২৩ বছরের পাকিস্তান আমল এবং ৫৫ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ। জানুন ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় ও নীরব শিল্প বিপ্লবের কাহিনী।
ইতিহাসের আড়ালে সত্য: ২৩ বছরের পাকিস্তান আমল বনাম ৫৫ বছরের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর কেটে গেছে সুদীর্ঘ ৫৫ বছর। কিন্তু ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মে আজ দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—যে ২৩ বছরের বঞ্চনা ও নির্যাতনের ইতিহাস আমাদের শেখানো হয়েছে, তার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু? পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা কি কেবলই আমাদের শোষণ করেছিল, নাকি তাদের হাত ধরেই এ দেশে ঘটেছিল এক অভূতপূর্ব নীরব শিল্প বিপ্লব? আজ আমরা মুখোমুখি হতে চলেছি এক চরম সত্যের। এই রিপোর্টে পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বনাম স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের বাস্তব চিত্রের একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা এবং এক অলৌকিক কাহিনীর মতো শোনায়।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি
আমাদের পাঠ্যপুস্তক এবং প্রচলিত ইতিহাসে দীর্ঘ দিন ধরে শেখানো হয়েছে যে, পাকিস্তান আমলে আমাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে পূর্ব পাকিস্তানে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমরা সর্বোচ্চ ৭ জনের নাম জানি এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ ও ডক্টর শামসুজ্জোহা সহ সর্বোচ্চ ৫-৬ জনের নাম ইতিহাসে নথিভুক্ত রয়েছে। উইকিপিডিয়া বা বিভিন্ন সরকারি তথ্যে ভাষা আন্দোলনে ৩৯ জন এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ৬১ জন নিহতের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে ইতিহাসকে যেভাবে একপেশেভাবে সাজানো হয়েছে, তার অনেক কিছুই প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।
২. দুই পাকিস্তানের বিচ্ছেদ এবং ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক সংকটের জের ধরে যখন দুই পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়, তখন আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই পাকিস্তানের এই বিচ্ছেদে মূল লাভবান হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। দুই পাকিস্তান এক থাকলে তারা ভারতের জন্য একটি বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল। বিচ্ছেদের পর পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষতি সাময়িক হলেও তারা আজ একটি পারমাণবিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তথাকথিত স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের এক ধরনের আধিপত্য ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আজ আমাদের সীমান্তগুলোতে প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের নাগরিকদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হলেও আমরা তার প্রতিবাদ করার ন্যূনতম সার্বভৌম অধিকার হারিয়ে ফেলেছি।
৩. আদমজী জুটমিল: প্রাচ্যের ড্যান্ডি প্রতিষ্ঠার নেপথ্য নায়কেরা
পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের পাটকে বলা হতো 'সোনালী আঁশ'। তবে এই পাটের সোনালী যুগের গোড়াপত্তন হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বাওয়া পাটকলের আদলে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বিশ্বখ্যাত 'আদমজী জুটমিল'। এটি ছিল তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম এবং অন্যতম আধুনিক পাটকল। এখানে উৎপাদিত উন্নত মানের পাটজাত পণ্য সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকায় ব্যাপকভাবে রপ্তানি করা হতো। স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ড্যান্ডি শহরের নামানুসারে নারায়ণগঞ্জকে তখন 'প্রাচ্যের ড্যান্ডি' বলা হতো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, তথাকথিত স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অপশাসন, দুর্নীতি এবং লুটপাটের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী এবং লাভজনক আদমজী জুটমিলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল ধাক্কা ছিল।
৪. চন্দ্রঘোনা ও খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের মাধ্যমে কাগজের স্বনির্ভরতা
আজ বাংলাদেশ শতভাগ কাগজ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা কাগজের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। অথচ আজ থেকে ৫৫ বছর আগে পূর্ব পাকিস্তান কাগজ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ছিল এবং এখান থেকে কাগজ বিদেশে রপ্তানি করা হতো। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (EPIDC) রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় প্রতিষ্ঠা করেছিল তৎকালীন এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'কর্ণফুলী পেপার মিল'। এছাড়া ১৯৫৯ সালে খুলনার খালিশপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় 'খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেড'। এই দুটি বৃহৎ কারখানায় বছরে হাজার হাজার মেট্রিক টন নিউজপ্রিন্ট ও লেখার কাগজ উৎপাদিত হতো। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে এগুলো বন্ধ ও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আমরা আজ আমদানিনির্ভর জাতিতে পরিণত হয়েছি।
