ভারত সীমান্তে চীনের জে-২০ স্টিলথ ফাইটার মোতায়েন, গোপনে যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহু ও মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: ক্রনিকল পয়েন্ট বিশেষ বিশ্লেষণ
ভারত সীমান্তে চীনের জে-২০ স্টিলথ ফাইটার মোতায়েন, গোপনে যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহু ও মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: ক্রনিকল পয়েন্ট বিশেষ বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বইছে তুমুল পরিবর্তনের হাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, যেখানে হিমালয় অঞ্চলে আধুনিক ৫ম প্রজন্মের জে-২০ স্টিলথ ফাইটার জেট মোতায়েন করেছে বেইজিং। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে পৌঁছেছে চীনের অত্যাধুনিক ভিটি-৫ লাইট ট্যাংক। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গোপনে বৈঠক করতে ওয়াশিংটনে পাড়ি জমিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের নামে কূটনৈতিক নাটক এবং লোহিত সাগরে বাব-এল-মানদেব প্রণালী অবরুদ্ধ করার ইরানি হুমকিতে বিশ্ব অর্থনীতি ও সামরিক কৌশল নতুন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। ক্রনিকল পয়েন্টের পাঠকদের জন্য বিশ্ব রাজনীতির এই সুদূরপ্রসারী ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
১. হিমালয় সীমান্তে চীনের জে-২০ স্টিলথ ফাইটার মোতায়েন ও দিল্লির উদ্বেগ
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে এক অভাবনীয় মোড় এনে দিয়েছে তিব্বত ও লাদাখ সংলগ্ন সীমান্ত বিমানঘাঁটিগুলোতে চীনের সর্বাধুনিক ৫ম প্রজন্মের ‘জে-২০’ (J-20) স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘটনা। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ভারত সীমান্তসংলগ্ন চীনের দুটি কৌশলগত বিমানঘাঁটিতে মোট ১১টি জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে—যার একটি ঘাঁটিতে ৭টি এবং অন্যটিতে ৪টি স্টিলথ জেট অবস্থান করছে। এই খবর প্রকাশিত হতেই ভারতের সাউথ ব্লকে সামরিক ও কূটনৈতিক মহলে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এই স্টিলথ বিমানগুলো ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একপ্রকার অকার্যকর করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
২. ভারত ও চীনের বিমানবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার তুলনা
চীনের জে-২০ বিমানের বিপরীতে ভারতের বর্তমান বিমানবাহিনীর সক্ষমতা দৃশ্যত বেশ পিছিয়ে। ভারতের কাছে বর্তমানে প্রধান আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে রয়েছে ফরাসি প্রযুক্তির সাড়ে চার প্রজন্মের (4.5 Generation) ৩৬টি রাফায়েল (Rafale) যুদ্ধবিমান। বিপরীতে চীন প্রতি বছর গড়ে ১২০টিরও বেশি নতুন জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান নিজেদের বহরে যুক্ত করছে। ৫ম প্রজন্মের স্টিলথ প্রযুক্তির কারণে চীনের এই বিমানগুলো ভারতের আধুনিক এস-৪০০ (S-400) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা দূরপাল্লার রাডারে ধরা পড়া প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তির দিক থেকে ভারত যেখানে এখনও ৪.৫ প্রজম্মেই সীমাবদ্ধ, সেখানে চীন ৫ম প্রজম্মের যুদ্ধবিমানের বিশাল বহর সীমান্ত রেখায় সাজিয়ে দিল্লির ওপর মানসিক ও সামরিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
৩. বাংলাদেশ সীমান্ত নীতি ও ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো
ভারত তাদের উত্তর সীমান্তে চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি পূর্ব সীমান্তেও সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি শিলিগুড়ি সফরকালে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত ১৪ কোটি টাকার বাজেটে কাটাতারের বেড়া পুনর্নির্মাণ ও নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একই সাথে পূর্ব সীমান্তে রাফায়েল জেট ও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েনের খবরও চাউর হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি এবং চীন সীমান্ত উত্তেজনার সার্বিক প্রভাব সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে।
৪. বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে চীনের ভিটি-৫ লাইট ট্যাংকের নতুন বহর যুক্ত
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তাপরিবেশের মধ্যে বাংলাদেশ নিজেদের সামরিক আধুনিকায়ন বজায় রেখেছে। চীনের তৈরি সর্বাধুনিক ‘ভিটি-৫’ (VT-5) লাইট ট্যাংকের একটি বড় চালান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এসে পৌঁছেছে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হালকা ওজন, আধুনিক সাঁজোয়া প্রতিরক্ষা ও দুর্গম পাহাড়ি কিংবা কাদা-মাটির ভূখণ্ডে দ্রুত চলাচলের সুবিধার্থে নকশা করা এই ৪৪টি ভিটি-৫ ট্যাংক বাংলাদেশের স্থল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতা বজায় রাখতে এটি একটি যুগান্তকারী সংযোজন।
৫. প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বাবলম্বিতা ও আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে এখন কেবল অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কৌশলগত আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চীনে তৈরি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল (ATGM) লাইসেন্সের আওতায় নিজস্ব কারখানায় সফলভাবে উৎপাদন করছে। এছাড়া পুরনো সাঁজোয়া যান ও ট্যাংকের আধুনিকায়নে পাকিস্তানের ‘আল-খালিদ’ ট্যাংক কারখানার প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। চীন, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের প্রাগম্যাটিক বা বাস্তবসম্মত সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক যেকোনো ধরনের বাহ্যিক আগ্রাসন প্রতিরোধে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
