মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা: পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত চাল, বিশ্ব অর্থনীতির সংকট এবং বৈশ্বিক মেরুকরণের ভূরাজনৈতিক পোস্টমর্টেম
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা: পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত চাল, বিশ্ব অর্থনীতির সংকট এবং বৈশ্বিক মেরুকরণের ভূরাজনৈতিক পোস্টমর্টেম
বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগস্থলে এসে পৌঁছেছে। ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যকার প্রক্সি যুদ্ধ এখন আর কোনো গোপন ছায়াযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। ওয়াশিংটন থেকে মস্কো এবং বেইজিং থেকে ব্রাসেলস পর্যন্ত—বিশ্বের প্রতিটি পরাশক্তি এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় তৎপর। পারমাণবিক সক্ষমতা, ড্রোন প্রযুক্তি, হরমুজ প্রণালীর জলপথ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক ও সামরিক মারপ্যাঁচ তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববাসীকে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ক্রনিকল পয়েন্টের এই বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে এসেছে চলমান এই সংকটের পেছনের শক্তিসমূহ, সামরিক সমীকরণ এবং সম্ভাব্য দূরবর্তী প্রভাবের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণী চিত্র।
১. সংঘাতের প্রত্যক্ষ পটভূমি ও ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘাতের রূপান্তর
গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত মূলত প্রক্সি গোষ্ঠী বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়াকে ব্যবহার করে তেহরান ইসরায়েলের চারপাশে একটি "প্রতিরোধের বলয়" গড়ে তোলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি মিসাইল ও ড্রোন হামলা এই ছায়াযুদ্ধের প্রথাগত নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। সরাসরি সার্বভৌম ভূখণ্ডে আঘাত হানার মাধ্যমে উভয় পক্ষই তাদের প্রতিরক্ষা নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণকে তছনছ করে দিয়েছে।
২. তেহরানের কৌশলগত সামরিক অবস্থান ও ড্রোন-মিসাইল প্রযুক্তির প্রভাব
ইরানের সামরিক শক্তি কেবল সদস্য সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যালাস্টিক মিসাইল ও কম খরচের আত্মঘাতী ড্রোনের (যেমন শাহেদ সিরিজের ড্রোন) বিশাল মজুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিম এশিয়ার ভূখণ্ডে ইরান এমন এক আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল আয়রন ডোম কিংবা এরো-৩ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। ইরানের এই অসম যুদ্ধনীতি (Asymmetric Warfare) প্রতিপক্ষকে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ১০ গুণ বেশি অর্থ খরচে বাধ্য করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৩. ইসরায়েলের নিরাপত্তা ডকট্রিন ও আগাম হামলার প্রতিরক্ষা নীতি
ইসরায়েলের সামরিক নীতির মূল ভিত্তি হলো "প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক" বা আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা। ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করে যে নিজের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করার মতো ভৌগোলিক গভীরতা তাদের নেই। তাই শত্রুর সামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে তারা আগাম হামলা চালাতে দ্বিধা করে না। তেল আবিব তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং বিমান বাহিনীর সুনির্দিষ্ট আক্রমণাত্মক ক্ষমতার ওপর ভর করে ইরানের ড্রোন ঘাঁটি ও পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানার কৌশল অব্যাহত রেখেছে, যা দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৪. হোয়াইট হাউসের ভূমিকা: বাইডেন, ট্রাম্প এবং আমেরিকার এশীয়-মধ্যপ্রাচ্য নীতি
আমেরিকান রাজনীতিতে জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈদেশ নীতিতে ফারাক থাকলেও, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের দ্বি-দলীয় সমর্থন অপরিবর্তিত। তবে ওয়াশিংটন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে অনিচ্ছুক, অন্যদিকে তাদের মূল নজর চীনের দিকে শিফট করতে চায়। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি মার্কিন প্রশাসনকে বারবার মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ইরান নীতি এবং বাইডেন প্রশাসনের কূটনৈতিক দরকষাকষির মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব আমেরিকার বিশ্বব্যাপী প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
৫. ক্রেমলিনের হিসেব-নিকাশ: ভ্লাদিমির পুতিন ও রাশিয়া-ইরান কৌশলগত অক্ষ
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক সামরিক সহযোগিতার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পুতিন ইরানের তৈরি ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি গ্রহণ করার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানকে রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যদি একটি বড় মাত্রার যুদ্ধ বেধে যায়, তবে তা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিমা মনোযোগ ও সামরিক সহায়তার দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেবে। ফলে ক্রেমলিন কৌশলে এই অস্থিতিশীলতাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক সুবিধার কাজে লাগাচ্ছে, যা রাশিয়ার বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
৬. বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
চীনের বিশাল অর্থনীতি সচল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা অপরিসীম। ইরান থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং সৌদি-ইরান ঐতিহাসিক কূটনৈতিক চুক্তি মধ্যস্থতার মাধ্যমে বেইজিং নিজেকে এক শান্তিকামী বিশ্বশক্তিরূপে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধ চীনের "বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ" (BRI) এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য পথকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলবে। চীন চাইবে না এই অঞ্চলে এমন কোনো সংঘাত তৈরি হোক যা তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ধ্বংস করে দেয়।
