আমেরিকার বি-৫২ বোম্বার বিধ্বস্ত ও ট্রাম্পের জ্বালানি সংকট: অবশেষে নমনীয় নেতানিয়াহু, চুক্তিতে বাধ্য হচ্ছে ইসরাইল
আমেরিকার বি-৫২ বোম্বার বিধ্বস্ত ও ট্রাম্পের জ্বালানি সংকট: অবশেষে নমনীয় নেতানিয়াহু, চুক্তিতে বাধ্য হচ্ছে ইসরাইল
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা এবং পরোক্ষ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এই চুক্তির ঠিক পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের অন্যতম প্রধান সামরিক অহংকার বি-৫২ স্ট্র্যাটেজিক বোম্বার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের তীব্র কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের সংকট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের শর্ত মেনে চুক্তি করতে বাধ্য করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এতদিন ধরে যুদ্ধের হুঙ্কার দেয়া ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চরম নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। পর্দার আড়ালের নানা সমীকরণ, মার্কিন চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর ও দীর্ঘ বিশ্লেষণ নিয়ে হাজির হয়েছে ক্রনিকল পয়েন্ট (Chronicle Point)।
১. ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ড এয়ারবেজে ভয়াবহ বিপর্যয়
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং দীর্ঘ পাল্লার পারমাণবিক হামলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন বি-৫২ (B-52) স্ট্র্যাটেজিক বোম্বার বিমানটি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ড এয়ারবেজ থেকে উড্ডয়নের ঠিক পরপরই বিমানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পাইলটরা জরুরি অবতরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। রানওয়েতে নাক থুবড়ে পড়ে বিশাল আকৃতির এই যুদ্ধবিমানটি। দুর্ঘটনার পরপরই পুরো এয়ারবেজ এলাকা ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং মার্কিন সামরিক শক্তির এক বিশাল ক্ষতি সাধিত হয়।
২. শনির দশা মার্কিন বিমান বাহিনীতে: নিহত ৮ নাগরিক
এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় বিমানের ভেতরে থাকা আটজন মার্কিন নাগরিক বা ক্রু সদস্য অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাটি মার্কিন সামরিক মহলে গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এর ঠিক একদিন আগেই ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে একটি এফ/এ-১৮ হর্নেট যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল। পর পর দুই দিনে দুটি শক্তিশালী ও কৌশলগত যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনা মার্কিন বিমান বাহিনীর সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় ধাক্কা।
৩. বি-৫২ বোম্বার: আমেরিকার পারমাণবিক অহংকারের প্রতীক
বি-৫২ স্ট্র্যাটেজিক বোম্বার বিমানটি সাধারণ কোনো যুদ্ধবিমান নয়। ১৯৫৫ সালের দিকে তৈরি এই সাবসোনিক জেট চালিত বিমানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমাবহনকারী অন্যতম প্রধান শক্তি। এটি প্রায় ৩২ হাজার কেজি ওজনের আধুনিক অস্ত্র ও বোমা নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে হামলা চালাতে সক্ষম। ইতিহাসে এই বিমানের ট্র্যাক রেকর্ড অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে এটির এভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
৪. ইরানের সাথে আকাশযুদ্ধে আমেরিকার অতীতের ক্ষয়ক্ষতি
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাথে বিগত মাসগুলোতে চলা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিভিন্ন এয়ার ডিফেন্সের আঘাত, ফ্রেন্ডলি ফায়ার কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ৪২টি বিভিন্ন ক্যাটাগরির ড্রোন ও যুদ্ধবিমান হারিয়েছে আমেরিকা। যুদ্ধ পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শেষ হলেও মার্কিন সামরিক খাতের এই ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি ও বি-৫২ বোম্বারের বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, পেন্টাগনের উপর মানসিক ও কৌশলগত চাপ কতটা প্রকট ছিল।
৫. ইরানের বিজয়োল্লাস: মার্কিন নৌ অবরোধের অবসান
এদিকে ইরান-আমেরিকা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তেহরানে অত্যন্ত প্রফুল্ল ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, তাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ কার্যত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে এবং এটি এখন আর কার্যকর নয়। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এখন কোনো ধরনের মার্কিন সামরিক বাধা ছাড়াই ইরানি বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজগুলো মুক্তভাবে চলাচল করতে শুরু করেছে, যা ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৬. হরমুজ প্রণালীতে নির্বিঘ্নে চলছে ইরানি তেলের ট্যাংকার
চুক্তির বাস্তবায়ন ইতিমধ্যেই সমুদ্রসীমায় দেখা যেতে শুরু করেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে ইরানের বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজগুলো কোনো রকম মার্কিন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আন্তর্জাতিক গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছে। একই সাথে পশুখাদ্য এবং অন্যান্য জরুরি পণ্যবাহী জাহাজ ওমান সাগর অতিক্রম করে ইরানের বন্দরে প্রবেশ করছে। আমেরিকার নৌবাহিনী এসব জাহাজকে দূর থেকে দেখলেও কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রয়েছে।