৫. তেল শোধনাগার এবং দেশের একমাত্র রিফাইনারির ইতিহাস
একটি দেশের শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হলো পরিশোধিত জ্বালানি তেল। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অধীনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার 'ইস্টার্ন রিফাইনারি'। এই শোধনাগারটি স্থাপনের ফলেই পূর্ব পাকিস্তানে কম খরচে জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছিল। অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও আমাদের কোনো স্বাধীন সরকার দেশে নতুন একটিও তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি স্থাপন করতে পারেনি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেখানে পাকিস্তান সরকারের রেখে যাওয়া একমাত্র রিফাইনারিটির ওপর নির্ভর করেই আজ পর্যন্ত আমাদের চলতে হচ্ছে, যা স্বাধীন দেশের শাসকদের চরম ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে।
৬. পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ বিপ্লব ও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র
শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিদ্যুতের বিকল্প নেই। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে এক নীরব বিদ্যুৎ বিপ্লব ঘটেছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে নির্মাণ করেছিল 'কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র'। এছাড়া বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে শাহজীবাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের ঘরে ঘরে এবং নতুন নতুন শিল্প এলাকায় প্রথম বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। পাকিস্তান সরকারের এই বিশাল বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীনতার পরের দুই দশক এ দেশের শিল্পখাত টিকে ছিল।
৭. দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরসমূহের আধুনিকায়ন ও চট্টগ্রামের উন্নয়ন
চট্টগ্রাম বন্দর যদিও মুঘল আমল থেকেই আংশিক সচল ছিল, তবে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সমুদ্র বন্দরে রূপান্তর করার কৃতিত্ব পাকিস্তান সরকারের। ১৯৬০ সালে বন্দর কমিশনারকে রূপান্তর করে 'চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাস্ট' হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় এবং এর মূল অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন শুরু হয়। এছাড়া ওয়ান-স্টপ বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে বাগেরহাটে 'মংলা সমুদ্র বন্দর' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর পাশাপাশি পাকিস্তান আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্পাঞ্চল, খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকা এবং চিটাগাং ড্রাই ডক। এই সমস্ত যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলেই পূর্ব পাকিস্তান একটি শক্তিশালী শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছিল।
৮. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তকমা হারানোর ট্র্যাজেডি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ ঘটেছিল পাকিস্তান আমলে। শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ফলে সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড'। এটি বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। পাকিস্তান সরকারের অবদানের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম রাখা হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামানুসারে 'জিন্নাহ হল'। তবে স্বাধীনতার পর সেই গৌরবময় ইতিহাসকে অস্বীকার করে জিন্নাহ হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'সূর্য সেন হল'। এছাড়া ১৯৫৭ সালে স্থাপিত 'ইকবাল হল'-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'সার্জেন্ট জহুরুল হক হল'। আজ দলীয়করণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ১০০০-এর তালিকা থেকেও ছিটকে পড়েছে, যা এ দেশের উচ্চশিক্ষার ধ্বংসাত্মক রূপকে প্রকাশ করে।
৯. রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বুয়েটের মতো স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
পাকিস্তান সরকার মাত্র ২৩ বছরের শাসনামলে এ দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য যে পরিমাণ মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা আমাদের কল্পনার বাইরে। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় পাকিস্তান সরকারের সরাসরি অর্থায়নে। দেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান 'বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়'। এছাড়া দেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ 'বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)' ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকারের নির্দেশনায় একাডেমিক রূপ লাভ করে। এই ২৩ বছরে পাকিস্তান সরকার মোট চারটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার মধ্যে রুয়েট (১৯৬৪), চুয়েট (১৯৬৮) এবং কুয়েট (১৯৬৯) অন্যতম। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই মানের আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমরা আর তৈরি করতে পারিনি।
