পেট্রো ডলারের পতন ও ইউয়ানের উত্থান: ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কি বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে?
Chronicle Point: গত ৫০ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা আজ এক গভীর সংকটের মুখে। ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত পেট্রো ডলার চুক্তি, যার ওপর ভিত্তি করে ওয়াশিংটন বিশ্ব তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, তা বর্তমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং চীনের ইউয়ানে তেল কেনাবেচার নতুন সমীকরণ বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করছে।
১. পেট্রো ডলার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে পেট্রো ডলার ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই ব্যবস্থার মূল শর্ত ছিল—উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে তাদের তেল শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে বিক্রি করবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে এবং আমেরিকার আর্থিক শক্তি সুসংহত হয়। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে, এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার ভিত্তি এখন নড়বড়ে।
২. ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও ডলারের ভবিষ্যৎ
সম্প্রতি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত শুধুমাত্র সামরিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইরান যখন থেকে তার তেল পরিবহনের জন্য চীনা মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, তখন থেকেই ডলারের বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্য হুমকির মুখে পড়েছে।
৩. হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই নৌপথের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো চলাচলে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে, চীনা ইউয়ানে লেনদেনকারী জাহাজগুলোকে তেহরান সীমিত প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, যা পেট্রো ইউয়ান ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করছে।
৪. চীনের কৌশল ও তেলের ব্যাপক মজুদ
সংঘাত শুরু হওয়ার আগ থেকেই চীন অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের তেলের মজুদ বাড়াতে শুরু করে। গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম দুই মাসে বেইজিং তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানি ১৫.৮ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে চীনের কাছে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে, যা তাদের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ৩-৪ মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এই সক্ষমতা চীনকে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের সাহস জোগাচ্ছে।
৫. ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত নীতি ও ট্রাম্পের বক্তব্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আমেরিকার এখন আর হরমুজ প্রণালীর ওপর আগের মতো নির্ভর করার প্রয়োজন নেই, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই শীর্ষস্থানীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। তবে এই নীতি ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে চরম সংকটে ফেলছে, যারা তাদের জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল।
৬. বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের নিম্নমুখী অবস্থান
আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কমে ৫৬.৭৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্রাজিল ও চীনের মতো দেশগুলো তাদের রিজার্ভে ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণ ও অন্যান্য মুদ্রার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, একক শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে ডলারের আবেদন ক্রমেই কমছে।
৭. সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তির নতুন আধিপত্য
শুধুমাত্র তেল নয়, বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপের বাণিজ্যও পেট্রো ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামীতে জ্বালানি তেলের চেয়ে চিপ বা প্রযুক্তির লেনদেন ডলারে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও চীন তাদের শক্তিশালী উৎপাদন ক্ষমতা দিয়ে সেখানেও ইউয়ানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. চুক্তির অবসান: ১৯৭৪ সালের পেট্রো ডলার চুক্তিটি এখন কার্যত অচল হওয়ার পথে, যা আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
- ২. ইউয়ানের উত্থান: তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লে তা বৈশ্বিক লেনদেনের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থানকে দুর্বল করবে।
- ৩. মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ: ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে পশ্চিমাদের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
- ৪. মার্কিন নির্ভরতা হ্রাস: যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তেল রপ্তানিকারক হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় তাদের আগ্রহ কমেছে, যা আঞ্চলিক শক্তিদের চীনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- ৫. ইউরোপের সংকট: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
- ৬. স্বর্ণের দিকে ঝোঁক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের অনিশ্চয়তা এড়াতে ব্যাপকভাবে স্বর্ণ মজুদ করছে।
- ৭. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: যুদ্ধ শেষ হলেও ডলারের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।