ইউক্রেনের কিয়েভে রাশিয়ার স্মরণকালের ভয়াবহ হাইপারসোনিক মিসাইল হামলা!
অবশেষে ইরান-আমেরিকা ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি; অন্যপ্রান্তে ইউক্রেনের কিয়েভে রাশিয়ার স্মরণকালের ভয়াবহ হামলা
ঢাকা, ২৪ মে, ২০২৬: বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী মোড় নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের চলমান উত্তেজনা। দীর্ঘদিনের চরম বৈরিতা ও যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একটি ঐতিহাসিক শান্তি ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই যুগান্তকারী অগ্রগতির কথা ঘোষণা করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছেন। তবে এই আশাপ্রদ খবরের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে। গত রাতেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং ভয়াবহ হাইপারসোনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এযাবতকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। একই দিনে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস এবং অন্যদিকে ইউরোপে ধ্বংসযজ্ঞের এই বিপরীতমুখী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে Chronicle Point-এর বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন।
১. ইরান-আমেরিকা সমঝোতা চুক্তির পটভূমি ও ট্রাম্পের ঘোষণা
বিগত বেশ কিছুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যে চরম যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তা গত রাতে এক আকস্মিক কূটনৈতিক সফলতার দিকে মোড় নেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় জানান যে, আমেরিকা ও ইরান একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি ও যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের একেবারেই কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এই চুক্তিটি মূলত এই অঞ্চলের চলমান সংকট ও যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যেখানে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে কূটনৈতিক টেবিলের সমঝোতাই শেষ পর্যন্ত প্রধান হয়ে উঠেছে।
২. মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনালাপ
এই ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তিটিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে এক নজিরবিহীন যৌথ আলোচনায় বসেন। তিনি একই সময়ে একটি মেগা টেলিকনফারেন্স বা ফোনালাপের আয়োজন করেন, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, মিশর এবং তুরস্কের মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশের শীর্ষ নেতারা যুক্ত ছিলেন। ট্রাম্প এই নেতাদের সাথে ইরানের সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই দেশগুলোর নেতাদের সম্মতি ও মধ্যস্থতার আশ্বাস পাওয়ার পরই ট্রাম্প চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াকে বেগবান করেন এবং খুব শীঘ্রই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
৩. হরমোজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ ও টোল মওকুফের শর্ত
আমেরিকান এবং ইরানি গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, খসড়া চুক্তির অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হরমোজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পুরোপুরি উন্মুক্ত করা। চলমান যুদ্ধের কারণে ইরান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ইরান কোনো প্রকার শুল্ক, ট্যাক্স বা টোল আদায় ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালী খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে সাহায্য করবে।
৪. সমুদ্রসীমা থেকে মাইন অপসারণ ও নৌ অবরোধ প্রত্যাহার
হরমোজ প্রণালী ও এর আশেপাশের সমুদ্রসীমায় যুদ্ধকালীন কৌশল হিসেবে ইরান যে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করেছিল, চুক্তি অনুযায়ী সেগুলো দ্রুত অপসারণ করার দায়িত্ব নিয়েছে তেহরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ইরান মাইন অপসারণের কাজ শুরু করার সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা পদক্ষেপ নেবে। আমেরিকা ইরানের প্রধান প্রধান বন্দরগুলোর ওপর যে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নৌ অবরোধ (Naval Blockade) আরোপ করে রেখেছিল, তা সম্পূর্ণরূপে তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ইরানের বন্দরগুলো আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত হতে পারবে।
৫. ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও তেল বিক্রির অবাধ সুযোগ