১০. আইয়ুব খানের স্বর্ণযুগ এবং মানসম্মত স্কুল-কলেজের বিকাশ
can be considered as the golden era of development. পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ১১ বছরের শাসনকালকে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই সময়ে এ দেশের মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে নটর ডেম কলেজ, রেসিদেন্সিয়াল মডেল কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ সহ শীর্ষস্থানীয় ২১টি কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল। এছাড়াও বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ এবং বরিশালের বিএম কলেজের মতো ঐতিহাসিক কলেজগুলোর অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হয়। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ১৯৫৫ সালে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক সহ মোট ১৭টি মানসম্পন্ন কারিগরি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিল পাকিস্তান সরকার, যেগুলোর শিক্ষার মান স্বাধীন বাংলাদেশে নির্মিত পলিটেকনিকগুলোর চেয়ে অনেক উন্নত ছিল।
১১. চিকিৎসা খাতের বুনিয়াদ এবং পিজি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা
ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শাসনামলে পূর্ব বাংলায় মাত্র একটি মেডিকেল কলেজ (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) আংশিক চালু ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের ২৩ বছরে এ দেশের গণমানুষের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব ঘটেছিল। ঢাকা মেডিকেলের আধুনিকায়ন ও বড় বড় বিভাগ চালুর নেপথ্যে ছিলেন বিশ্বখ্যাত পাকিস্তানি চিকিৎসকেরা। এছাড়া দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ১৯৫৮ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, ১৯৬২ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, একই বছরে সিলেট মেডিকেল কলেজ, ১৯৬৩ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ১৯৬৮ সালে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ এবং ১৯৭০ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তান সরকার। এমনকি ১৯৬৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা গবেষণা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার জন্য 'আইপিজিএমআর' (বর্তমানে পিজি হাসপাতাল বা বিএসএমএমইউ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
১২. ক্যাডেট কলেজ ও মেরিন একাডেমির মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি
পূর্ব পাকিস্তানের যুবকদের সামরিক বাহিনী ও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে দক্ষ করে তুলতে পাকিস্তান সরকার বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিয়েছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে অনেক ক্যাডেট কলেজ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানে কোনো ক্যাডেট কলেজ ছিল না। এই বৈষম্য দূরীকরণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৮ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, ১৯৬৩ সালে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ও মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ এবং ১৯৬৫ সালে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে এই ক্যাডেট কলেজগুলোর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া দক্ষ নৌ-কর্মকর্তা গড়ে তুলতে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত 'দ্যা মার্কেন্টাইল মেরিন একাডেমি' (বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি) আজও দেশের প্রধান সামুদ্রিক মানবসম্পদ তৈরি করে চলেছে।
১৩. পরিকল্পিত নগর ও আধুনিক স্থাপত্যের গোড়াপত্তন
ঢাকা শহরের আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরায়ণের রূপকার ছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। আজকের অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী এবং ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলো পাকিস্তান আমলেই নকশা ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এছাড়া আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন, যার কাজ ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের অধীনেই শুরু হয়েছিল। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন (১৯৬৮), যা তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও নান্দনিক স্টেশন ছিল, তাও পাকিস্তানের অবদান। ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ইসলামিক একাডেমি (বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন), মিরপুর চিড়িয়াখানা, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর, বাংলা একাডেমি, রামপুরা টেলিভিশন ভবন, ঢাকা স্টেডিয়াম, ঢাকা জাদুঘর এবং ঐতিহ্যবাহী হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সবই পাকিস্তান সরকারের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৪. রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও যমুনা সেতুর আদি পরিকল্পনা