৭. গর্ত থেকে বেরিয়েই সুর নরম করলেন নেতানিয়াহু
ইরান ও আমেরিকার এই ঐতিহাসিক সমজোতা চুক্তির পর ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত কয়েকদিন ধরে প্রায় জনসম্মুখের আড়ালে ছিলেন। বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা ও চাপের মুখে অবশেষে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেন। তবে অতীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু যে ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক সুর ব্যবহার করতেন, এবার তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা গেছে। অত্যন্ত নমনীয় ও বিড়ালের মতো নরম সুরে তিনি আমেরিকার সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।
৮. মার্কিন বন্ধন ছিন্ন করার ক্ষমতা ইসরাইলের নেই
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে, ইসরাইল যতই নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করুক না কেন, আমেরিকার সাথে তাদের যে কৌশলগত ও সামরিক বন্ধন রয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, যদি কোনো কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের ওপর রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হয়, তবে ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমেরিকার যেকোনো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সাথে মিলেমিশে চলাই এখন ইসরাইলের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
৯. লেবাননে হামলার হুঙ্কার বন্ধের নির্দেশ
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী ও কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা বেশ কিছুদিন ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার জন্য হম্বিতম্বি করছিল। কিন্তু ইরান-আমেরিকা চুক্তির পর নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যেন লেবানন প্রসঙ্গে সবাই চুপ থাকে। আমেরিকা কঠোরভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, লেবাননে কোনো ধরনের হামলা এই চুক্তিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। ফলে নেতানিয়াহু এখন তার দেশের যুদ্ধবাজ নেতাদের শান্ত থাকার এবং আমেরিকার সিদ্ধান্তের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
১০. কট্টরপন্থী মন্ত্রী বেন-গাভিরের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা বাতিল
নেতানিয়াহুর সুর নরম হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো তার মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের ওপর আমেরিকার কঠোর আঘাত। বেন-গাভির ক্রমাগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করে আসছিলেন এবং ইসরাইলকে আমেরিকার কথা না শোনার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। এর জবাবে মার্কিন প্রশাসন বেন-গাভির এবং তার পুরো পরিবারের আমেরিকার ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা থাকলেও ওবামার পর ট্রাম্প প্রশাসনও তার জন্য ওয়াশিংটনের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
১১. ইউরোপেও নিষিদ্ধ হচ্ছেন ইসরাইলি কট্টরপন্থীরা
শুধু আমেরিকাই নয়, পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোও এখন ইসরাইলের কট্টরপন্থী ও যুদ্ধবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ইতালি, আয়ারল্যান্ড এবং ফ্রান্সসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই বেন-গাভির ও তার সমমনা নেতাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর ফলে ইসরাইলের এই কট্টরপন্থী নেতারা এখন আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং ইউরোপের দরজাও তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
১২. জেডি ভ্যান্সের আত্মবিশ্বাসী বার্তা: চুক্তিতে যোগ দেবে ইসরাইল
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (J.D. Vance) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'টাইমস অফ ইসরাইল'-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, ইসরাইল শেষ পর্যন্ত এই ইউএস-ইরাম চুক্তি মেনে নিতে এবং এতে যোগ দিতে বাধ্য হবে।" তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সঠিক 'রিমোট কন্ট্রোল' আমেরিকার হাতেই রয়েছে এবং ওয়াশিংটন চাইলে যেকোনো মুহূর্তে ইসরাইলের একক সামরিক অভিযান বন্ধ করে দিতে পারে।
১৩. ইলেকট্রনিক্যালি স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক ইরান-মার্কিন চুক্তি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বহুপ্রতিক্ষিত চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইলেকট্রনিক্যালি বা অনলাইনের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পূর্বে যে সম্ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন, ঠিক সেই পদ্ধতিতেই উভয় দেশ নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চুক্তির প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তির চূড়ান্ত অফিশিয়াল নথিপত্র বিনিময় ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে।
