মধ্যপ্রাচ্য বিভক্তির মহা-পরিকল্পনা এবং ট্রাম্প-মোদী-নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক তৎপরতা: নেপথ্যে নতুন বৈশ্বিক অক্ষের উত্থান
মধ্যপ্রাচ্য বিভক্তির মহা-পরিকল্পনা এবং ট্রাম্প-মোদী-নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক তৎপরতা: নেপথ্যে নতুন বৈশ্বিক অক্ষের উত্থান
ঢাকা, ১৬ মে, ২০২৬: বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তিন দিনের ঐতিহাসিক চীন সফর শেষ করে দেশে ফেরা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বুক চিরে এক নতুন সামরিক ও অর্থনৈতিক অক্ষের উত্থান। এরই মাঝে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক চরম গোপনীয় ও যুদ্ধকালীন সামরিক সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আবুধাবি আগমন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি পশ্চিমা ব্লু-প্রিন্ট বা 'গ্রেটার মিডিল ইস্ট প্রজেক্ট'। সৌদি আরবকে পাঁচ টুকরো করা এবং হরমোজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে বিশ্ব জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করার এক চরম খেলায় মেতেছে কয়েকটি আঞ্চলিক ও পরাশক্তি। ক্রনিকল পয়েন্টের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব এই ভূ-রাজনৈতিক চালের প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক।
১. ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর তিন দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীন সফর শেষ করে ওয়াশিংটনে ফিরেছেন। ট্রাম্পের এই সফরের দিকে পুরো বিশ্বের নজর ছিল। কারণ, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যু বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ট্রাম্পের এই সফরের প্রধান অর্জনগুলোর মধ্যে একটি হলো দুই দেশের মধ্যে যৌথ 'বোর্ড অফ ট্রেড' (বাণিজ্য বোর্ড) এবং 'বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট' (বিনিয়োগ কাউন্সিল) গঠন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সফরের গুরুত্ব স্বীকার করে বলেছেন যে, এটি দুই দেশের বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি বড় মাইলফলক। ২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া চুক্তিকে ভিত্তি করে এই নতুন বোর্ডগুলো কাজ করবে, যা একে অপরকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করবে।
২. বোইং বিমান চুক্তি ও অর্থনৈতিক লেনদেনের গভীরতা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই চীন সফরে বিপুল অর্থনৈতিক বাণিজ্যের সমীকরণ মিলেছে। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর এই সফরের মাধ্যমে চীন মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারী সংস্থা 'বোইং' (Boeing)-এর কাছ থেকে কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০টি বাণিজ্যিক বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিশাল চুক্তি মার্কিন বিমান শিল্পের জন্য এক বড় ধরনের বুস্টার ডোজ হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্পের সাথে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় সব টেক জায়ান্ট এবং বড় বড় করপোরেট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা (CEO) এই সফরে অংশ নিয়েছিলেন। বেইজিংয়ের সাথে আমেরিকার এই বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে যতই উত্তেজনা থাকুক না কেন, অর্থনৈতিক স্বার্থের জায়গায় দুই পরাশক্তি বড় ধরনের সমঝোতায় আসতে দ্বিধা করছে না।
৩. জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের মার্কিন-চীন সমঝোতা
বাণিজ্যিক বিমান ছাড়াও ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, চীন আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) আমদানি বাড়াতে সম্মত হয়েছে। এই মৌখিক ও কৌশলগত সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামকে একটি নির্দিষ্ট সহনীয় মাত্রার মধ্যে রাখা। চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ এবং আমেরিকা বর্তমানে অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী। এই দুই দেশের মধ্যে তেল আমদানির এই নতুন রসায়ন মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর, বিশেষ করে ওপেকের (OPEC) ওপর এক ধরনের পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা।
৪. তাইওয়ান ও হরমোজ প্রণালী নিয়ে বেইজিংয়ের অনড় অবস্থান
যদিও অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে, তবে ভূ-রাজনৈতিক দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। এই দুটি বিষয় হলো তাইওয়ান সংকট এবং ইরানের হরমোজ প্রণালীর অবরুদ্ধতা। মার্কিন প্রশাসন চেয়েছিল চীনের ওপর চাপ দিয়ে ইরান সংকটের সমাধান করতে এবং হরমোজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের প্রভাব খাটাত। কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত কঠোরভাবে ট্রাম্পকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুতে চীন কোনো ধরনের আপস করবে না। চীন পরিষ্কার বলেছে, তাইওয়ানের সাথে অন্য কোনো আঞ্চলিক সংকটের (যেমন ইরান) তুলনা বা লিঙ্ক করা যাবে না। তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এখানে আমেরিকার নাক গলানো বেইজিং কোনোভাবেই বরদাশত করবে না। ফলে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে।
