ইসলামাবাদে ইরান-আমেরিকা ঐতিহাসিক বৈঠক: লেবাননে হামলা বন্ধের শর্তে ইরানের বড় কূটনৈতিক বিজয়
Chronicle Point: বিশ্ব রাজনীতির নজর এখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে। দীর্ঘ সংঘাত আর উত্তেজনার পর অবশেষে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মুখোমুখি টেবিলে বসেছে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আলোচনার আগেই ইরান তার শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে—লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের শর্ত পূরণ করিয়ে তবেই আলোচনার টেবিলে বসেছে তেহরান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে নেতানিয়াহু লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাকে ইরানের বড় ধরণের ডমিনেন্স হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১. বীরের বেশে ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধি দল
ইরানের সংসদের স্পিকার এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। বিশেষ বিমানে আসা এই দলটিকে স্বাগত জানাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার স্বয়ং বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। ইরানের পক্ষ থেকে তিনটি বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল নিরাপত্তার খাতিরে, যেন শত্রু পক্ষ বুঝতে না পারে কোন বিমানে আসল প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এটি তেহরানের চরম সতর্কতামূলক ও কৌশলগত পদক্ষেপের একটি অংশ।
২. 'মিনাব ১৬৮' এবং ইরানের আবেগঘন বার্তা
ইসলামাবাদে আসা ইরানি বিমানে স্পিকার গালিবাফ একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য তৈরি করেন। তিনি বিমানের সামনের সিটগুলোতে কোনো মানুষকে বসতে না দিয়ে সেখানে কতগুলো স্কুল ব্যাগ, শিশুদের ছবি এবং ফুল সাজিয়ে রেখেছেন। এই দলটির নাম দেওয়া হয়েছে 'মিনাব ১৬৮'। মূলত মার্কিন হামলায় নিহত ১৬৮ জন নিষ্পাপ শিশুর স্মরণে এবং বিশ্বকে এক কঠোর বার্তা দিতেই এই আয়োজন। ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তারা শুধুমাত্র আলোচনার জন্য আসেনি, বরং শিশুদের রক্তের বিনিময়ে তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায় করতে এসেছে।
৩. আমেরিকার 'ব্যাকফুট' পজিশন ও ট্রাম্পের একক চাওয়া
এক সময় ইসরায়েলের হয়ে লম্বা চওড়া শর্তের তালিকা দেওয়া আমেরিকা এখন অনেকটা নমনীয়। কাতারভিত্তিক আল-উবাইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের বিধ্বংসী হামলার পর ওয়াশিংটন সামরিকভাবে ব্যাকফুটে চলে গেছে। বর্তমান আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষ থেকে মাত্র একটি প্রধান দাবি রয়েছে—ইরান যেন পারমাণবিক বোমা তৈরি না করে। অন্যদিকে ইরান তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বৈধ অধিকার থেকে এক চুলও নড়বে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের ৩০০ সদস্যের বিশাল প্রতিনিধি দল এই আলোচনার গুরুত্বই প্রমাণ করে।
৪. হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ ও ইসরায়েলের পিছু হটা
লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর গেরিলারা গত এক মাসে ইসরায়েলের প্রায় ১০০টিরও বেশি আধুনিক ট্যাংক ধ্বংস করেছে। হিজবুল্লাহর ছোট ছোট ড্রোন যখন মিলিয়ন ডলারের ট্যাংকগুলো 'টপাটপ' গিলে ফেলছে, তখন সামরিকভাবে নেতানিয়াহু চরম ডিপ্রেশনের শিকার। যুদ্ধের ময়দানে এই ব্যর্থতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন কল—উভয় চাপে পড়ে ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যা ইরানের আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
৫. পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিজয় ও মধ্যস্থতা
এই ঐতিহাসিক আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তান নিজেকে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধুমাত্র সামরিক শক্তি নয়, কনফ্লিক্ট রেজুলেশনে পাকিস্তানের এই ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দেশটিকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পাকিস্তান ইরানকে যেমন আশ্বস্ত করেছে, তেমনি আমেরিকাকেও আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের রিজার্ভ সংকটে সৌদি আরবের আর্থিক ও জ্বালানি সহায়তা ইসলামাবাদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে।
৬. ভারতের উদ্বেগ ও জ্বালানি সংকটের ব্যঙ্গচিত্র
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্যে প্রতিবেশী ভারত কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানে যখন তেলের কোনো সংকট নেই এবং সৌদি আরব অবারিত তেল দিচ্ছে, তখন ভারতের পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে বিভিন্ন ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন (মটু-পাতলু স্টাইলে) প্রচার হচ্ছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে সব তেল পাকিস্তানের দিকে যাচ্ছে আর ভারত তাকিয়ে দেখছে। এটি মূলত আঞ্চলিক রাজনীতির রসিকতাপূর্ণ প্রতিফলন।
৭. আলোচনার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি
ইসলামাবাদের এই শান্তি আলোচনা নিছক চা-চক্র নয়। এটি পাঁচটি আলাদা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে: অর্থনৈতিক, সাধারণ, রাজনৈতিক, সামরিক এবং আইনি কমিটি। ইরান ইতিমধ্যে তাদের জব্দকৃত ৬০০ কোটি ডলার ফেরত দেওয়ার দাবি তুলেছে এবং অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, আমেরিকা এই অর্থ ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। এই আলোচনার ফল আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
Chronicle Point Analysis:
- ১. কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব: আলোচনার আগে লেবাননে হামলা বন্ধ করিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তি।
- ২. ট্রাম্পের পরিবর্তন: ট্রাম্প ইসরায়েলের চেয়ে আমেরিকার স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা নেতানিয়াহুর জন্য বড় সংকেত।
- ৩. হিজবুল্লাহর ড্রোন যুদ্ধ: আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোনের কাছে পশ্চিমা ট্যাংকগুলোর পরাজয় যুদ্ধের রণকৌশল বদলে দিয়েছে।
- ৪. পাকিস্তানের ভূমিকা: পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান এখন বিশ্বশান্তির গ্যারান্টর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
- ৫. বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট: ইরান এখনো আমেরিকাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না, কারণ অতীতে আমেরিকা বহুবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
- ৬. অর্থনৈতিক সমীকরণ: ইরানের জব্দকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া এবং বাণিজ্যে ছাড় পাওয়া এই আলোচনার অন্যতম মূল লক্ষ্য।
- ৭. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে গত এক দশকের অস্থিরতার অবসান ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।