বর্তমানে বাংলাদেশের আলোচিত মেগা প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোরই মূল বীজ বপন করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে। এই প্রকল্পের জন্য রূপপুরকে স্থান হিসেবে নির্বাচিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রায় ২০০ জন বাঙালি কর্মকর্তাকে বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। একইভাবে, যমুনা নদীর ওপর বহুমুখী সেতু নির্মাণের প্রস্তাবও ১৯৬৬ সালের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (NEC) অধিবেশনে প্রথম উত্থাপন ও অনুমোদন করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকারের রেখে যাওয়া এসব ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ও নকশার ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীনতার বহু বছর পর আমরা এগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি, যা প্রমাণ করে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকেরা এ অঞ্চলের উন্নয়নে কতটা আন্তরিক ছিলেন।
১৫. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনে স্বর্ণালী যুগের ভিত্তি স্থাপন
এ দেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিটি কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বই মূলত পাকিস্তান আমলের সৃষ্টি। তৎকালীন সময়ে যুক্ত পাকিস্তান ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন বাঙালি ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ। ক্রিকেট অঙ্গনে রকিবুল হাসানের মতো জীবন্ত কিংবদন্তিরা পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতে নায়ক রাজ্জাক, শাবানা, ববিতা, রুনা লায়লা এবং সাবিনা ইয়াসমিনের মতো নক্ষত্ররা পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রেডিও-টেলিভিশন ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরেই নিজেদের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে আমাদের সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে এমন মানের কোনো বিশ্বমানের শিল্পী বা ক্রীড়াবিদ তৈরি করা সম্ভব হয়নি, উল্টো আমরা আজ সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় অপসংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।
Chronicle Point Analysis:
- ১. মৃত্যুর সংখ্যা ও ইতিহাস বিকৃতি: রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ভাষা আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
- ২. ভূরাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি: দুই পাকিস্তানের বিভাজনের ফলে মূল সুবিধাভোগী ছিল ভারত, আর বাংলাদেশ ক্রমাগত সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ভারতের মুখাপেক্ষী হয়েছে।
- ৩. আদমজী জুটমিলের ট্র্যাজেডি: লুটপাট ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যের উৎস আদমজী স্বাধীন বাংলাদেশে বন্ধ হয়ে যায়।
- ৪. কাগজের উৎপাদন ধ্বংস: কর্ণফুলী ও খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ করে দিয়ে আমাদের আমদানিনির্ভর জাতিতে পরিণত করা হয়েছে।
- ৫. জ্বালানি নিরাপত্তার অভাব: ১৯৬৮ সালের পর ৫৫ বছরেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোনো তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি স্থাপন করতে পারেনি।
- ৬. পাকিস্তান আমলের বিদ্যুৎ খাত: কাপ্তাই ও শাহজীবাজারের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর ভিত্তি করে এ দেশের প্রথম শিল্পায়ন শুরু হয়েছিল।
- ৭. সমুদ্র বন্দর ও ভারী শিল্প: চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানার ভিত্তি পাকিস্তান আমলেই তৈরি হয়েছিল।
- ৮. শিক্ষার মান অবক্ষয়: প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে আজ বিশ্ব র্যাংকিংয়ে তলানিতে নেমে গেছে।
- ৯. উচ্চশিক্ষার ভিত্তি স্থাপন: বুয়েট এবং দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৭টি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে।
- ১০. স্কুল-কলেজের মানোন্নয়ন: নটর ডেম এবং ভিকারুননিসার মতো বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইয়ুব খানের শাসন আমলের সৃষ্টি।
- ১১. health সেক্টরের বুনিয়াদ: দেশের ৮টি প্রধান সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং পিজি হাসপাতাল পাকিস্তানের ২৩ বছরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- ১২. সামরিক ও কারিগরি নেতৃত্ব: ক্যাডেট কলেজ ও মেরিন একাডেমিগুলো আজও দেশের প্রতিরক্ষা এবং নৌ-খাতের প্রধান মানবসম্পদ তৈরি করছে।
- ১৩. আধুনিক স্থাপত্য ও পরিকল্পিত শহর: কমলাপুর স্টেশন, সংসদ ভবন ও গুলশানের মতো পরিকল্পিত শহর পাকিস্তানি পরিকল্পনাবিদদের নকশায় গড়া।
- ১৪. মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা: রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এবং যমুনা সেতুর মূল নকশা ১৯৬০-এর দশকেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
- ১৫. সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার অবক্ষয়: পাকিস্তান আমলের কিংবদন্তিদের শূন্যতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে আজ বাংলাদেশ অপসংস্কৃতির কবলে পড়েছে।