৫. মার্কিন প্রতিনিধিদলের ওপর চীনা গোয়েন্দাগিরির আতঙ্ক এবং উপহার বর্জন
ট্রাম্পের এই বেইজিং সফরে পর্দার আড়ালে এক অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা আধুনিক সাইবার ও প্রযুক্তিগত যুদ্ধের গভীরতা প্রদর্শন করে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মী এবং মার্কিন সাংবাদিকদের চীন সফরের সময় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উপহার, স্যুভেনির, নোটবুক এবং কলম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রতিনিধিদল বেইজিং ছাড়ার আগে বিমানে ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এক কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়। মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পলিথিন ব্যাগ নিয়ে সবার কাছে যান এবং চীন থেকে পাওয়া সমস্ত উপহার ও স্যুভেনির সেই ব্যাগে জমা দিতে বলেন। তারা সমস্ত উপহার চীনা মাটিতেই ফেলে রেখে আসেন। মার্কিন গোয়েন্দাদের ভয় ছিল, চীন এই সাধারণ উপহারগুলোর ভেতরে অতি সূক্ষ্ম 'মৌমাছি রোবট' (Micro-Robots), গোপন ক্যামেরা বা ভয়েস রেকর্ডারলুকিয়ে রাখতে পারে, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্য বেইজিংয়ের কাছে চলে যেতে পারে।
৬. নেতানিয়াহুর গোপন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর ও যুদ্ধকালীন মিশন
যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীনে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে গেছে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সফর করেছেন। এই সফরটি সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সফর ছিল না, এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধকালীন সামরিক মিশন। নেতানিয়াহু একা যাননি; তাঁর সাথে ছিলেন ইসরাইলের সেনাপ্রধান, দেশটির কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)-এর প্রধান এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান। ইসরাইলি গণমাধ্যমের দাবি, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাঝেই এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, নেতানিয়াহু আবুধাবিতে বসেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বা মিসাইল হামলার নির্দেশনায় তদারকি করছিলেন।
৭. আবুধাবির অস্বীকার ও ইসরাইলের অনড় দাবি: কূটনৈতিক লুকোচুরি
নেতানিয়াহুর এই স্পর্শকাতর সফর নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের মধ্যে চরম কূটনৈতিক লুকোচুরি ও কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। সফরটি জানাজানি হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার প্রথম দিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলে যে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী তাদের দেশে আসেননি। এর জবাবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি পাল্টা দাবি করা হয় যে, নেতানিয়াহু অবশ্যই সফর করেছেন। এরপর আরব আমিরাত বলে, ইসরাইল ভুল তথ্য দিচ্ছে, বড়জোর শুধু ইসরাইলি সেনাপ্রধান এসেছেন। ইসরাইল আবার প্রমাণসহ দাবি করে যে, শুধু সেনাপ্রধান নন, মোসাদ প্রধানও এসেছেন এবং তাদের সাথে আইরন ডোম (Iron Dome) প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কৌশলগত উপাদানও ছিল। আরব বিশ্বের গণঅসন্তোষ থেকে বাঁচতেই আমিরাত এই সফরের খবরটি চেপে যেতে চেয়েছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
৮. ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আবুধাবি সফর এবং যৌথ অস্ত্র উৎপাদন
নেতানিয়াহুর এই গোপন সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে আসেন। মোদীর এই সফরের পেছনে দুটি মূল এজেন্ডা ছিল। প্রথমটি হলো তেল ও গ্যাস খাতের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং দ্বিতীয়টি হলো ভারত ও আরব আমিরাতের মধ্যে যৌথভাবে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র উৎপাদন। ভারত গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করছে। মোদীর এই সফরের মাধ্যমে নয়া দিল্লি ও আবুধাবির সামরিক অংশীদারিত্ব এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল, যা এই অঞ্চলের প্রচলিত সামরিক ভারসাম্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে।
৯. হরমোজ প্রণালীকে বাইপাস করার 'ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন' প্রজেক্ট