৬. গোপন সামরিক ঘাঁটিতে নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন যাত্রা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত গোপনে ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের পরোয়ানা জারি থাকায় কোনো বেসামরিক বিমানবন্দর বা সাধারণ প্রটোকল ব্যবহার না করে ইসরায়েলের মরুভূমির ভেতরে অবস্থিত একটি গোপন সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে তিনি রওয়ানা হন। আইসিসি পরোয়ানার আইনি ঝুঁকি এড়াতে সফরসঙ্গী বিমানটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমা ও অত্যন্ত সুরক্ষিত রুট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়।
৭. নিউ ইয়র্ক মেয়রের হুঁশিয়ারি ও ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর এই গোপন সফর কূটনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্ক শহরে পা রাখলে স্থানীয় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। এই চরম আইনি জটিলতার কারণে নেতানিয়াহুর মূল নজর এখন ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান টিকিয়ে রাখা এবং মার্কিন রাজনৈতিক ও আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করাই এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য।
৮. তুরস্কের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত
নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল তুরস্কের কাছে মার্কিন ৫ম প্রজন্মের এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বিক্রি ঠেকানো। ইসরায়েলের আশঙ্কা, তুরস্ক এফ-৩৫ হাতে পেলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক এরিয়াল প্রাধান্য ক্ষুণ্ন হবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি আপত্তিকে তোয়াক্কা না করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে তা কোনো তৃতীয় দেশ নির্ধারণ করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থেই তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রদানের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হচ্ছে।
৯. তুরস্কের এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও আঙ্কারার চতুর ডিপ্লোম্যাসি
আমেরিকার সাথে এফ-৩৫ চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ (S-400) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুরস্কের জন্য অন্যতম অনুঘটক ছিল। তুরস্ক স্পষ্ট করেছে যে, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এফ-৩৫ বিমানের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত তারা এস-৪০০ চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়ো করবে না। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন প্রতিনিধি টম বারাকের সাথে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক পরিচালনা করছেন। ন্যাটো সদস্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে একই সাথে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাল চালছে আঙ্কারা।
১০. ইরানি প্রতিরক্ষা মুখপাত্রের বার্তা ও ত্রি-মাত্রিক শক্তি প্রদর্শন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি চাপের মুখে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাইনিক এক তেজস্বী বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইরান দাবি করেছে, সামরিক সক্ষমতায় তারা এখন এক নতুন বৈশ্বিক উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। তাদের শক্তির মূল ভিত্তি তিনটি উপাদান: ১. অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক শক্তি, ২. দেশের ৯৫ শতাংশেরও বেশি জনগণের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সমর্থন এবং ৩. নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। সামরিক শক্তিতে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ময়দানে ইরান সমানে সমান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
১১. বাব-এল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালী বন্ধের ভৌগোলিক হুমকি
ইরান ও তার সমর্থিত আঞ্চলিক অক্ষ তাদের ওপর যেকোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের জবাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের কৌশলগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব-এল-মানদেব’ (Bab-el-Mandeb) প্রণালী অবরুদ্ধ করা হলে বিশ্ব বাণিজ্য কার্যত থমকে যাবে। মাত্র ৩০ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালীটি বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার সুয়েজ খাল ভিত্তিক মূল শিপিং রুট অকেজো হয়ে পড়বে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্যদ্রব্যের বাজারে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করবে।
১২. সুয়েজ রুট বনাম আফ্রিকা ঘোরার বিকল্প: বৈশ্বিক অর্থনীতির বিপর্যয়
যদি বাব-এল-মানদেব প্রণালী সামরিক সংঘাতের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুয়েজ খালের পথ ছেড়ে পুরনো ভাস্কো-দা-গামার যুগের মতো পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) হয়ে যাতায়াত করতে হবে। এর ফলে যে পণ্য সুয়েজ খাল দিয়ে পৌঁছাতে মাত্র ৭ দিন সময় লাগতো, তা পৌঁছাতে লাগবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিন। এতে জাহাজের জ্বালানি খরচ, ইন্স্যুরেন্স ফি এবং সময় বহুগুণ বেড়ে গিয়ে এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও মারাত্মক সংকটে ফেলবে।
১৩. গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনীর নামে নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক চাতুরী
আন্তর্জাতিক মহলের অব্যাহত চাপ প্রশমিত করতে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাস্তবে যা ঘটেছে, তা কূটনৈতিক আই-ওয়াশ বা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। প্রথমে আলোচনা ছিল তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন প্রধান মুসলিম দেশের অংশগ্রহণে প্রায় ১ লাখ সেনার একটি আন্তর্জাতিক তদারকি বাহিনী গঠিত হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু চতুরতার সাথে মাত্র ২০০ জন সৈন্যের একটি ক্ষুদ্রতম দলকে রাফা সীমান্তে অবস্থান নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে কেবল উগান্ডা এবং মরক্কোর সেনা।
১৪. মরক্কো-ইসরায়েল গোপন সমীকরণ ও উগান্ডার সামরিক ভূমিকা
গাজায় সেনা পাঠানোর জন্য নির্বাচিত দুটি দেশের ভূমিকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। মরক্কো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সাথে প্রতিরক্ষা ও ড্রোন চুক্তি সম্পন্ন করে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। অপর দেশ উগান্ডা মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলগত বলয়ের অন্তর্ভুক্ত। এই ২০০ সেনার ক্ষুদ্র উপস্থিতি গাজায় চলমান বেসামরিক গণহত্যা বা ইসরায়েলি বিমান হামলা বন্ধে কোনো কার্যকর অবদান রাখতে পারবে না। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন সফরে ট্রাম্পের সামনে ‘আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী মেনে নেওয়া হয়েছে’ বলে বড়াই করার উদ্দেশ্যেই এই আই-ওয়াশ করা হয়েছে।
১৫. ইসরায়েলি বিরোধী জোটের দ্বি-রাষ্ট্র নীতি প্রত্যাখ্যান ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হলেও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি বা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সম্প্রতি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তারা কখনোই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন মেনে নেবেন না। এমনকি সৌদি আরবের সাথে ইসরায়েলের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শর্ত হিসেবেও যদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আসে, তবুও তারা তা প্রত্যাখ্যান করবে। ফলে ইসরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ উগ্রপন্থী নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অদূর ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনার অবসান ঘটার সুযোগ ক্ষীণ।
Chronicle Point Analysis:
- ১. হিমালয় সীমান্তে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন: চীন সীমান্তে ১১টি জে-২০ স্টিলথ ফাইটার মোতায়েন করায় ভারতের উত্তর সীমান্তে বিমান প্রতিরক্ষার মারাত্মক কৌশলগত ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে।
- ২. ৫ম প্রজন্ম বনাম ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের ব্যবধান: ভারতের ৩৬টি রাফায়েল বিমানের বিপরীতে চীনের বার্ষিক ১২০টি জে-২০ তৈরির সক্ষমতা এশীয় অঞ্চলে চীনের নিরঙ্কুশ আকাশ আধিপত্য সুনির্দিষ্ট করে।
- ৩. ভারতের পূর্ব সীমান্ত উদ্বেগ: শিলিগুড়ি কোরিডোর ও বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে ভারতের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক বাজেট বরাদ্দ তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ নির্দেশ করে।
- ৪. বাংলাদেশের প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি: ভিটি-৫ লাইট ট্যাংক হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্রে নিজেদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করল।
- ৫. আঞ্চলিক কৌশলগত জোটের গুরুত্ব: চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত ও সামরিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় সমতার নীতি বজায় রাখতে সহায়ক।
- ৬. আইসিসির আইনি পরোয়ানা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা: গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এড়াতে গোপন সামরিক ঘাঁটি থেকে নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা ইসরায়েলি নেতৃত্বের আইনি ঝুঁকি প্রমাণ করে।
- ৭. ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ইসরায়েলি লবিং: ওয়াশিংটন সফরে নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ট্রাম্পের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালতের চাপ ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা করা।
- ৮. মার্কিন অস্ত্র নীতিতে স্বকীয়তা: তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে নেতানিয়াহুর আপত্তি নাকচ করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
- ৯. আঙ্কারার ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল: তুরস্ক এস-৪০০ এবং এফ-৩৫ চুক্তিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছে।
- ১০. ইরানের ত্রি-মাত্রিক প্রতিরোধ কৌশল: আধ্যাত্মিক মনোবল, ব্যাপক জনসমর্থন এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংমিশ্রণে ইরান আমেরিকার সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান শক্ত করেছে।
- ১১. বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর চোক-পয়েন্টের প্রভাব: বাব-এল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহে অভূতপূর্ব অচলবস্থা তৈরি করতে পারে।
- ১২. অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি: সুয়েজ খালের বদলে আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ চলাচলের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বৈশ্বিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতির নতুন তরঙ্গ আনবে।
- ১৩. গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের নাটক: ১ লাখ সেনার পরিবর্তে মাত্র ২০০ সেনা অনুমোদনের মাধ্যমে নেতানিয়াহু বিশ্ববাসীকে একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
- ১৪. তেল আবিবের অনুগত মিত্রদের পছন্দ: মরক্কো ও উগান্ডার মতো নির্দিষ্ট দেশকে নির্বাচন করে ইসরায়েল গাজায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাচ্ছে।
- ১৫. ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা: নাফতালি বেনেটের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বাস্তবায়নে সম্মত নয়।