তামিলনাড়ু নির্বাচনে থালাপতি বিজয়ের সুনামি: যেভাবে তছনছ হয়ে গেল দক্ষিণ ভারতের ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির সমীকরণ।
তামিলনাড়ু নির্বাচনে থালাপতি বিজয়ের সুনামি: যেভাবে তছনছ হয়ে গেল দক্ষিণ ভারতের ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির সমীকরণ
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনৈতিক আকাশে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে আধিপত্য বজায় রাখা দ্রাবিড়ীয় দুর্গ কি এবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার মুখে? ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রুপালি পর্দার অবিসংবাদিত মেগাস্টার থালাপতি বিজয় এবং তাঁর নবগঠিত রাজনৈতিক দল 'তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগাম' (TVK) যেভাবে মাঠের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, তা ভারতের সামগ্রিক নির্বাচনের ইতিহাসে এক অভাবনীয় ক্লাইম্যাক্স তৈরি করেছে। এক্সিট পোলের অবিশ্বাস্য পূর্বাভাস থেকে শুরু করে দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে তৈরি হওয়া তীব্র উৎকণ্ঠার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছে Chronicle Point। দীর্ঘ বিশ বছরের সুপরিকল্পিত নীরব বিপ্লব, তৃণমূল পর্যায়ের সমাজসেবা এবং দিল্লির একাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের কড়া অবস্থান তামিল মাটির রাজনীতিকে কীভাবে চিরতরে বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক দীর্ঘ প্রতিবেদন।
১. দ্রাবিড়ীয় রাজনীতির ৫০ বছরের অটুট ইতিহাস
দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান রাজ্য তামিলনাড়ুর রাজনীতি সর্বদাই বাকি ভারতের চেয়ে আলাদা। ১৯৬৭ সাল থেকে এই রাজ্যে দ্রাবিড়ীয় আদর্শের বাইরে অন্য কোনো দল ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। ঐতিহ্যবাহী দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগাম (DMK) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগাম (AIADMK) অলিখিতভাবে পালাবদল করে রাজ্য শাসন করে এসেছে। এই দুই পরাশক্তির দুর্ভেদ্য দুর্গে আঘাত হানা কংগ্রেস বা ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) মতো সর্বভারতীয় দলগুলোর পক্ষেও কখনো সম্ভব হয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালে থালাপতি বিজয়ের আবির্ভাব তামিলনাড়ুর এই অর্ধশতকের রাজনৈতিক ব্যাকরণকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে।
২. থালাপতি বিজয়ের নীরব বিপ্লব ও অদৃশ্য সেনাবাহিনী
অনেকেই মনে করতে পারেন যে থালাপতি বিজয় হয়তো হঠাৎ করেই রুপালি পর্দা থেকে রাজনীতির মাঠে নেমে এসেছেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই দশকের এক সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা। ২০০৯ সাল থেকেই বিজয়ের ফ্যান ক্লাব ‘বিজয় মাক্কা ইয়াক্কাম’ (Vijay Makkal Iyakkam - VMI) স্রেফ বিনোদনমূলক কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে একটি পুরোদস্তুর সামাজিক ও এনজিও ধাঁচের সংগঠনে রূপান্তরিত হয়। যখন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের মরশুমে অর্থ ও বিরিয়ানি বিতরণ করে সস্তা জনপ্রিয়তা কিনতে ব্যস্ত ছিল, তখন বিজয়ের ভলান্টিয়াররা প্রত্যন্ত গ্রামে রাত জেগে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও খাদ্য বিতরণ করেছে। এই দুই দশকের নীরব জনসেবা আজ ভোটারদের হৃদয়ে এক অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
৩. টিভিকে (TVK) গঠন এবং নতুন আশার আলো
থালাপতি বিজয় যখন তাঁর নিজস্ব দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগাম’ (TVK) বা তামিল বিজয় দলের ঘোষণা দেন, তখন পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টিকে স্রেফ আরেকটি ‘তারকা-নির্ভর রাজনৈতিক বুদবুদ’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই তারা টের পায় যে বিজয়ের প্রতি মানুষের আনুগত্য কোনো ঠুনকো আবেগের ফসল নয়। থালাপতি বিজয় তাঁর দলের মূল ভিত্তি হিসেবে সামাজিক সমতা, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের এজেন্ডা তুলে ধরেন। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং ক্ষমতাসীন জোটের দুর্নীতির বিরুদ্ধে টিভিকে এক বলিষ্ঠ বিকল্প কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৪. ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন: একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট
২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন কেবল ২৩৪টি আসনের লড়াই নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে এম কে স্টালিনের নেতৃত্বে ডিএমকে জোটের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অন্যদিকে থালাপতি বিজয়ের এক নতুন যুগের তারুণ্যদীপ্ত স্বপ্নের সংঘাত। এই লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি কেবল চেন্নাইয়ের ফোর্ট সেন্ট জর্জের ক্ষমতাকেই প্রভাবিত করেনি, বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতির সমীকরণকেও এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।
৫. বুথ ফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের নাটকীয় পূর্বাভাস
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের ঠিক আগে সামনে আসা বিভিন্ন এক্সিট পোলের রিপোর্টগুলো ভারতের রাজনীতিকে চরম রোমাঞ্চে ঠেলে দিয়েছে। স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা ‘এক্সিস মাই ইন্ডিয়া’র গোপন খসড়া রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুসারে, মেগাস্টার বিজয়ের দল টিভিকে একাই ৯৮ থেকে ১২০টি আসন লাভ করতে পারে। ২৩৪ আসনের বিধানসভায় যেখানে ম্যাজিক ফিগার ১১৮, সেখানে এককভাবে বিজয়ের এই আসন প্রাপ্তির পূর্বাভাস যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের জন্যই চোখ কপালে তোলার মতো ঘটনা। এটি সত্য প্রমাণিত হলে তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমক।
৬. দ্বিমুখী রিপোর্টের রহস্য ও ভোটারদের মানসিকতা
এক্সিট পোলের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে একটি বড় বৈপরীত্যও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু কিছু জাতীয় স্তরের সমীক্ষা আবার দাবি করছে যে বিজয় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৪টি আসনের বেশি পাবেন না। এই দুই চরম বিপরীতমুখী পূর্বাভাসের আড়ালে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক খেলা চলমান রয়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। একটি ধারণা করা হচ্ছে যে, ভোটাররা এবার ট্র্যাডিশনাল দলগুলোর দমন-পীড়নের ভয়ে নিজেদের প্রকৃত ভোট কাকে দিয়েছেন তা প্রকাশ করতে ভয় পেয়েছেন, যার ফলস্বরূপ বিজয়ের পক্ষে একটি সুপ্ত জোয়ার বা ‘আন্ডারকারেন্ট’ তৈরি হয়েছে যা কেবল ব্যালট বাক্স বা ইভিএম খুললেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
৭. দিল্লির রক্তচাপ বাড়ানো থালাপতি বিজয়
থালাপতি বিজয়ের এই অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক উত্থান কেবল তামিলনাড়ুতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার যখন বহু বছর ধরে ‘মিশন সাউথ’ বা দক্ষিণ ভারতে নিজেদের জায়গা পোক্ত করার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন থালাপতি বিজয়ের এই স্বকীয় আঞ্চলিক উত্থান বিজেপির সমস্ত ছক ও হিসাবকে এলোমেলো করে দিয়েছে। দিল্লি ভালো করেই জানে যে বিজয়ের মতো এক কিংবদন্তি মেগাস্টারকে ইডি বা সিবিআই-এর ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা বা বশ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
৮. দিল্লির আধিপত্যবাদ বনাম বিজয়ের আঞ্চলিক রক্ষাকবচ
থালাপতি বিজয় শুরু থেকেই তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং দলীয় ইশতেহারে দিল্লির কেন্দ্রীয় একাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। জোরপূর্বক হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া বা তামিলনাড়ু রাজ্যের নিজস্ব অধিকার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করার মতো দিল্লির প্রতিটি নীতির বিরুদ্ধে বিজয়ের কঠোর হুংকার তাঁকে তামিলদের নিজস্ব অধিকারের প্রকৃত রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজয়ের এই অনমনীয় অবস্থান তামিল আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, যা ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের জোয়ার এনেছে।
৯. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও থালাপতি বিজয়: এক অদ্ভুত সমীকরণ
২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে ভারতের দুটি ভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একদিকে সুদূর পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাকী লড়াই, অন্যদিকে তামিলনাড়ুর মাটিতে থালাপতি বিজয়ের আকস্মিক কিন্তু সুপরিকল্পিত উত্থান। এই দুটি ঘটনার মধ্যে এক সুগভীর ভূ-রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে। উভয়েই দিল্লির এককেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন আঞ্চলিক প্রতিরোধের প্রতীক। এই দুই নেতার লড়াই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একদলীয় আধিপত্যের স্বপ্নের সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