এই সমঝোতা চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ ধরা হয়েছে ৬০ দিন (ছয় শূন্য দিন)। এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়কালে দুই পক্ষই কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক সামরিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে না। এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানি সংক্রান্ত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে শিথিল করবে। ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে সম্পূর্ণ অবাধে এবং আইনগত বাধা ছাড়াই নিজের উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করতে পারবে। তেলের এই অবাধ বিক্রির সুযোগ ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি বড় ধরনের বুস্টার হিসেবে কাজ করবে এবং মার্কিন ডলারের প্রবাহ ইরানি বাজারে বৃদ্ধি পাবে।
৬. পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রসঙ্গ
চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটি হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। তেহরান এই চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেবে যে, ইরান কখনোই কোনো ধরনের পারমাণবিক বা পরমাণু অস্ত্র (Nuclear Weapon) তৈরি করবে না। তবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি স্থগিত করা এবং তেহরানের কাছে ইতিমধ্যে মজুদ থাকা উচ্চমানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনো নিরাপদ দেশে সরিয়ে ফেলা বা নিষ্ক্রিয় করার জটিল বিষয়টি এই প্রাথমিক চুক্তিতে চূড়ান্ত করা হয়নি। এই বিষয়ে পরবর্তী ধাপের আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মার্কিন ও ইরানি উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৭. ট্রাম্পের ‘আক্রমণ ও বিজয়’ কৌশলের নেপথ্য রহস্য
সমঝোতার টেবিলে বসার ঠিক আগ মুহূর্তেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ সামরিক কৌশল ছিল, যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। ট্রাম্প চেয়েছিলেন শান্তি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার ঠিক আগে ইরানের ওপর একটি চূড়ান্ত এবং বিশাল আকৃতির সামরিক হামলা চালাতে। তার পরিকল্পনা ছিল, এই হামলার মাধ্যমে ইরানের সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে ‘বিজয়ী’ হিসেবে ঘোষণা করবেন এবং বলবেন যে তার সামরিক চাপের মুখেই ইরান চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই বিপজ্জনক মানসিকতার কথা আঁচ করতে পেরে ইরান কড়া বার্তা পাঠায়। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যদি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে একটিও মার্কিন মিসাইল ইরানি ভূখণ্ডে পড়ে, তবে ইরান এই শান্তি প্রক্রিয়া থেকে চিরতরে সরে দাঁড়াবে এবং যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে। শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর পরামর্শে ট্রাম্প তার এই আক্রমণাত্মক কৌশল থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন।
৮. পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ইরানি গণমাধ্যম ‘তাসনিম’-এর দাবি
আমেরিকান গণমাধ্যমগুলো যখন মার্কিন সফলতার গল্প শোনাচ্ছে, তখন ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’ (Tasnim News) এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC), ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম জানিয়েছে যে, এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির নেপথ্যে সবচেয়ে বড় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও সামরিক দূরদর্শিতার কারণেই আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পেরেছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এই চুক্তি কেবল ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আওতায় লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটবে।
৯. মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার ও ৬০ দিনের কৌশলগত বিভাজন
তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। ইরান শর্ত দিয়েছে যে, ৬০ দিনের এই যুদ্ধবিরতি কালীন সময়ের প্রথম ৩০ দিন ব্যয় হবে চুক্তির শর্তগুলো দুই পক্ষ সঠিকভাবে পালন করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। যদি প্রথম ৩০ দিন সফলভাবে কাটে, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলের সমস্ত ঘাঁটি থেকে তাদের সৈন্য ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে নিতে হবে। যদিও ওয়াশিংটন এই সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে এখনো মুখ খোলেনি, তবে ইরান এটিকে তাদের প্রধান কৌশলগত বিজয় হিসেবে প্রচার করছে।
১০. হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ইরানের পাল্টা হামলার হুমকি
যদিও মার্কিন মিডিয়া দাবি করছে যে হরমোজ প্রণালী বিনা টোলে সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, ইরানের সামরিক সূত্রগুলো বলছে যে এই প্রণালীর ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সার্বিক নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার এককভাবে ইরানের হাতেই থাকবে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে বাণিজ্যিক জাহাজ চলবে, কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে আইআরজিসি-র কাছে। এর পাশাপাশি ইরান একটি কড়া সতর্কবার্তা জারি করে রেখেছে যে, এই চুক্তি প্রক্রিয়া বা আলোচনা চলাকালীন সময়ে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তাদের মিত্র ইসরাইল ইরানের ওপর নতুন কোনো গোপন বা প্রকাশ্য হামলা চালায়, তবে ইরান এই যুদ্ধকে একটি মহাপরিসর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেবে। সেক্ষেত্রে তারা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিনপন্থী আরব দেশগুলোর তেল খনি ও সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানবে।
