করেছে। আটলান্টিক থেকে বিমানবাহী রণতরী 'জর্জ ডব্লিউ বুশ' এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে 'ইউএসএস বক্সার' মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে। এই দ্বিচারিতা প্রশ্ন তুলছে যে, আমেরিকা কি আসলেই শান্তি চায় নাকি আলোচনার নাম করে পরবর্তী যুদ্ধের জন্য সময় ক্ষেপণ করছে?
২. চীনের 'গোপন' চাল: কেন আতঙ্কিত ওয়াশিংটন?
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, চীন তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে ইরানের হাতে শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করতে বেইজিংয়ের এই সহায়তা আমেরিকার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যদি চীনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হাতে পায়, তবে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ হয়ে উঠবে মৃত্যুকূপ। যদিও চীন এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
৩. মাটির নিচে ইরানের অক্ষত অস্ত্রের ভান্ডার
আমেরিকার গোয়েন্দা ড্রোন ও স্যাটেলাইট ইমেজ বলছে, ইসরায়েল ও আমেরিকার শত চেষ্টার পরও ইরানের মূল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার এখনো অক্ষত। ইরানের মাটির নিচে এমন সব 'মিসাইল সিটি' বা ক্ষেপণাস্ত্র নগরী রয়েছে যা সাধারণ বিমান হামলায় ধ্বংস করা অসম্ভব। মার্কিন জেনারেলদের ধারণা, ইরান তার ক্ষতিগ্রস্ত লাঞ্চারগুলো খুব দ্রুত মেরামত করে ফেলেছে এবং যেকোনো সময় হাজার হাজার মিসাইল দিয়ে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
৪. চতুর্থ পরাশক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান
হার্ভার্ড ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আমেরিকা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজিক পরাজয় বরণ করছে ইরানের কাছে। প্রফেসর রবার্ট পেপ-এর মতে, এই ৪০ দিনের সংঘাত ইরানকে বিশ্বের চতুর্থ পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করে যে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
৫. লকহিড মার্টিন ও পেন্টাগনের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট
ইরানের হামলা ঠেকাতে গিয়ে আমেরিকার এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী মিসাইলের মজুদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি করেছে পেন্টাগন। মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পেট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমের জন্য দ্রুত নতুন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে। এটি প্রমাণ করে যে, ইরানের ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তির সামনে আমেরিকা এখন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে।
৬. ইসলামাবাদ বৈঠকের কঠোর শর্তাবলি
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধানের মধ্যস্থতায় চলা এই বৈঠকে ইরান দুটি প্রধান শর্ত দিয়েছে। প্রথমত, লেবাননে কোনোভাবেই ইসরায়েলি হামলা চালানো যাবে না এবং এর গ্যারান্টি আমেরিকাকে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই দাবিগুলো না মানলে তারা আলোচনার টেবিল থেকে যেকোনো সময় উঠে যাবে।
৭. হরমুজ প্রণালী ও মাইন আতঙ্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বারবার হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কথা বললেও সামরিক বাস্তবতায় তা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান এই প্রণালীর বিশাল এলাকা জুড়ে এমনভাবে মাইন সেটআপ করেছে যে, সেগুলো অপসারণ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আমেরিকার অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানের সহযোগিতা ছাড়া এই নৌপথ দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এখন অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
Chronicle Point Analysis:
- ১. সামরিক মেরুকরণ: মধ্যপ্রাচ্যে চীন-ইরান অক্ষ শক্তিশালী হওয়া মানে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকান একাধিপত্যের অবসান।
- ২. কৌশলগত বিজয়: শান্তি আলোচনার টেবিলে বসেও ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষায় চীনের সহায়তা নিশ্চিত করে একটি বড় কূটনৈতিক চাল চেলেছে।
- ৩. আমেরিকার সংকট: নিজেদের রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের জরুরি মিসাইল বাজেট আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের বহিঃপ্রকাশ।
- ৪. গ্যারান্টির অভাব: আমেরিকার অতীতে চুক্তি ভঙ্গের ইতিহাস থাকায় ইরান এবার কোনো কাগুজে চুক্তিতে বিশ্বাস করছে না।
- ৫. ইসরায়েলের উদ্বেগ: লেবাননে হামলা বন্ধের শর্তটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- ৬. পাকিস্তানের ভূমিকা: মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের গুরুত্ব এই অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
- ৭. আগামীর বার্তা: চীন যদি সরাসরি ইরানকে সামরিক সহায়তা দেয়, তবে এটি সরাসরি 'গ্রেট পাওয়ার কম্পিটিশন'-এ আমেরিকাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।