মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের নতুন মোড়: ইরাকে সৌদি-মার্কিন যৌথ বিমান হামলা, কুয়েতে ইরানের মিসাইল বৃষ্টি ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে তোলপাড়

📅 জুলাই, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের নতুন মোড়: ইরাকে সৌদি-মার্কিন যৌথ বিমান হামলা, কুয়েতে ইরানের মিসাইল বৃষ্টি ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে তোলপাড়

📅 ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ✍️ বিশেষ প্রতিনিধি, Chronicle Point

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ মোড়। দীর্ঘদিন ছায়াযুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকার পর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছে রাজকীয় সৌদি বিমান বাহিনী। ইরাকে অবস্থানরত ইরান সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোোর্স (PMF) ও বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া ঘাঁটিতে যৌথভাবে চালানো হয়েছে বিধ্বংসী বিমান হামলা। অন্যদিকে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ, হরমুজ প্রণালীতে চরম বাণিজ্যিক হুমকি এবং ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পাল্টা জবাবে তেহরানের রণকৌশল পুরো বিশ্বকে এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক এই চরম সংকট নিয়ে ক্রনিকল পয়েন্টের বিশেষ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ।

১. যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক বিস্তার: সরাসরি ময়দানে সৌদি বিমান বাহিনী

মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়ে রিয়াদ এবার ওয়াশিংটনের সাথে প্রকাশ্যে যৌথ সামরিক অপারেশনে অংশ নিয়েছে। এতদিন ধরে সৌদি আরব কেবল নিজ সীমানা রক্ষা কিংবা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দমনে মনোযোগ দিলেও, এবারই প্রথম তারা দেশের বাইরে—বিশেষ করে ইরাকের ভূখণ্ডে—ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের অবস্থান লক্ষ্য করে সরাসরি রিয়েল-টাইম এয়ার স্ট্রাইক পরিচালনা করেছে। এর মাধ্যমে রিয়াদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত এলে তারা আর দর্শক হয়ে থাকবে না।

২. ইরাকের কারবালা, বসরা ও বাবেলে আগুনের লেলিহান শিখা

সৌদি ও মার্কিন যৌথ বিমান বাহিনীর জঙ্গিবিমানগুলো ইরাকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহর কারবালা, দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় জ্বালানি হাব বসরা, বাবেল এবং কারবালার পার্শ্ববর্তী আউন শহরে সমন্বিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভিডিও সূত্রে দেখা গেছে, ইরান সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF)-এর প্রধান গোলাবারুদ ডিপো, প্রশাসনিক দপ্তর ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর পুরো এলাকা বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। এতে মিলিশিয়াদের অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

৩. আমেরিকার গোলাবারুদ সংকট ও ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’ কৌশল

টানা কয়েক সপ্তাহের তীব্র সামরিক ব্যবহারের ফলে ওয়াশিংটনের দূরপাল্লার প্রিসিশন-গাইডেড অ্যারোনিটিক্যাল গোলাবারুদ এবং এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছিল। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামানোর পেছনের মূল মার্কিন চক্রান্ত হলো সৌদি আরবের কাছে রক্ষিত বিশাল ও আধুনিক আমেরিকান অস্ত্রের মজুদ ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে পেন্টাগন নিজেদের অর্থ ও গোলাবারুদ সাশ্রয় করে সৌদি অস্ত্রভাণ্ডার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার "মাছের তেলে মাছ ভাজা"র বাস্তব রূপ দিচ্ছে।

৪. সৌদি বিমান ঘাটির উন্মুক্ত ব্যবহার ও নতুন সামরিক সুবিধা

পূর্বে রিয়াদ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ড বা বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে আঞ্চলিক অন্য কোনো মুসলিম দেশে সরাসরি আক্রমণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। কিন্তু বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের শীর্ষ সামরিক ঘাঁটিনু নির্দেশনামূলক অনুমোদন পাওয়ায় মার্কিন এয়ারফোর্স অতি দ্রুততার সাথে জ্বালানি রিফুয়েলিং এবং মধ্যবর্তী হামলা পরিচালনা করতে পারছে। এই সুবিধাটি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বিমান শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে এক বিশাল কৌশলগত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