১১. জব্দকৃত অর্থ ফেরত ও বিশ্ব অর্থনৈতিক সমীকরণ
ইরানের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আমেরিকার ব্যাংকে আটকে থাকা বা জব্দকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করা। ইরানি গণমাধ্যমের মতে, এই শান্তি চুক্তির অন্যতম অলিখিত শর্ত হলো ইরানের সেই সমস্ত জব্দকৃত অর্থ ধাপে ধাপে তেহরানের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। তবে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, অর্থ ফেরতের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প এই অর্থকে একটি লিভারেজ বা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল অর্থ ফেরত পেলে এবং তেল বিক্রির সুযোগ তৈরি হলে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ফিরে আসবে এবং মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক সংকটও কিছুটা লাঘব হবে।
১২. ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া ও নেতানিয়াহুর জরুরি ক্যাবিনেট বৈঠক
আমেরিকা ও ইরানের এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন মিত্র ইসরাইলকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির বিষয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অবহিত করার পর তেল আবিবে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নেতানিয়াহু এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য আজই তার যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটের এক জরুরি ও গোপন বৈঠক ডেকেছেন। ইসরাইল বরাবরই ইরানের সাথে যেকোনো ধরনের চুক্তির বিরোধী। তেল আবিবের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে এবং তাদের প্রক্সি সংগঠন যেমন হিজবুল্লাহ ও হামাসকে আরও বেশি সহায়তা দেবে। যদিও ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি ইসরাইল অসন্তুষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করবেন না, তবুও ইসরাইল এই চুক্তিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি মনে করছে এবং তারা যেকোনো সময় এটি বানচাল করতে পারে।
১৩. ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন মোড়: কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ আঘাত
মধ্যপ্রাচ্যের এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই গত রাতে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে এক প্রলয়ঙ্কারী ঘটনা ঘটে গেছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ লক্ষ্য করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এই হামলায় প্রায় ৯০০টি আকাশযান ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ৬০০টিরও বেশি ছিল অত্যাধুনিক সুইসাইড ড্রোন এবং বাকিগুলো ছিল ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই হামলায় পুরো কিয়েভ শহর কেঁপে ওঠে এবং শহরের প্রধান রেলওয়ে হাবসহ অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা মাটির সাথে মিশে যায়। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কিয়েভবাসী এত বড় এবং তীব্র আক্রমণ আর কখনো দেখেনি।
১৪. হাইপারসোনিক ব্যালিস্টিক মিসাইলের তাণ্ডব ও ক্ষয়ক্ষতি
রাশিয়ার এই ঐতিহাসিক হামলার সবচেয়ে মারাত্মক দিক ছিল তাদের নতুন ও গোপন হাইপারসোনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ‘ওরসেনিক’ (Orsenic)-এর ব্যবহার। রাশিয়া এর আগে এই মিসাইলটি এত বড় পরিসরে ব্যবহার করেনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অত্যন্ত হতাশার সাথে স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার ছোড়া ৩৬টি ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলের একটিকেও ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) ঠেকাতে পারেনি। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকোর তথ্যমতে, কিয়েভের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি নয়তলা আবাসিক ভবন এবং একটি স্কুলের এয়ার-রেড শেল্টারের প্রবেশপথ এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাথমিক রিপোর্টে অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এবং ৩৩ জনেরও বেশি গুরুতর আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