৭. হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদেব: বিশ্ব বাণিজ্যের কৌশলগত রক্তনালী
বিশ্ব তেলের বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিরা লাল সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে সমুদ্রপথের বাণিজ্যকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ইরান যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতিতে এক মারাত্মক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হবে, যার প্রভাব পুরো বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর পড়বে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড় ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্বের সংকট
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ইসরায়েল বারবার সতর্ক করেছে যে তারা ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না। যদি ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম হয়, তবে তা সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরের মতো দেশগুলোকেও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করবে। এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক ছাইয়ের স্তূপে পরিণত করার মতো এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
৯. আরব বিশ্ব ও আব্রাহাম চুক্তির ভবিষ্যৎ পরীক্ষা
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কোর সাথে ইসরায়েলের স্বাভাবিকীকরণ বা "আব্রাহাম চুক্তি" মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন জোটের জন্ম দিয়েছিল। তবে গাজা ও ইরানের সংঘাত এবং সাধারণ আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসরায়েল-বিরোধী তীব্র ক্ষোভের কারণে আরব শাসকদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা স্থগিত রেখেছে। আরব বিশ্ব এখন দ্বিধাবিভক্ত—একদিকে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ভয়, অন্যদিকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিজেদের জনগণের তীব্র আবেগ।
১০. ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকি মিলিশিয়ার সমন্বিত আক্রমণ
তেহরানের পরিচালনাধীন "অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স" বা প্রতিরোধ অক্ষ কেবল পৃথক কোনো সামরিক গোষ্ঠী নয়, এটি এক সমন্বিত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। লেবানন সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহর হাজার হাজার রকেট, ইয়েমেন থেকে হুথিদের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন আক্রমণ—সবকিছু ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একসাথে বহু ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখছে। এই বহুমুখী ফ্রন্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে (IDF) একই সাথে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে ভারসাম্য রক্ষা করতে চরম বেগ পেতে বাধ্য করছে।
১১. বিশ্ব অর্থনীতি ও ইউরোজোনের ওপর মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ছায়া
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কোনো আঞ্চলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকে না, এর প্রথম প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে। ইউরোপ যখন ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ান গ্যাস ও তেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতিকে অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, ফলে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে শিল্প পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি বিশ্বজুড়ে সুদের হার বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
১২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির ওপর প্রতিক্রিয়া: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারত তার তেলের চাহিদার ৮০% এর বেশি আমদানি করে এবং ইরানের চাবাহার বন্দরে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রক্ষা করছে, অন্যদিকে ইরানের প্রতিবেশী হিসেবে সতর্কতা বজায় রাখছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য রেমিট্যান্স আয় ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা এক বড় চিন্তার বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন; সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
১৩. তথ্যযুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
একবিংশ শতাব্দীর এই সংঘাত কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের নয়, এটি সাইবার স্পেস এবং সোশ্যাল মিডিয়ারও যুদ্ধ। ইরান ও ইসরায়েল উভয়েই প্রতিপক্ষের পাওয়ার গ্রিড, ব্যাংক, বিমানবন্দর এবং সরকারি সার্ভারে শক্তিশালী সাইবার হামলা চালাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে প্রতিপক্ষের জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। এই ডিজিটাল যুদ্ধ ক্ষেত্রটিকে আরও বেশি জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
১৪. জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক আইনের অকার্যকারিতা
চলমান এই সংকট জাতিসংঘের ভেটো ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ করতে পারছে না, কারণ পরাশক্তিগুলোর কাছে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থই মুখ্য। আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ) বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) রুলিং বাস্তবায়ন করার মতো প্রয়োজনীয় কার্যকর ক্ষমতা নেই। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার ব্যবস্থার ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যা এক ধরণের 'জঙ্গল রাজত্ব' (Law of the Jungle) তৈরি করছে।
১৫. সম্ভাব্য সমাধান ও সংঘাতের ভবিষ্যৎ পথরেখা: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি নতুন শান্তি চুক্তি?
