হামাসের ঐতিহাসিক অস্ত্র সমর্পণ ও গাজা চুক্তি: ফিলিস্তিনের মুক্তি নাকি ভূ-রাজনৈতিক মহা ধোঁকা?
হামাসের ঐতিহাসিক অস্ত্র সমর্পণ ও গাজা চুক্তি: ফিলিস্তিনের মুক্তি নাকি ভূ-রাজনৈতিক মহা ধোঁকা?
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এবং 'বোর্ড অব পিস'-এর আহ্বানে গাজা উপত্যকায় ঐতিহাসিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৪ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে গাজার সকল প্রতিরোধ দল তাদের হাতে থাকা অস্ত্র হস্তান্তর করবে এবং বিনিময়ে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে দখলদার ইসরায়েল। তবে এই চুক্তি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য সত্যিকারের আজাদী ও সার্বভৌমত্ব বয়ে আনবে, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
১. মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক ঘোষণা ও চুক্তির প্রেক্ষাপট
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের নতুন রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক 'বোর্ড অব পিস'-এর দীর্ঘ মধ্যস্থতায় হামাস গাজায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ধ্বংসাত্মক সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে এই ঘোষণা ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আমূল বদলে দিতে পারে।
২. আগামী ১৫ দিনের নিরস্ত্রীকরণ সময়সীমা ও হামাসের শর্তাবলি
ঘোষিত চুক্তি অনুসারে, আগামী ১৪ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে গাজার সকল সশস্ত্র উপদলকে তাদের ভারী ও হালকা অস্ত্র জমা দিতে হবে। তবে এই অস্ত্র সরাসরি দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে দেওয়া হবে না। একটি নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক বডি বা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধায়কদের অধীনে নির্দিষ্ট স্থানে তা গচ্ছিত রাখা হবে। হামাসের মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এসব অস্ত্র জাতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে ন্যস্ত করা। তবে ইসরায়েল এই অস্ত্রগুলো সম্পূর্ণ বিনষ্ট করার দাবি তুলে নতুন জটিলতা তৈরি করছে।
৩. ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বাস্তবতা
চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ শুরু করলে ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সশস্ত্র বাহিনী ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করবে। কিন্তু এই সেনা প্রত্যাহারের স্পষ্ট কোনো চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার আগে তারা সীমান্ত বা কৌশলগত বাফার জোন থেকে সেনা সরাবে না। ফলে সামরিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়ে ফিলিস্তিনিরা পুনরায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৪. গাজায় অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট সরকার ও আন্তর্জাতিক তদারকি
চুক্তির প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে গাজায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একটি 'টেকনোক্র্যাট সরকার' গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই নতুন বেসামরিক প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী দলের অধীনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুনর্গঠন ও জরুরি ত্রাণ বিতরণ কাজ পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে গাজা থেকে হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই প্রশাসন সাধারণ ফিলিস্তিনিদের আস্থা কতটা অর্জন করতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে।
৫. বেজালেল স্মোটরিচের বিতর্কিত মন্তব্য ও 'গাজা খালি করার' ইসরায়েলি ষড়যন্ত্র
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শান্তি ও পুনর্গঠনের কথা বলছেন, ঠিক তখনই ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ চরম উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, গাজাবাসীরা আসলে এক উন্মুক্ত কারাগারে বন্দি রয়েছে এবং তারা স্বেচ্ছায় অন্য দেশে চলে যেতে চায়। তিনি মিশরকে তাদের সীমান্ত গেট খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান যাতে গাজাবাসী চিরতরে এলাকা ত্যাগ করে। এতে স্পষ্ট হয় যে, ইসরায়েলি কট্টরপন্থীদের মূল উদ্দেশ্য গাজা পুনর্গঠন নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট ও জনবসতি গড়ে তোলা।
৬. চুক্তি পরবর্তী ইসরায়েলি হামলা ও ১,২০০ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি
শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির খবরের মাঝেই গাজায় ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তথাকথিত শান্তি আলোচনার পর থেকেও গাজায় ১,২০০-এর বেশি নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, চুক্তি বা আলোচনার তোয়াক্কা না করে ইসরায়েল তাদের আগ্রাসী নীতি বহাল রেখেছে, যা মার্কিন মধ্যস্থতার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৭. আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে হামাসের আলোচনা ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা
হামাস এই কঠিন ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত কোনো একক আবেগের বশবর্তী হয়ে নেয়নি। তারা তাদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র দেশ—তুরস্ক, মিশর, ও সৌদি আরবের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার পরামর্শের পরেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। মাসের পর মাস ধরে চলা ইসরায়েলি বিমান হামলা, খাদ্য সংকট, এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থার অভাব এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ের কারণে গাজাবাসীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় হামাস কৌশলগত নমনীয়তা দেখাতে বাধ্য হয়েছে। এটি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক চরম রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
৮. 'আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী' ও নেতানিয়াহুর নতুন কূটকৌশল
চুক্তিতে গাজার সুরক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিধান রাখা হয়েছিল, যেখানে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া বা মিশরের মতো শক্তিশালী মুসলিম দেশের সেনাসদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চতুরতার সঙ্গে এই প্রস্তাব সীমিত করে দিয়েছেন। তিনি কেবল মরক্কো ও উগান্ডার মাত্র ২০০ সেনাসদস্যের উপস্থিতি অনুমোদনের শর্ত দিয়েছেন। এর মাধ্যমে গাজায় একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর আন্তর্জাতিক বলয় তৈরিতে বড় ধরনের বাধা তৈরি করা হয়েছে।
৯. পশ্চিম তীরের বাস্তবতা: নিরস্ত্রীকরণের পরও কি নিপীড়ন থামবে?