নরেন্দ্র মোদীর আবুধাবি সফরের দিনই সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বকে চমকে দিয়ে একটি বড় ঘোষণা দেয়। তারা তাদের দেশের মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত বিখ্যাত 'ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন' (East-West Pipeline)-এর ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ করার জন্য জোরেশোরে কাজ শুরু করেছে। এই পাইপলাইনটি আবুধাবি থেকে সরাসরি ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত আল ফুজাইরা (Al Fujairah) বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রজেক্টের মূল ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত 'হরমোজ প্রণালী' (Strait of Hormuz)-কে সম্পূর্ণভাবে বাইপাস করা। যদি ইরান হরমোজ প্রণালী বন্ধও করে দেয়, তাও আরব আমিরাত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি আল ফুজাইরা বন্দর দিয়ে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ চালু রাখতে পারবে।
১০. ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে আরব আমিরাতের পূর্ণ সমর্থন
নরেন্দ্র মোদীর এই সফরে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত তার জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য দেশের অভ্যন্তরে মাটির নিচে বিশাল 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' (Strategic Petroleum Reserve) বা কৌশলগত তেল মজুদাগার তৈরি করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা করেছে যে, ভারতের এই রাষ্ট্রীয় জরুরি তেল মজুদে তারা সর্বোচ্চ পরিমাণ কাঁচা তেল সরবরাহ করবে এবং ভারতকে পূর্ণ লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে। এর ফলে যুদ্ধ বা বড় কোনো বৈশ্বিক সংকটের সময়েও ভারতের তেলের বাজারে কোনো ঘাটতি তৈরি হবে না। এই চুক্তি ভারত-আমিরাত সম্পর্ককে কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং গভীর কৌশলগত সম্পর্কে রূপান্তর করেছে।
১১. নতুন এশিয়ান-ইউরোপীয় অক্ষ: ভারত, আমিরাত, ইসরাইল ও গ্রিস এলায়েন্স
এই সমস্ত ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা। এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত একটি নতুন শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক অক্ষ বা এলায়েন্স গড়ে উঠছে। এই জোটে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে মূলত পাঁচটি দেশ: ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরাইল, গ্রিস এবং গ্রিক সাইপ্রাস। এই অক্ষের মূল লক্ষ্য হলো চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-কে কাউন্টার করা এবং তুরস্ক ও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে খর্ব করা। এই জোটের মাধ্যমে ভারত মহাসাগর থেকে আরব সাগর, আরব আমিরাতের স্থলপথ, ইসরাইলের বন্দর এবং ভূমধ্যসাগর হয়ে সরাসরি ইউরোপ পর্যন্ত একটি বিকল্প বাণিজ্যিক ও সামরিক করিডোর তৈরি করা হচ্ছে।
১২. ইরান বিরোধী আরব সামরিক জোট গঠনের গোপন চেষ্টা ও ফাটল
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (MBZ) পর্দার আড়ালে এক বিশাল কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত প্রধান প্রধান আরব দেশগুলোকে—যেমন সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ইরাক এবং জর্ডানকে—একত্রিত করে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আনুষ্ঠানিক 'আরব সামরিক জোট' গঠন করা। এই জোটের মূল লক্ষ্য হতো ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে ইরানকে সামরিকভাবে কোণঠাসা করা। কিন্তু আরব আমিরাতের এই দূরভিলাষী পরিকল্পনা সফল হতে পারেনি, কারণ আরব বিশ্বের ভেতরের নেতৃত্ব কোন্দল ও স্বার্থের সংঘাত এই চেষ্টায় ফাটল ধরায়।
১৩. সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বাধা এবং ওপিইসি (OPEC) ভাঙন
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই ইরান বিরোধী সামরিক জোট গঠনের পথে প্রধান প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS)। সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দা মন্ত্রী যুবরাজ তুর্কি বিন ফয়সাল আল সৌদ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'আরব নিউজ'-এ একটি কলামে বিষয়টি ফাঁস করেছেন। তিনি লিখেছেন, আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে নামানোর যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা কঠোরভাবে থামিয়ে দিয়েছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরব শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং তারা ইরানের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। সৌদি আরবের এই বাধার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট 'ওপেক' (OPEC) থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো আগাম আলোচনা ছাড়াই আমিরাত জাস্ট একটি চিঠির মাধ্যমে সৌদি আরবকে ওপেক ছাড়ার কথা জানিয়ে দেয়, যা রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার ঐতিহাসিক ফাটলকে স্পষ্ট করে।
১৪. গ্রেটার মিডিল ইস্ট প্রজেক্ট: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে টুকরো করার ব্লু-প্রিন্ট