১০. ৩০ শে এপ্রিলের নজিরবিহীন ভোটগ্রহণ
তামিলনাড়ুর এই বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফায় ৩০ শে এপ্রিল যে নজিরবিহীন ৯২.৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছে, তা তামিল ইতিহাসের পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটকেন্দ্রে আগমন প্রমাণ করে যে সাধারণ জনগণ স্থবির রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং পুরনো দলগুলোর চক্র থেকে মুক্তি পেতে কতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের শিক্ষা বলে, যখনই ভোটগ্রহণের হার অবিশ্বাস্য রকম বৃদ্ধি পায়, তখনই সাধারণত শাসক দলের পতন এবং এক দুর্দান্ত পরিবর্তনের জোয়ার তৈরি হয়, যা এবার বিজয়ের পক্ষে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১১. ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে দুর্গের ফাটল
ডিএমকে বর্তমান তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে চরম দুর্নীতি ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে এআইএডিএমকে জয়ললিতার মৃত্যুর পর থেকেই চরম নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। এই শূন্যতাকে অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছেন বিজয়। তিনি ডিএমকে-এর দুর্নীতি ও এআইএডিএমকে-এর সাংগঠনিক দুর্বলতাকে একই সাথে আক্রমণ করে তামিলনাড়ুর যুব সমাজ ও নারী ভোটারদের এক বিশাল অংশকে নিজের পতাকাতলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
১২. কিং মেকার নাকি সরাসরি মসনদ?
কাল সকালে যখন ইভিএম-এর গণনা শুরু হবে, তখন যদি ডিএমকে জোট ১১৮ আসনের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়, তবে বিজয় কেবল একজন প্রার্থী বা বিরোধী দলীয় নেতা থাকবেন না, তিনি হয়ে উঠবেন তামিলনাড়ুর ভাগ্যবিধাতা। তাঁর সমর্থন ছাড়া চেন্নাইয়ের মসনদে কেউ বসতে পারবে না। আর যদি এক্সিস মাই ইন্ডিয়ার ৯৮ থেকে ১২০ আসনের পূর্বাভাসটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে হয়তো খুব শীঘ্রই আমরা থালাপতি বিজয়কে তামিলনাড়ুর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যাভিষেক নিতে দেখব।
১৩. সিনেমা থেকে বাস্তব রাজনীতি: রুপালি পর্দার জাদুকরের পরীক্ষা
সিনেমা জগতের মেগাস্টার এম জি রামচন্দ্রন (MGR) এবং জয়ললিতা অতীতে তামিলনাড়ু শাসন করেছেন। তবে আধুনিক যুগে রুপালি পর্দার ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে বাস্তব রাজনীতির রুক্ষ জমিতে নিজেকে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। পর্দায় এক ঘষায় ভিলেনদের ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া গেলেও বাস্তব রাজনীতির জটিল কূটনীতি এবং দিল্লির শত প্যাঁচানো চালের মুখোমুখি দাঁড়ানো একেবারেই ভিন্ন বিষয়। বিজয় তাঁর রাজনৈতিক দলীয় কাঠামো ও বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কেবল রোমান্টিক হিরো বা অ্যাকশন স্টার নন, বরং একজন দীর্ঘমেয়াদী দূরদর্শী রাজনীতিবিদ।
১৪. যুব সমাজ ও নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সমর্থন
থালাপতি বিজয়ের প্রধান শক্তি হলো তামিলনাড়ুর যুব সমাজ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটাররা। নতুন প্রজন্ম ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-এর পুরনো দ্বন্দ্বে ক্লান্ত। তারা এমন একজন নেতা চেয়েছিল যে তরুণদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষার স্বপ্ন দেখাতে পারে। থালাপতি বিজয় তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন, যা তরুণদের আবেগকে সরাসরি স্পর্শ করেছে।
১৫. ভারতের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র