যারা মনে করছেন হামাস অস্ত্র ছাড়লেই ফিলিস্তিনে শান্তি ফিরবে, তাদের জন্য পশ্চিম তীর (West Bank) এক চাক্ষুষ উদাহরণ। পশ্চিম তীরে হামাসের কোনো সামরিক উপস্থিতি নেই, কিন্তু তবুও সেখানে প্রতিদিন ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জেনিন শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনি যুবকদের গ্রেপ্তার ও ইসরায়েলি সেটলারদের সন্ত্রাসী হামলা অব্যাহত রয়েছে। অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও যদি পশ্চিম তীরে নির্যাতন না থামে, তবে গাজায় অস্ত্র ছাড়ার পর শান্তির গ্যারান্টি কে দেবে?
১০. ঐতিহাসিক রেড ইন্ডিয়ান ট্র্যাজেডি ও ট্রাম্পের ফ্লোরিডা স্বপ্নের রূপক
ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজাকে 'ফ্লোরিডার মতো আলোঝলমল পর্যটন শহর' বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ শাসকরা নেটিভ আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে একাধিক চুক্তির মাধ্যমে প্রথমে নিরস্ত করেছিল, তারপর তাদের নিজেদের উর্বর জমি থেকে তাড়িয়ে টেক্সাস ও অ্যারিজোনার অনুর্বর মরুভূমিতে নির্বাসিত করেছিল। ইতিহাসবিদদের আশঙ্কা, ফিলিস্তিনিদেরকেও একই কৌশলে অস্ত্রহীন করে মিশরের সিনাই মরুভূমির অনির্দিষ্ট যাত্রায় পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে।
১১. মিশরে মার্কিন এলএনজি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা ও ইসরায়েলি 'ফলস ফ্ল্যাগ' আশঙ্কা
গাজা সংকটের মাঝেই মিশরের উপকূলে অবস্থিত দুটি মার্কিন এলএনজি (LNG) ট্যাঙ্কার জাহাজে রহস্যজনক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম ও ইসরায়েলি মিডিয়া তাত্ক্ষণিকভাবে এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার চেষ্টা করে। তবে কোনো গোষ্ঠী এখনো এর দায় স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকদের ধারণা, মিশরকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য এটি ইসরায়েলের তৈরি একটি সুপরিকল্পিত 'ফলস ফ্ল্যাগ' (False Flag) অপারেশন হতে পারে।
১২. ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য ও মুসলিম সংহতি
মিশরে হামলার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক বিশেষ বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, মিশর ইরানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও আঞ্চলিক অংশীদার। ইরানের প্রাথমিক অগ্রাধিকার হলো মিশরের সার্বিক নিরাপত্তা ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্য রক্ষা করা। আরাকচি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করে তাদের নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতী যুদ্ধ বাঁধাতে চাইছে। তাই আঞ্চলিক সংহতি রক্ষায় সব মুসলিম দেশকে সচেতন হতে হবে।
১৩. বাহরাইনে মার্কিন শেখ ঈসা সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক উত্তেজনা তীব্রতর রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি 'শেখ ঈসা'-তে ইরান শক্তিশালী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল মার্কিন ঘাঁটির মূল বিদ্যুৎ জেনারেটর ও নেভিগেশন কন্ট্রোল সিস্টেম। জেনারেটর বিকল হওয়ার ফলে ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
১৪. স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও 'টু-স্টেট সলিউশন'-এর ভবিষ্যৎ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘ দিন ধরে দ্বি-রাষ্ট্র নীতি বা 'Two-State Solution'-এর পক্ষে সোচ্চার। তবে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক চাপের তোয়াক্কা না করে ইসরায়েলের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনো অবস্থাতেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হতে দেবে না। অস্ত্র ত্যাগের পর যদি ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্র না পায়, তবে এই চুক্তি কেবল ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে স্থায়ী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
১৫. চূড়ান্ত মূল্যায়ন: ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকার লড়াই ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