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় পরাশক্তিগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কোনো বড় রাষ্ট্রকে যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে না, তখন তারা সেই রাষ্ট্রকে ভেঙে ছোট ছোট দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করার নীতি গ্রহণ করে। একে বলা হয় 'স্যাটেলাইট রাষ্ট্র' তৈরির পরিকল্পনা। মধ্যপ্রাচ্যে এই নীতি গত কয়েক দশক ধরে কার্যকর করা হচ্ছে। ২০০১ সালের আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার পর এই 'গ্রেটার মিডিল ইস্ট প্রজেক্ট' (Greater Middle East Project) আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনের আজকের যে ধ্বংসাত্মক রূপ এবং গৃহযুদ্ধ, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এই দেশগুলোকে ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করার সুপরিকল্পিত পশ্চিমা ব্লু-প্রিন্টের অংশ।
১৫. সৌদি আরবকে ৫ টুকরো করার নিউইয়র্ক টাইমসের সেই চাঞ্চল্যকর পরিকল্পনা
এই ভাঙনের খেলার সর্বশেষ ও সবচেয়ে বিপজ্জনক টার্গেট হলো খোদ সৌদি আরব। ২০১৩ সালে মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'নিউইয়র্ক টাইমস' (The New York Times)-এ একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণাত্মক কলাম ও মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে দেখানো হয়েছিল কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশকে ভেঙে ১৪টি নতুন রাষ্ট্র বানানো সম্ভব। ২০০৬ সালের মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই রিপোর্টে সৌদি আরবকে পাঁচটি আলাদা রাষ্ট্রে বিভক্ত করার ছক আঁকা হয়: ১. উত্তর আরব, ২. পূর্ব আরব (তেল সমৃদ্ধ শিয়া অঞ্চল), ৩. পশ্চিম আরব (মক্কা-মদিনা কেন্দ্রিক হেজাজ অঞ্চল), ৪. দক্ষিণ আরব এবং ৫. কেন্দ্রস্থলে ওহাবিস্থান। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো পবিত্র মক্কা ও মদিনাকে একটি স্বাধীন কেবল ধর্মীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মুসলিম বিশ্বের ওপর সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব চিরতরে খতম হয়ে যায়। লিবিয়া ও সিরিয়াতে এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হলেও সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এই ব্লু-প্রিন্টকে আপাতত থমকে দিয়েছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ট্রাম্পের চীন সফর বিশ্ব বাণিজ্যে আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখার এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর একটি কৌশলগত প্রয়াস মাত্র।
- ২. বোইং চুক্তি প্রমাণ করে যে বেইজিংয়ের সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক উত্তেজনা কেবলই লোকদেখানো, আসল নিয়ন্ত্রণ করপোরেট বাণিজ্যের হাতে।
- ৩. তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে মার্কিন-চীন অপরিশোধিত তেল চুক্তি ওপেকের বিশেষ করে সৌদি আরবের একচেটিয়া ক্ষমতার ওপর বড় আঘাত।
- ৪. তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অনড় অবস্থান ওয়াশিংটনকে বার্তা দেয় যে এশিয়ায় মার্কিন সামরিক দাদাগিরি বেইজিং সহজে মেনে নেবে না।
- ৫. উপহার বর্জনের ঘটনা প্রমাণ করে যে আধুনিক বৈশ্বিক কূটনীতিতে দুই পরাশক্তির মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
- ৬. নেতানিয়াহুর গোপন আমিরাত সফর প্রমাণ করে যে ইরানকে প্রতিহত করতে ইসরাইল এখন আরব ভূমিকে সরাসরি সামরিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
- ৭. আবুধাবির কূটনৈতিক অস্বীকার মূলত মুসলিম বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং ইরানের সম্ভাব্য মিসাইল হামলা থেকে বাঁচার একটি মরিয়া চেষ্টা।
- ৮. নরেন্দ্র মোদীর মধ্যপ্রাচ্য নীতি ভারতকে এই অঞ্চলের নতুন সামরিক শক্তির অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যা পাকিস্তানের জন্য চিন্তার কারণ।
- ৯. ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন মূলত ইরানের হরমোজ প্রণালীর ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষমতাকে চিরতরে খর্ব করার একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাল।
- ১০. ভারতের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভে আমিরাতের তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা নয়া দিল্লির জন্য এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও জ্বালানি বিজয়।
- ১১. নতুন পাঁচ-দেশীয় অক্ষ (ভারত-আমিরাত-ইসরাইল) মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব কমে যাওয়ার শূন্যস্থান পূরণে একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটাচ্ছে।
- ১২. ইরান বিরোধী আরব জোট গঠনে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে আরব দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক চরম অবিশ্বাস ও নেতৃত্বের কোন্দল বিদ্যমান।
- ১৩. মোহাম্মদ বিন সালমানের অবস্থান প্রমাণ করে যে সৌদি আরব এখন আর অন্ধভাবে আমেরিকা বা আরব আমিরাতের যুদ্ধংদেহী নীতির লেজুড়বৃত্তি করবে না।
- ১৪. ওপিইসি থেকে আমিরাতের বিদায় মধ্যপ্রাচ্যের দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার ঐতিহাসিক রাজকীয় দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।
- ১৫. সৌদি আরবকে বিভক্ত করার ছক মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীককে ধ্বংস করার একটি সুদূরপ্রসারী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা।