ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত এবং বেইজিং-তেহরান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্যে চীনের মধ্যস্থতায় নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইশারা?
ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত এবং বেইজিং-তেহরান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্যে চীনের মধ্যস্থতায় নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইশারা?
বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz)-কে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক মহানাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে পার করার লক্ষে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' (Project Freedom) চালু করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় তা আকস্মিক স্থগিত ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, তেহরানের শীর্ষ কূটনীতিক তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই রাশিয়ার পর বৈঠক করতে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐতিহাসিক এক বৈঠকে বসেছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা উপকূলে রহস্যময় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করা হলেও তেহরান তা সরাসরি অস্বীকার করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুপারপাওয়ারদের মধ্যকার এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংকট এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নতুন মেরুকরণ নিয়ে Chronicle Point-এর বিশ্লেষণ নিচে তুলে করা হলো।
১. ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম ঘোষণার নেপথ্য কারণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হওয়া বিশ্ব জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মার্কিন বলয়ের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার অছিলায় ট্রাম্প ঘোষণা করেন 'প্রজেক্ট ফ্রিডম'। এই প্রজেক্টের প্রধান লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেন্টকম বা নৌবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। ওয়াশিংটন চেয়েছিল এর মাধ্যমে ইরানকে এটি প্রমাণ করে দেওয়া যে এই সমুদ্রপথের একক কর্তৃত্ব তেহরানের হাতে নেই। মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী সিদ্ধান্ত মূলত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান আধিপত্য বজায় রাখার এবং ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করার একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চাল ছিল।
২. দুই দিনের মাথায় প্রজেক্ট স্থগিতের নাটকীয় সিদ্ধান্ত
প্রজেক্ট ফ্রিডম বাস্তবায়নের ঘোষণা যতটা ধুমধাম করে দেওয়া হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটেছে ততটাই আকস্মিক ও লজ্জাজনকভাবে। মাত্র দুই দিন বা ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানের মাথায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ও হোয়াইট হাউস এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই প্রজেক্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা ঘোষণা করে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে এবং সেই অগ্রগতির স্বার্থেই এই মহতী সিদ্ধান্ত। তবে পর্দার অন্তরালে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে তা মোটেও এত সরল ছিল না। হরমোজ প্রণালীতে ইরানি সামরিক বাহিনীর তীব্র প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান এবং প্রথম দিনেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজের পাহারায় থাকা জাহাজগুলোর ওপর ইরানি ড্রোন ও গানবোটের আক্রমণাত্মক মহড়া মার্কিন কমান্ডারদের রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে, যার ফলশ্রুতিতে এই ঐতিহাসিক পিছুটান লক্ষ্য করা গেছে।
৩. হরমুজ প্রণালী কার অধীনে: ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি
ইরান শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালীকে তার নিজস্ব ভূখণ্ডগত জলসীমার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে আমেরিকা যখনই সেখানে নিজ দেশের শক্তির মহড়া দিতে এসেছে, ইরান তখনই সর্বশক্তি দিয়ে তার প্রতিবাদ করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি (IRGC) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, কোনো বিদেশি শক্তির আধিপত্যবাদী প্রজেক্ট হরমুজ প্রণালীতে চলতে দেওয়া হবে না। ইরানের সামরিক নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য ছিল—প্রণালীর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরান এবং ওমানের মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলোর হাতেই থাকবে। ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডমকে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক চরম সাম্রাজ্যবাদী ও অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী দুঃসাহস বলে আখ্যায়িত করেছে এবং তা ধ্বংস করতে সর্বাত্মক প্রতিরোধের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
৪. মার্কিন প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি ও সেন্টকমের দ্বন্দ্ব
প্রজেক্ট ফ্রিডম নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন এবং স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে প্রথম থেকেই এক ধরনের সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে গণমাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি গানবোট দিয়ে প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা বেষ্টনী (Escort) দিয়ে পার করে আনবে, সেখানে মার্কিন সেন্টকম (CENTCOM) এবং সেন্ট্রাল ডিফেন্স হেডকোয়ার্টার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উল্টো সুর গায়। তারা জানায়, সরাসরি সামরিক পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, বরং তারা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কেবল উপগ্রহ ডাটা, নিরাপদ পথের মানচিত্র ও দিকনির্দেশনা (Phone Guidance) প্রদান করবে। ওয়াশিংটনের এই অভ্যন্তরীণ সামরিক দোদুল্যমানতা প্রমাণ করে যে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পূর্ণাঙ্গ নৌ-যুদ্ধে জড়ানোর সামর্থ্য বা প্রস্তুতি মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই মুহূর্তে ছিল না।
৫. সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফুজাইরা বন্দর সংকট
ইউএই বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যে উত্তেজনার পারদ চড়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম চালুর সমান্তরালে আমিরাত দাবি করে যে তাদের ফুজাইরা উপকূলে এবং তেলবাহী ডকগুলোতে ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছিটকে এসেছে। দেশটিতে বারবার সাইরেন বেজে ওঠে এবং এয়ার ডিফেন্স বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় আনা হয়। প্রায় পাঁচ দফায় হামলা চালানোর দাবি করে আমিরাত সৌদি আরব, কাতার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পাশে নিয়ে ইরানের তীব্র নিন্দা জানায়। তাদের দাবি ছিল, চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে লঙ্ঘন করে ইরান এই আগ্রাসন চালিয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে পড়েছে।
৬. তেহরানের অস্বীকৃতি: প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের নতুন চাল?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। ইরানের প্রতিরক্ষামূলক শাখা 'খাতামুল আম্বিয়া' সদর দফতর থেকে জানানো হয় যে, তেহরান যদি কোনো দেশে বা বন্দরে আক্রমণ করে, তবে তা লুকিয়ে নয় বরং ঢাকঢোল পিটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েই করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হামলা এবং অস্বীকৃতির পেছনে একটি গভীর 'প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ' বা মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি চলমান রয়েছে। ইরান হয়তো সরাসরি আমিরাতের মূল ভূখণ্ডকে টার্গেট করেনি, বরং ওই উপকূলে থাকা ও মার্কিন মদদপুষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু আমিরাত নিজেদের ভূখণ্ড আক্রান্ত হওয়ার সস্তা আওয়াজ তুলে আমেরিকাকে ইরানের ওপর সরাসরি হামলার উসকানি দেওয়ার জন্য একে ব্যবহার করেছে।
৭. বেইজিংয়ে চীন-ইরান মহাবৈঠকের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য
যখন মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার সম্পর্কের বরফ গলছিল না, ঠিক সেই মুহূর্তে বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে চীনের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের বৈঠক ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে এক মাস্টারস্ট্রোক। ইরান জানে যে এই অঞ্চলে আমেরিকার আগ্রাসী থাবা রুখতে হলে বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঢাল প্রয়োজন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যার কয়েকদিন পরেই ট্রাম্পের স্বয়ং বেইজিং সফর করার কথা রয়েছে। এই ট্রিপল কূটনীতির মাধ্যমে বেইজিং নিজেকে এই অঞ্চলের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে ইরানের পরম রক্ষক হিসেবে হাজির করতে পেরেছে।
৮. রাশিয়ার সাথে ইরানের চিরস্থায়ী অংশীদারিত্ব
বেইজিং সফরে যাওয়ার ঠিক পূর্বেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার রাজধানী muskote গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেখান থেকে ইরানকে মস্কোর পক্ষ থেকে নিঃশর্ত সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ইরানের পক্ষ থেকে রাশিয়াকে তাদের 'অনন্তকালের পরম বন্ধু' হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। রাশিয়া ও ইরানের এই সামরিক ও রাজনৈতিক অক্ষটি মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের একচেটিয়া একপাক্ষিক নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক বিকল্প গড়ে তুলেছে। রাশিয়ার এই প্রচ্ছন্ন উসকানি ও শক্তির সাহস পেয়েই ইরান হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে বুক টান টান করে দাঁড়াতে পেরেছে।
৯. ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর ও মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প বেইজিংয়ের সাথে আমেরিকার তীব্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সমাধান খোঁজার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে চীনের মধ্যস্থতা কামনা করতে পারেন। চীন এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি এবং তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ তেল-গ্যাস আসে মধ্যপ্রাচ্যের এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। তাই চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থেই হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে বসার পূর্বে চীনকে চটাতে চান না, যা বেইজিংয়ের সাথে ইরানের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পরে ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের সিদ্ধান্তে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
১০. বৈশ্বিক জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা ও চীনের নিজস্ব এজেন্ডা
চীন কখনোই চাইবে না যে হরমুজ প্রণালীর একক নিয়ন্ত্রণ আমেরিকা বা তার মিত্রদের পকেটে চলে যাক। কারণ ওয়াশিংটন যদি একবার এই প্রণালীর কর্তৃত্ব পুরোপুরি পেয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতে তারা চীনের মূল জ্বালানি সরবরাহ লাইনের শ্বাসরোধ করতে পারবে। তাই বেইজিং এই সংকটের সুযোগ নিয়ে এমন এক আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কাঠামো তৈরি করতে চায় যার মাধ্যমে প্রণালীর নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স বা চীনের প্রচ্ছন্ন তত্ত্বাবধানে থাকবে। সহজ কথায়, চীন মধ্যপ্রাচ্যের দুই বিবদমান পক্ষের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে নিজে রেফারি সেজে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাবিকাঠি নিজের কব্জায় নিতে চরম দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
১১. অপারেশন এপিক ফিউরি থেকে প্রজেক্ট ফ্রিডম: মার্কিন ব্যর্থতা
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন দাবি করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের চালানো সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' (Operation Epic Fury) চূড়ান্ত সফলতায় রূপ নিয়েছে এবং এখন তারা দ্বিতীয় ধাপে বা প্রজেক্ট ধাপে প্রবেশ করেছেন, তখন তা হাস্যরসের সৃষ্টি করে। অপারেশন এপিক ফিউরি নামক আগ্রাসী নীতি যদি সত্যিই সফল হতো, তবে ইরানকে বশে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো পেন্টাগনের এই কথিত অপারেশনটি মূলত সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং ইরান তার আগ্রাসী ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা প্রদর্শন করে ওয়াশিংটনকে উল্টো পিছু হটতে বাধ্য করেছে। সামরিক পরিভাষা বদলে প্রজেক্ট ফ্রিডমে যাওয়ার ঘোষণা মূলত ওয়াশিংটনের একটি সুচতুর পলায়নবাদী কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
১২. বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সেনার উপস্থিতি: এনবিসি নিউজের চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী তথাকথিত নিরপেক্ষ দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে গোপনে মার্কিন সামরিক দলের ছদ্মবেশী সদস্যরা মোতায়েন ছিল। তারা জাহাজগুলোকে দিকনির্দেশনা ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার নাম করে সেখানে অবস্থান করছিল। ইরান যখন এই মার্কিন সেনার উপস্থিতির বিষয়টি নিজেদের গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পারে, তখনই তারা সুনির্দিষ্টভাবে ওই সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর গানবোট নিয়ে আক্রমণাত্মক চাল সচল করে। এই গোপন মার্কিন সেনা মোতায়েন মূলত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন এবং যুদ্ধের উসকানি দেওয়ার একটি মোক্ষম উদাহরণ।
১৩. ইসরাইলি কানেকশন: ফুজাইরা হামলার পেছনের সম্ভাব্য সত্য
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে হওয়া এই আক্রমণের নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রচ্ছন্ন হাত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন নিজ দেশে তীব্র আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিগত মামলার রায়ের মুখোমুখি, তখন তিনি চেয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে। এতে করে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা স্থগিত করার মোক্ষম অজুহাত পেয়ে যান। আশ্চর্যজনকভাবে, ফুজাইরা হামলার ঠিক পরের দিনই ইসরাইলি আদালত নেতানিয়াহুর মামলার শুনানি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেয়। সুতরাং, আমেরিকাকে ইরানি ফাঁদে ফেলার এবং নিজের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে মোসাদ বা ইসরাইলি চরদের দ্বারা আমিরাতে এই হামলা সাজানো বা প্ররোচিত হওয়ার তত্ত্বটি অত্যন্ত জোরালো।
১৪. ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক নৌ-জোটের রহস্য
আমেরিকা যখন প্রজেক্ট ফ্রিডম নিয়ে একাকী মাঠে মার খাচ্ছিল, তখন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি দেশ মিলে হরমুজ প্রণালীতে একটি তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কোয়ালিশন’ গঠন করার তোড়জোড় শুরু করে। ইউরোপের এই চালটি ছিল মূলত আমেরিকার আগ্রাসী যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং ইরানের সরাসরি প্রতিরোধের মাঝখানে একটি বাফার বা নিরপেক্ষ দেয়াল তৈরি করা। ইউরোপীয় দেশগুলো চায় না মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোনো যুদ্ধ লাগুক যার ফলে তাদের জ্বালানি বাজার ধ্বংস হয়ে যায় এবং দেশগুলোতে নতুন করে রিফিউজি সংকট তৈরি হয়। তাই তারা আমেরিকার প্রজেক্ট ফ্রিডমকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে একটি কূটনৈতিক ও মাঝারি সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে।