সামগ্রিক বিচারে, গাজায় হামাসের অস্ত্র সমর্পণের সিদ্ধান্তটি ইতিহাস নির্ধারিত এক কঠিন রাজনৈতিক মোড়। এটি একাধারে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা থেকে বাঁচানোর একটি মরিয়া প্রচেষ্টা, আবার অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতারণার শিকার হওয়ার বিশাল ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ইসরায়েলকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য না করতে পারে, তবে এই চুক্তি ফিলিস্তিনি জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ধোঁকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা: ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হামাসের অস্ত্র ত্যাগের সম্মতি কোনো পরাজয় নয়, বরং অবরুদ্ধ গাজাবাসীকে চূড়ান্ত মানবিক বিপর্যয় ও গণহত্যা থেকে রক্ষার চরম কৌশলগত নমনীয়তা।
- ২. বিশ্বস্ততার সংকট: অতীতে ইসরায়েল একাধিক চুক্তি লঙ্ঘন করায় ১৫ দিনের মধ্যে হামাসের সর্বাত্মক নিরস্ত্রীকরণের শর্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বিশাল নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
- ৩. ইসরায়েলি কূটকৌশল: সৈন্য প্রত্যাহারে নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতামূলক সময়সূচি না রেখে ইসরায়েল চুক্তিটিকে নিজেদের সামরিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
- ৪. প্রশাসনিক রূপান্তর: অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট সরকার গাজার পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে পারলেও স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
- ৫. কট্টরপন্থীদের আসল চরিত্র: ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী স্মোটরিচের 'গাজা খালি করার' প্রস্তাব প্রমাণ করে যে, চুক্তি সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের ইসরায়েলি মানসিকতা অপরিবর্তিত রয়েছে।
- ৬. যুদ্ধবিরতির চরম ব্যর্থতা: আলোচনার সময়েও গাজায় ১,২০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও মধ্যস্থতাকারীদের নিষ্ক্রিয়তাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।
- ৭. মুসলিম বিশ্বের নীরব ভূমিকা: তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পরামর্শে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ফিলিস্তিনের টেকসই নিরাপত্তার জন্য তাদের সমন্বিত সামরিক ও কূটনৈতিক গ্যারান্টি প্রয়োজন।
- ৮. আন্তর্জাতিক বাহিনীর প্রহসন: শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলোকে বাদ দিয়ে মরক্কো ও উগান্ডার মাত্র ২০০ সেনাসদস্য মঞ্জুর করে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নজরদারিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
- ৯. পশ্চিম তীরের বাস্তব শিক্ষা: হামাসবিহীন পশ্চিম তীরে অব্যাহত ভূমি দখল ও নির্যাতন প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র প্রতিরোধ না থাকলেও ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ হয় না।
- ১০. ঐতিহাসিক প্রতারণার পুনরাবৃত্তি: নেটিভ আমেরিকানদের যেভাবে চুক্তির ফাঁদে ফেলে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল, গাজাবাসীকেও একইভাবে সিনাই মরুভূমিতে পাঠানোর সুদূরপ্রসারী নকশা দেখা যাচ্ছে।
- ১১. ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের কৌশল: মিশরের উপকূলে মার্কিন জাহাজে ড্রোন হামলা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ফাটল ধরিয়ে ইরানবিরোধী নতুন অক্ষ গড়ার ইসরায়েলি চক্রান্ত।
- ১২. ইরানি কূটনৈতিক প্রজ্ঞা: আব্বাস আরাকচির কূটনৈতিক বক্তব্য মিশর-ইরান সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলি বিভাজনমূলক উসকানিকে দক্ষতার সঙ্গে নস্যাৎ করেছে।
- ১৩. মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের প্রভাব: বাহরাইনে শেখ ঈসা ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর স্পর্শকাতরতা ও ভঙ্গুরতা উন্মোচন করেছে।
- ১৪. দ্বি-রাষ্ট্র নীতির মৃত্যু: ইসরায়েলি কট্টরপন্থীদের রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান এবং জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে অনিচ্ছা স্থায়ী শান্তিসম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
- ১৫. চূড়ান্ত সমীকরণ: ফিলিস্তিনিদের সার্বিক নিরস্ত্রীকরণ যদি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রূপান্তরিত না হয়, তবে এই চুক্তি ভূ-রাজনৈতিক ধোঁকা হিসেবেই গণ্য হবে।