৫. জিযান শোধনাগারে হামলা ও রিয়াদের চরম ধৈর্যচ্যুতি

দৈনিক প্রায় চার লাখ ব্যারেল তেল শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন সৌদি আরবের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জিযান ক্রুড অয়েল রিফাইনারিতে সম্প্রতি ড্রোন হামলা চালানো হয়। রিয়াদ প্রশাসনের অভিযোগ, কেবল ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথিরাই নয়, বরং ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপগুলো ড্রোন ও প্রজেক্টাইল ছুঁড়ে তাদের জ্বালানি খাতে আঘাত করেছে। যদিও ইরাকি মিলিশিয়ারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, কিন্তু একের পর এক জাতীয় আয়ের উৎসে আঘাত আসায় সৌদি আরবের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় এবং তারা প্রত্যক্ষ সামরিক পথ বেছে নেয়।

৬. কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ

ইরাকে বিমান হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান। গত কয়েক দিনের তথাকথিত যুদ্ধবিরতিকে একপাশে ঠেলে দিয়ে কুয়েতে অবস্থিত একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একের পর এক আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) হামলা স্বীকার করে জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর চেষ্টা করলেও একাধিক ঘাটিতে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে এবং মার্কিন অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ঘটনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন নিরাপত্তা বলয় চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

৭. হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তাপ: অবরুদ্ধ হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য

বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ওয়াশিংটন যখন ঘোষণা দেয় যে, মার্কিন ব্যাংকে আংশিক বাজেয়াপ্ত থাকা ইরানি অর্থ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তখন তেহরান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। আইআরজিসির (IRGC) মূখপাত্র স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যে দেশ বা কোম্পানি ইরানের বাজেয়াপ্ত অর্থ গ্রহণ করবে, তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এমনকি সেই জাহাজ দেখা মাত্রই ডুবিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সামরিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

৮. ইয়েমেনের আকাশে আনসারুল্লাহ হুথিদের হাত ধরে সৌদি ড্রোন ধ্বংস

সৌদি আরব যখন ইরাকে আক্রমণ চালায়, তখন দেশের দক্ষিণ সীমান্তে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথি বাহিনী তাদের সামরিক তৎপরতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। লোহিত সাগর ও ইয়েমেন সীমান্তে টহলরত একটি অত্যাধুনিক সৌদি সামরিক ড্রোন নিখুঁত এয়ার-ডিফেন্স মিসাইলের মাধ্যমে ভূপাতিত করে হুথিরা। এতে প্রমাণিত হয় যে, সৌদি আরব উত্তর দিকে নতুন ফ্রন্ট খুললেও দক্ষিণ সীমান্তে তাদের ওপর চাপ কমেনি, বরং এটি দ্বি-মুখী সামরিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

৯. ইউক্রেনীয় দুঃসাহস: সাগরে ইরানি অস্ত্রবাহী জাহাজে আক্রমণ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে হঠাৎ করেই নতুন মাত্রা যোগ করে পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্র ইউক্রেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওয়াশিংটন সফরের ঠিক প্রাক্কালে মার্কিন প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া থেকে ইরানগামী একটি কৌশলগত ভারী অস্ত্রবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় নৌ-কমান্ডোরা। কিয়েভের পক্ষ থেকে এটিকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দাবি করে প্রচার করা হয়, যা তেহরানকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে।

১০. তেহরানের কঠোর বার্তা ও কিয়েভের নজিরবিহীন ক্ষমা প্রার্থনা

ইউক্রেনীয় উস্কানির জবাবে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত মানচিত্র প্রকাশ করে দেখায় যে, কিয়েভ সহ পুরো ইউক্রেন তাদের লং-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইলের আওতাভুক্ত। তেহরানের পক্ষ থেকে সীমিত কিন্তু মারাত্মক সামরিক জবাব দেওয়ার হুমকির মুখে ব্যাকফুটে চলে যায় কিয়েভ। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দ্রুত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করে উক্ত ঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল না করার প্রতিশ্রুতিসহ ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন।

১১. মার্কিন ছায়ায় নেতানিয়াহুর চাল: আরব বনাম ইরান সংঘাতের চক্রান্ত

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছিলেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি যেন হুবহু সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন সফরে থাকা নেতানিয়াহু কলকাঠি নেড়ে মার্কিন বাহিনীকে সামনে রেখে মূলত আরব বিশ্বের সাথে ইরানের সরাসরি যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই কৌশলে ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক বাজেট বা সেনা হারানো ছাড়াই তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের আঞ্চলিক শক্তি ক্ষয় করা সহজ হচ্ছে।

১২. ভূগর্ভস্থ টানেল ও মিলিশিয়াদের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষাব্যূহ