১৫. মন্ট্রেক্স চুক্তির উদাহরণ এবং হরমুজের ভবিষ্যৎ চুক্তি
ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে কৃষ্ণ সাগর এবং বসফরাস প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পাদিত হওয়া ১৯৩৬ সালের বিখ্যাত ‘মন্ট্রেক্স কনভেনশন’ (Montreux Convention)-এর গুরুত্ব অপরিসীম। ৮৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তুরস্ক এই চুক্তির মাধ্যমে বসফরাস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ সফলভাবে ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীর বর্তমান উত্তেজনা কমাতে ঠিক একই রকম একটি বৈশ্বিক চুক্তি বা ‘হরমুজ কনভেনশন’ সম্পাদনের দিকে বিশ্ব রাজনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর যৌথ অংশীদারিত্বে এই প্রণালীর চিরস্থায়ী চলাচল নিশ্চিত করা হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক সামরিক শক্তির ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটাবে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ট্রাম্পের কূটনৈতিক পরাজয়: প্রজেক্ট ফ্রিডম চালুর মাত্র দুই দিনের মাথায় স্থগিত ঘোষণা করা ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা শক্তির রাজনীতির জন্য একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক পরাজয় এবং ইরানের সামরিক অনমনীয়তার জয়।
- ২. চীনের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা: তেহরান-বেইজিং বৈঠকের মাধ্যমে চীন প্রমাণ করেছে যে আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা সমস্যার সুরাহা করার সক্ষমতা রাখে।
- ৩. দ্বিমুখী মার্কিন প্রচারণার ফাটল: পেন্টাগন যেখানে প্রজেক্ট ফ্রিডমকে একটি ডাটা সরবরাহ বা পরামর্শের সাধারণ প্রজেক্ট হিসেবে দেখিয়েছে, ট্রাম্প তাকে সামরিক পাহারা হিসেবে জাহির করে তাঁর নির্বাচনী ফায়দা লুটতে চেয়েছিলেন।
- ৪. ইসরাইলি স্বার্থ ও নেতানিয়াহুর মামলা: ফুজাইরা বন্দরের হামলাটি সরাসরি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাজানো ছক হতে পারে, যা নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ফৌজদারি মামলা পিছিয়ে দিতে সম্পূর্ণ সফল হয়েছে।
- ৫. ইরান-রাশিয়া সামরিক অক্ষের দৃঢ়তা: মস্কোর পূর্ণ সমর্থনের কারণে ইরান এই প্রণালীতে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস অর্জন করেছে, যা পশ্চিমাবিরোধী বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
- ৬. সংযুক্ত আরব আমিরাতের অতিরিক্ত ভীতি: আমিরাত ইরানের মিসাইল ডিফেন্স অ্যাক্টিভ করার কথা বলে মূলত পশ্চিমা দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার এবং আমেরিকার আরও বেশি সেনা মোতায়েন করার ফন্দি এঁটেছিল।
- ৭. হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অপ্রতিরোধ্যতা: মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালীতে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন কাভারেজের কারণে আমেরিকা কোনোভাবেই সামরিক উপায়ে তার একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
- ৮. চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা: চীনের বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি মধ্যপ্রাচ্যের তেল হওয়ায় বেইজিং কখনোই ইরানের পতনের সুযোগ আমেরিকাকে দেবে না।
- ৯. মন্ট্রেক্স চুক্তির আদলে নতুন চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী শান্তির স্বার্থে হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সময়ের দাবি, যা তুরস্কের বসফরাস চুক্তির মতোই সফল হতে পারে।
- ১০. ছদ্মবেশী মার্কিন সেনার ঝুঁকি: বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন ছদ্মবেশী সেনাদের উপস্থিতি এই আন্তর্জাতিক রুটকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধের বারুদ বানিয়েছে।
- ১১. প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ইরানের আধুনিক কৌশল: ইরান সরাসরি কোনো হামলার দায় স্বীকার না করে পরোক্ষভাবে মার্কিন জাহাজকে অচল করে দেওয়ার মাধ্যমে একটি বুদ্ধিদীপ্ত মনস্তাত্ত্বিক ছায়াযুদ্ধ খেলছে।
- ১২. ইউরোপের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্পের একতরফা উগ্র নীতির সাথে একমত না হয়ে ফ্রান্স-ব্রিটেনের মাধ্যমে পৃথক মধ্যপন্থী জোট গঠনে বেশি মনোযোগী।
- ১৩. ট্রাম্পের একগুঁয়েমির ওপর বেইজিংয়ের লাগাম: আসন্ন চীন সফর এবং আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার গুরুত্ব মাথায় রেখেই ট্রাম্প চীনের রক্তচক্ষুকে সমীহ করে প্রজেক্ট ফ্রিডম দ্রুত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
- ১৪. খাতামুল আম্বিয়ার আনুষ্ঠানিক হুংকার: ইরানের এই সামরিক সদর দপ্তর সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে আমিরাতের বন্দর ব্যবহার করে কোনো হামলা বা চক্রান্ত হলে আবুধাবি বা দুবাইকে তার চরম মূল্য দিতে হবে।
- ১৫. নতুন বহু-মেরুকরণ বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World): হরমুজ প্রণালী সংকট প্রমাণ করে যে একক মার্কিন বিশ্ব আধিপত্যের অবসান ঘটেছে এবং এখন চীন-রাশিয়া-ইরান অক্ষ মিলে বিশ্বের গতিপথ নির্ধারণ করছে।