ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন আলোচনা ব্যর্থ: যুদ্ধের নতুন সমীকরণ।
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার কূটনৈতিক লড়াই ব্যর্থ: ইরান-মার্কিন সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি!
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলো ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইরান-মার্কিন কূটনৈতিক মিশন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধি দল এবং ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমোজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
১. ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ কূটনৈতিক ম্যারাথন
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে রোববার ভোর পর্যন্ত প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়েদ আব্বাস আারাকচির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রের 'মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা' পূরণে অস্বীকৃতি জানায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এটি ছিল গত এক বছরের মধ্যে দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে কঠিন বৈঠক।
২. হরমোজ প্রণালীতে আধিপত্যের লড়াই
আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল হরমোজ প্রণালী। ওয়াশিংটন চেয়েছিল ইরান যেন এই কৌশলগত জলপথ থেকে তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে নেয় এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করে। তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হরমোজ প্রণালীর নিরাপত্তা তাদের সার্বভৌমত্বের বিষয় এবং এখানে কোনো আপোষ করা হবে না।
৩. পারমাণবিক কর্মসূচি ও জিরো সমৃদ্ধকরণ নীতি
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভন্স আলোচনায় শর্ত দেন যে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থায়ীভাবে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা আলোচনার টেবিলে এমন কিছু অর্জন করতে চেয়েছিল যা তারা যুদ্ধক্ষেত্রেও পারেনি। ইরান এই দাবিকে তাদের জাতীয় অধিকারের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে।
৪. মার্কিন প্রশাসনের 'অজুহাত' ও অভ্যন্তরীণ চাপ
ইরানের তাসনিম নিউজ এবং ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র মূলত আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানোর অজুহাত খুঁজছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্যই তারা এই নাটকের অবতারণা করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চাভিলাষী অবস্থানই এই ব্যর্থতার মূল কারণ বলে তেহরান মনে করে।
৫. পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও আঞ্চলিক ভূমিকা
আলোচনা ব্যর্থ হলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রচেষ্টাকে উভয় পক্ষই ধন্যবাদ জানিয়েছে। পাকিস্তান আন্তরিকভাবে চেয়েছিল দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে, কিন্তু মার্কিন অনমনীয়তার কারণে ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক প্রয়াস কোনো আলোর মুখ দেখেনি।
৬. জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বিশ্ব প্রভাব
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবরে বিশ্ব তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। হরমোজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যার ফলে বাইডেন-ট্রাম্প ঘরানার নীতির বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকাতেই ক্ষোভ বাড়ছে। ইরানের আইআরজিসি স্পষ্ট সতর্ক করেছে যে, সামরিক জাহাজের যাতায়াত রুখতে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
৭. তুরস্ক-ইসরায়েল বাকযুদ্ধ ও নতুন মেরুকরণ
একদিকে যখন ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে লক্ষ্য করে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। আঙ্কারা জানিয়েছে, নেতানিয়াহু একজন যুদ্ধাপরাধী এবং তার কোনো নৈতিক বৈধতা নেই কাউকে উপদেশ দেওয়ার। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. কূটনৈতিক অচলাবস্থা: ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা প্রমাণ করে যে, দুই পক্ষই এখন চূড়ান্ত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দিকে নজর দিচ্ছে।
- ২. রেডলাইন অতিক্রম: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামানো ইরানের জন্য একটি 'রেডলাইন', যা ট্রাম্প প্রশাসন জেনেশুনেই আলোচনার শর্ত হিসেবে দিয়েছিল।
- ৩. হরমোজ ফ্যাক্টর: হরমোজ প্রণালী এখন কেবল একটি জলপথ নয়, এটি ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- ৪. ট্রাম্পের কৌশল: ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত সরাসরি যুদ্ধের বদলে চরম অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চায়।
- ৫. মধ্যস্থতাকারীর সীমাবদ্ধতা: পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলেও মূল শক্তির অনড় অবস্থান থাকলে মধ্যস্থতা সবসময়ই ব্যর্থ হয়।
- ৬. তেলের রাজনীতি: পশ্চিমা বিশ্বে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির ওপর ঘরোয়া চাপ সৃষ্টি করবে।
- ৭. আগামীর বার্তা: পরবর্তী দফার আলোচনার কোনো পরিকল্পনা না থাকায় সংঘাতের ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।