ইরাকে বিমান হামলা চালিয়ে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা অন্যান্য শিয়া মিলিশিয়াদের সামরিক ভিত্তি একবারে নির্মূল করা অবাস্তব। বহু বছর ধরে কাসেম সুলেইমানির মেয়াদে তৈরি হওয়া শত শত মাইল দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার এবং বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড সেন্টার ইরাকের বিভিন্ন মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। ফলে কেবল বিমান হামলায় সাময়িক ক্ষতি হলেও, গ্রাউন্ড ট্রুপস ছাড়া এই মিলিশিয়াদের নিষ্ক্রিয় করা অসম্ভব বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

১৩. তেলের বাজারে অগ্নিমূল্য: বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির অশনি সংকেত

সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের হুমকির ফলে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে প্রচণ্ড অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড গড়ার দিকে এগোচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে এশিয়া, ইউরোপ ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করবে এবং নতুন করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঢল নামবে।

১৪. ছদ্মবেশী বিমান হামলা: বাহরাইন, কুয়েত ও ইউএই-র গোপন অংশগ্রহণ

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কেবল প্রকাশ্যে আসা সৌদি আরবই নয়, এর আগে পারস্য উপসাগরীয় একাধিক দেশ যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং কুয়েত ছদ্মবেশে বা নিজেদের লজিস্টিক ও গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সাথে শেয়ার করে ইরানের ভেতরে ও প্রক্সি ঘাঁটিতে হামলায় সহায়তা করেছে। এই গোপন আঞ্চলিক অক্ষ প্রকাশ হয়ে পড়ায় পুরো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) এলাকা এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

১৫. বৈশ্বিক পরিণতি: এক অনিশ্চিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব

ইরাক, ইয়েমেন, কুয়েত, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং দূরবর্তী ইউক্রেন—সবগুলো থিয়েটার এখন একই সুতোয় গেঁথে গেছে। রাশিয়া ও চীন পর্দার আড়াল থেকে ইরানের কূটনৈতিক ও কৌশলগত তদারকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো ও গালফ জোট ইসরায়েলকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও সামরিক আগ্রাসন যদি অবিলম্বে বন্ধ না হয়, তবে এটি বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে একটি বিশ্বব্যাপী পূর্ণাঙ্গ মহাসংগ্রামে রূপান্তরিত হতে পারে।

Chronicle Point Analysis:

  • ১. রাজকীয় বিমান বাহিনীর পদক্ষেপ: রিয়াদের সরাসরি বিমান আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে নতুন করে তৈরি করেছে।
  • ২. কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস: বসরা ও কারবালায় হামলা মিলিশিয়াদের রসদ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
  • ৩. আমেরিকার রসদ সাশ্রয়: পেন্টাগন নিজেদের অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে সৌদি প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার চতুরতার সাথে ব্যবহার করছে।
  • ৪. গালফ বেস অপ্টিমাইজেশন: সৌদি আকাশসীমা ও রানওয়ে ব্যবহারে মার্কিন নৌ ও বিমান শক্তি পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।
  • ৫. জ্বালানি সুরক্ষার ঝুঁকি: জিযান শোধনাগারে হামলার শোধ নিতে গিয়ে রিয়াদ তার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
  • ৬. কুয়েতে পাল্টা জবাব: মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ প্রমাণ করে যে তেহরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ন।
  • ৭. হরমুজ প্রণালী ও শিপিং সংকট: বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের হুমকি বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে অচল করে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
  • ৮. হুথিদের বিমান প্রতিরক্ষা: ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা সৌদি দক্ষিণ সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়েছে।
  • ৯. কিয়েভের চরম ভুল সিদ্ধান্ত: ইউক্রেন মার্কিন অনুমোদন পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইরানের সাথে অহেতুক নতুন শত্রুতা তৈরি করেছিল।
  • ১০. তেহরানের ভয়াবহ ব্যালিস্টিক ডিপ্লোমেসি: মিসাইল রেঞ্জ প্রদর্শন মাত্রই ইউক্রেনের নতি স্বীকার ইরানি প্রতিরোধের সক্ষমতা তুলে ধরে।
  • ১১. ইসরায়েলি প্রক্সি ডিপ্লোমেসি: নেতানিয়াহু নিজের সম্পদ না হারিয়ে আরবদের দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার খেলা খেলছেন।
  • ১২. টানেল নেটওয়ার্কের সুবিধা: দীর্ঘমেয়াদে বিমান হামলা চালিয়ে ইরাকি মিলিশিয়াদের নির্মূল করা মার্কিন জোটের জন্য অসম্ভব।
  • ১৩. আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ধস: তেলের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা এশিয়ার অর্থনীতির জন্য মারাত্মক।
  • ১৪. গালফ জোটের গোপন ফাঁদ: গোপন সামরিক আঁতাত ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পুরো উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সরাসরি মিসাইল টার্গেটে রূপ নিয়েছে।
  • ১৫. গ্লোবাল ক্যাসকেড ইফেক্ট: এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ইউক্রেন-রাশিয়া ফ্রন্টের সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বযুদ্ধ ঘটানোর সমস্ত রসদ তৈরি করছে।