১৪. ট্রাম্পের তাড়াহুড়োর মূল কারণ: মার্কিন তেলের মজুদ শেষ পর্যায়ে
আমেরিকা কেন হঠাৎ এত তড়িঘড়ি করে ইরানের প্রায় সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে এই চুক্তি করল, তার পেছনের আসল রহস্য ফাঁস হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (Strategic Petroleum Reserve) ১৯৮৩ সালের পর বর্তমানে সর্বনিম্ন স্তরে এসে পৌঁছেছে। ইরানের ওপর অবরোধ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে আমেরিকার হাতে মাত্র চার মাসের তেল মজুদ রয়েছে, যার পরিমাণ ৩৪০ মিলিয়ন ব্যারেল। এই তীব্র জ্বালানি সংকট ও দেউলিয়াত্বের হাত থেকে বাঁচতেই ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
১৫. প্রকাশ্যে কুদস ফোর্সের জেনারেল ইসমাইল কানি: পশ্চিমাদের গালে চড়
এই পুরো যুদ্ধ ও রাজনৈতিক নাটকের মাঝে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল ইসমাইল কানির (Ismail Qaani) জনসম্মুখে আগমন। পশ্চিমা ও ইসরাইলি মিডিয়াগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে ইসমাইল কানি হয়তো নিহত হয়েছেন কিংবা তিনি একজন বিশ্বাসঘাতক ও মীরজাফর হিসেবে আটক হয়েছেন। কিন্তু সমস্ত অপপ্রচার উড়িয়ে দিয়ে জেনারেল কানি ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বীরের বেশে প্রকাশ্যে আসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, "আমাদের শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি, ইরানি জাতি আজ বিশ্বমঞ্চে বিজয়ী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।"
Chronicle Point Analysis:
- ১. মার্কিন সামরিক শক্তির দুর্বলতা প্রকাশ: ক্যালিফোর্নিয়ায় বি-৫২ বোম্বার বিধ্বস্ত হওয়া এবং পর পর দুই দিনে দুটি যুদ্ধবিমান হারানো প্রমাণ করে যে মার্কিন বিমান বাহিনী অভ্যন্তরীণ ও প্রযুক্তিগত সংকটে ভুগছে।
- ২. কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের সংকট: ১৯৮৩ সালের পর তেলের মজুদ সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে ইরানের সাথে চুক্তি করা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।
- ৩. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ: মার্কিন চাপের মুখে নেতানিয়াহুর নমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়া ইসরাইল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ পঙ্গু।
- ৪. কট্টরপন্থীদের ওপর চাবুক: মন্ত্রী বেন-গাভিরের ভিসা বাতিল করে আমেরিকা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে চরম মূল্য দিতে হবে।
- ৫. ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর অবস্থান: ইতালি, ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইসরাইলি মন্ত্রীদের নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ইসরাইলের একক আধিপত্যের অবসান ঘটাচ্ছে।
- ৬. ইরানের ভূ-রাজনৈতিক বিজয়: কোনো সামরিক পরাজয় ছাড়াই শুধুমাত্র কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখে ইরান নিজেদের ওপর থেকে সমস্ত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছে।
- ৭. হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে: নির্বিঘ্নে ইরানি তেলের ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
- ৮. লেবানন যুদ্ধের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া: আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের একটি নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট খোলার স্বপ্ন মাটি হয়ে গেছে।
- ৯. জেডি ভ্যান্সের দূরদর্শিতা: মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্য পরিষ্কার করে যে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের তৈরি করা রিমোট কন্ট্রোলের ওপর নির্ভরশীল।
- ১০. ডিজিটাল ডিপ্লোম্যাসির নতুন অধ্যায়: ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে ইলেকট্রনিক্যালি চুক্তি স্বাক্ষর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করল।
- ১১. ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধস: নেতানিয়াহুর এই নমনীয়তার কারণে দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী দলগুলোর কাছে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে।
- ১২. অপপ্রচারের অবসান ও কানির প্রত্যাবর্তন: জেনারেল ইসমাইল কানির প্রকাশ্যে আসা পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে।
- ১৩. কুদস ফোর্সের সক্রিয়তা: ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিরোধী মিলিশিয়াদের সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে জেনারেল কানির আড়ালে থাকা রণকৌশল সফল হয়েছে।
- ১৪. ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাস্তবমুখী নীতি: মুখে যতই ইরানের বিরোধিতা করুন না কেন, নিজের দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা বাঁচাতে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবসম্মত আপস নীতিই বেছে নিলেন।
- ১৫. মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তির ভারসাম্য: এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্য হ্রাস পেয়েছে এবং ইরান একটি পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।