থালাপতি বিজয়ের উত্থান কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার রদবদল নয়, এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর নতুন বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে কোনো বৃহৎ শক্তি যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন, স্থানীয় ঐতিহ্য, ভাষা ও মানুষের মনের ক্ষোভকে অবহেলা করে জোরপূর্বক কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া যায় না। বিজয়ের এই নীরব বিপ্লব আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যগুলোর তরুণ ও সৎ নেতাদেরও মূলধারার রাজনীতিতে আসার নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. দ্রাবিড় রাজনীতির শূন্যতা পূরণ: করুণানিধি ও জয়ললিতার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতাদের মৃত্যুর পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে যে দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, থালাপতি বিজয় তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে তা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করেছেন।
- ২. নীরব ও দীর্ঘমেয়াদী সংগঠন: বিজয় ২০ বছর ধরে তাঁর ফ্যান ক্লাবকে সুকৌশলে একটি সমাজসেবামূলক নেটওয়ার্কে রূপান্তর করেছিলেন, যা ভোটের মাঠে কোনো ভাড়াটে ক্যাডার ছাড়াই এক বিশ্বস্ত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে।
- ৩. দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রাচীর: বিজয়ের কঠোর তামিল জাতীয়তাবাদী নীতি দক্ষিণ ভারতে বিজেপির আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্নের সামনে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছে।
- ৪. পরিবারতন্ত্রের বিকল্প: স্টালিনের পুত্র উদয়নিধি স্টালিনের ডিএমকে-তে আকস্মিক উত্থানের ফলে যে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল, বিজয় নিজেকে তার একমাত্র সৎ বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছেন।
- ৫. এক্সিট পোলের তীব্র টানাপোড়েন: এক্সিট পোলের দ্বিমুখী ফলাফলের পেছনের মূল কারণ ছিল ভোটারদের চরম নীরবতা, যা মূলত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
- ৬. পশ্চিমবঙ্গের সাথে মিল: ২০২৬ এর নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির অদ্ভুত মিল প্রমাণ করে যে ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তির দৃঢ়তার ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।
- ৭. নজিরবিহীন ৯০%+ ভোটগ্রহণ: তামিলনাড়ুর শেষ দফার ভোটগ্রহণ আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে, যা ভোটারদের তীব্র পরিবর্তনের মরিয়া মনোভাবকেই নির্দেশ করে।
- ৮. অর্থনৈতিক ও সামাজিক এজেন্ডা: বিজয়ের দল কেবল সিনেমা জগতের ইমেজে ভর করেনি, বরং কৃষি ঋণ মওকুফ, কর্মসংস্থান ও বিনামূল্যে শিক্ষার বাস্তবসম্মত এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছে।
- ৯. দিল্লির ইডি-সিবিআই তত্ত্বের ব্যর্থতা: সাধারণ আমলারা বা মধ্যম সারির নেতারা যেখানে দিল্লির এজেন্সির ভয়ে তটস্থ থাকেন, সেখানে বিজয়ের বিপুল ফ্যানবেস ও ক্লিন ইমেজের কারণে দিল্লি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্সি চাল প্রয়োগের সাহস পায়নি।
- ১০. মার্ভেল বা জাস্টিন বিবার ইমেজ ভাঙা: সমালোচকেরা বিজয়কে কেবল গ্ল্যামার বয় বা পপ স্টার হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও বিজয় তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।
- ১১. ধর্মনিরপেক্ষ দ্রাবিড় ভাবধারা ধারণ: থালাপতি বিজয় অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে কোনো উগ্র সাম্প্রদায়িক বা সংকীর্ণ নীতিতে না গিয়ে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ দ্রাবিড় ভাবধারাকে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করেছেন।
- ১২. কর্পোরেট মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লব: তামিলনাড়ুর মূলধারার টিভি মিডিয়াগুলো ডিএমকে জোটের অধীনে থাকা সত্ত্বেও বিজয় সম্পূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া ও গ্রাসরুট জনসংযোগের মাধ্যমে এক অবিশ্বাস্য মিডিয়া ব্যারিকেড তৈরি করতে সক্ষম হন।
- ১৩. কিং মেকার হওয়ার সুবর্ণ সম্ভাবনা: নির্বাচন হাঙ্গ বা কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বিজয়ই হবেন তামিলনাড়ুর পরবর্তী রাজনৈতিক মসনদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রক।
- ১৪. হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠ: বিজয়ের প্রকাশ্য অবস্থান তাঁকে শুধু সিনেমার হিরো নয়, তামিল সংস্কৃতির একজন সাহসী তক্ষক বা রক্ষক হিসেবে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
- ১৫. ভবিষ্যতের ভারতীয় রাজনীতি: ২০২৬ সালে বিজয়ের এই পথপ্রদর্শন প্রমাণ করে যে ভবিষ্যতে ভারতীয় রাজনীতি কেবল দুটি বড় সর্বভারতীয় দলের মেরুকরণ নয়, বরং সৎ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।