পাঠকদের জিজ্ঞাসিত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. সৌদিয়া আরব কেন আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধে যুক্ত হলো? সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো যেমন জিযান শোধনাগারে একের পর এক ড্রোন হামলার পর রিয়াদ জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং মার্কিন চাপের মুখে সরাসরি ইরাকে বিমান হামলায় যোগ দেয়। ২. আমেরিকানদের যুদ্ধসামগ্রীর কী ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল? টানা কয়েক সপ্তাহের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের ফলে আমেরিকার প্রিসিশন উইপনস স্টকে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, যা মেটাতে তারা সৌদির অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করছে। ৩. ইরাকের কোন কোন শহরে এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছে? যৌথ বিমান হামলাগুলো মূলত কারবালা, বসরা, বাবেল এবং আউন শহরের ইরান সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হয়। ৪. কুয়েতে কী ঘটেছিল? ইরাকে বিমান হামলার জবাবে ইরান কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে দফায় দফায় ক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ৫. হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি কেন দেওয়া হলো? আমেরিকা বাজেয়াপ্ত ইরানি টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলে ইরান জানায়, যারাই এই টাকা নেবে তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে ডুবে দেওয়া হবে। ৬. ইউক্রেন কেন ইরানের জাহাজে হামলা করেছিল? ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি হোয়াইট হাউস সফরের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করা ও সাহসিকতা দেখানোর জন্য রাশিয়া থেকে আসা ইরানি জাহাজে ড্রোন আক্রমণ চালায়। ৭. ইউক্রেন কেন পরে ব্যাকফুটে এসে ক্ষমা চাইল? ইরান তাদের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিয়েভে সরাসরি জবাব দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় ইউক্রেন ভয় পেয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চায় এবং ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়। ৮. বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল কৌশল কী? নেতানিয়াহুর মূল কৌশল হলো ইসরায়েলের নিজস্ব সৈন্য বা অর্থ খরচ না করে আমেরিকা ও সৌদি আরবসহ অন্য আরব দেশগুলোকে দিয়ে ইরানের প্রক্সি ও ইরানকে ধ্বংস করা। ৯. সৌদি আরব কি এই হামলায় নিরাপদ থাকবে? না, বিমান হামলায় যুক্ত হওয়ায় ইরান সমর্থিত হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়ারা এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন দিয়ে সরাসরি সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ড ও তেলক্ষেত্রে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। ১০. কেবল বিমান হামলা চালিয়ে কি ইরাকি মিলিশিয়া দমন সম্ভব? কখনই নয়। ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের বহুগুণ বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ টানেল ও গোপন বাঙ্কার রয়েছে, যা কেবল আকাশপথে ধ্বংস করা অসম্ভব। ১১. ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথিরা সম্প্রতি কী পদক্ষেপ নিয়েছে? হুথিরা সৌদি আরবের সীমানার কাছে একটি অত্যাধুনিক রাজকীয় সৌদি ড্রোন মিসাইলের মাধ্যমে সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। ১২. তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে এর কী প্রভাব পড়বে? সৌদি আক্রমণ ও হরমুজ প্রণালীতে সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ১৩. আরব আমিরাত ও বাহরাইনের ভূমিকা কী ছিল? এই দেশগুলো ছদ্দবেশে এবং মার্কিন জোটকে নিজেদের ভূখণ্ড ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ বিমান হামলায় সহায়তা করেছে। ১৪. ইরান কি সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? ইরান সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধের হুমকির মাধ্যমে কার্যত সরাসরি সংঘাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ১৫. এই সংকটে সাধারণ বিশ্ব অর্থনীতি কীভাবে প্রভাবিত হবে? জ্বালানি সংকট বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়বে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দা দেখা দেবে।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এলো? প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিন

Website Total View