১৫. পুতিনের বার্তা ও ইউরোপের বিকল্প কূটনৈতিক নেতৃত্ব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ওপর এই ভয়াবহ হামলা চালিয়ে মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (EU) একটি কড়া রাজনৈতিক বার্তা দিলেন। ট্রাম্প যেহেতু বর্তমানে ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে কিছুটা নীরব ভূমিকা পালন করছেন এবং পরোক্ষভাবে ইউক্রেনকে রাশিয়ার শর্তে শান্তি মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন, তাই পুতিন কিয়েভকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে চান। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে আমেরিকার ওপর আর ভরসা করা যাবে না। ইউরোপে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে এখন ইউরোপের নেতারাই রাশিয়ার সাথে একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য উদ্যোগ নিচ্ছেন। আলোচনা চলছে যে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল (Angela Merkel) কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক কোনো প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টকে এই শান্তি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, যিনি পুতিনের সাথে সরাসরি কথা বলে ইউরোপে শান্তি ফিরিয়ে আনবেন।
Chronicle Point Analysis:
- ১. কূটনৈতিক বিজয়: ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই চুক্তি প্রমাণিত করে যে, সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কূটনীতিই সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
- ২. ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন: ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে অনমনীয় অবস্থান ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে নিয়েছিলেন, তা থেকে সরে এসে ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার সাথেই চুক্তি করা ট্রাম্পের এক বড় কৌশলগত পিছু হঠন।
- ৩. পাকিস্তানের উদীয়মান ভূমিকা: মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নাম সামনে আসা এটি প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক।
- ৪. ইসরাইলের একাকীত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একক সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ভূ-রাজনৈতিকভাবে কিছুটা একঘরে হয়ে পড়েছে, যা নেতানিয়াহুর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ।
- ৫. হরমোজ প্রণালীর ভূ-অর্থনীতি: এই জলপথ উন্মুক্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমবে, যা মূলত আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ট্রাম্পকে সাহায্য করবে।
- ৬. ইউরেনিয়ামের অস্পষ্টতা: উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি চুক্তিতে অস্পষ্ট রাখা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকির পথ খোলা রাখল।
- ৭. মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের চাপ: যদি সত্যিই মার্কিন সৈন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রত্যাহার করা হয়, তবে এই অঞ্চলে রাশিয়া এবং চীনের প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
- ৮. তেলের রাজনীতিতে ইরানের পুনর্বাসন: নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ইরান পুনরায় ওপেক (OPEC) প্লাস এবং বিশ্ব বাজারে প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান মজবুত করবে।
- ৯. প্রক্সি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা: লেবানন ও গাজায় যদি সত্যিই যুদ্ধ বন্ধ হয়, তবে তা হবে এই চুক্তির সবচেয়ে বড় মানবিক ও রাজনৈতিক সফলতা।
- ১০. রাশিয়ার রণকৌশল: কিয়েভে রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলা প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এলেও ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে পুতিন নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত থামবেন না।
- ১১. ওরসেনিক মিসাইলের হুমকি: রাশিয়ার হাইপারসোনিক মিসাইল ঠেকাতে পশ্চিমা এয়ার ডিফেন্সের ব্যর্থতা ন্যাটোর (NATO) সামরিক সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
- ১২. ইউরোপের জ্বালানি সংকট: রাশিয়া ইউক্রেনকে ধ্বংসের মাধ্যমে ইউরোপকে শীতের আগে একটি চরম জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যাতে তারা ইউক্রেনকে সাহায্য করা বন্ধ করে।
- ১৩. ইউরোপের স্বাধীন কূটনীতি: আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঙ্গেলা ম্যার্কেলের মতো সাবেক নেতাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ইউরোপের নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে নির্দেশ করে।
- ১৪. ডলারের স্থায়িত্ব রক্ষা: ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কাছে এই সংকটের সুযোগে বিপুল বন্ড ও ডলার বিক্রি করে মার্কিন অর্থনীতিকে সাময়িক পতন থেকে রক্ষা করেছেন।
- ১৫. ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা: অতীত ইতিহাস বলে যে, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ—যেকোনো চুক্তিই ইসরাইল বা অন্য কোনো পক্ষের সামান্য উসকানিতে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যেতে পারে, তাই এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।