সংঘাতের ভবিষ্যৎ মূলত দুটি পথের মুখোমুখি। প্রথমত, যদি মার্কিন কূটনীতি ব্যর্থ হয় এবং ইরান বা ইসরায়েল কোনো অনিয়ন্ত্রিত বড় আক্রমণ চালিয়ে বসে, তবে তা আমেরিকা ও সংলগ্ন শক্তিগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনবে, যা বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, পরাশক্তিগুলোর অঘোষিত সমঝোতা এবং কৌশলগত অবদমন (Deterrence) এর মাধ্যমে সংঘাতকে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আটকে রাখা এবং নতুন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে হাঁটা। বিশ্বের ভবিষ্যৎ এখন কূটনৈতিক টেবিলে বুদ্ধিমত্তার সাথে সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ছায়াযুদ্ধের সমাপ্তি: ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি মিসাইল হামলায় জড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে বহুকাল ধরে চলা ছায়াযুদ্ধের অধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে।
- ২. অসম যুদ্ধের কার্যকারিতা: কম খরচের ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান বহুগুণ দামি পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
- ৩. ইসরায়েলের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘমেয়াদী বহুমুখী যুদ্ধে (Multi-front War) ইসরায়েলের নিজস্ব জনবল ও অর্থনৈতিক সম্পদের ঘাটতি ধরা পড়ছে।
- ৪. মার্কিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব: ওয়াশিংটন এশিয়ায় চীনের ওপর নজর কেন্দ্রীভূত করতে চাইলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তাদের বাধ্য হয়ে মূল সামরিক মনোযোগ সেখানে ধরে রাখতে বাধ্য করছে।
- ৫. পুতিনের সুবিধা: ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিমা বিশ্ব ও মিডিয়ার নজর সরাতে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
- ৬. চীনের অর্থনৈতিক চিন্তা: চীন আন্তর্জাতিকভাবে শান্তির দূত সাজতে চাইলেও তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো তেলের সামুদ্রিক রুট সুরক্ষিত রাখা।
- ৭. বাণিজ্যের চরম ঝুঁকি: বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালী অচল হলে বৈশ্বিক লজিস্টিকস সার্ভিস ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অভাবনীয় ধস নামবে।
- ৮. পারমাণবিক ডমিনো ইফেক্ট: ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে রিয়াদ ও আঙ্কারাও দ্রুত একই পথে হাঁটবে, যা পারমাণবিক অস্থিতিশীলতা বাড়াবে।
- ৯. আব্রাহাম চুক্তির সংকট: ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা না থামলে আরব দেশগুলোর পক্ষে ইসরায়েলের সাথে প্রকাশ্য বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।
- ১০. অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির ভূমিকা: হুথি ও হিজবুল্লাহর মতো অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক গোষ্ঠীগুলো এখন প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর সমান প্রভাব বিস্তার করছে।
- ১১. বিশ্ব মূল্যস্ফীতি: অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আবার সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করবে, যা অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনবে।
- ১২. প্রবাসীদের নিরাপত্তা: দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারত রেমিট্যান্স সংকটে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
- ১৩. সাইবার যুদ্ধের তীব্রতা: ভৌত আক্রমণের পাশাপাশি সাইবার অ্যাটাক এখন কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পঙ্গু করে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার।
- ১৪. আন্তর্জাতিক কাঠামোর ব্যর্থতা: ভেটো ক্ষমতার প্রভাবে জাতিসংঘ একটি নিছক আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে, যার ফলে শক্তির জোরে আইন চালুর প্রবণতা বাড়ছে।
- ১৫. বৈশ্বিক মেরুকরণ: বিশ্ব এখন স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত—মার্কিন-নেটো অক্ষ বনাম রাশিয়া-চীন-ইরান সমর্থিত বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা।