সৌদি-মার্কিন পরমাণু চুক্তিতে ট্রাম্পের 'আব্রাহাম ফাঁদ', মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ ও দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বড় তোলপাড়
সৌদি-মার্কিন পরমাণু চুক্তিতে ট্রাম্পের 'আব্রাহাম ফাঁদ', মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ ও দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বড় তোলপাড়
বিশ্ব ভূরাজনীতি ও সামরিক মেরুকরণে আবারও এক ভয়াবহ মোড় দৃশ্যমান হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম অর্থনীতি ও মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদী বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির অনুমোদন এবং এর আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের উত্থাপিত ভূরাজনৈতিক শর্ত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। একদিকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ব্যতিরেকেই ইসরাইলকে স্বীকৃতির চাপ, অন্যদিকে লোহিত সাগরে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথি বাহিনীর নতুন প্রতিরোধ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সমান্তরালে বাংলাদেশ-তুরস্ক সামরিক অক্ষের জোরদার অবস্থান—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির পটভূমি এক নজিরবিহীন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
১. ৩০ বছর মেয়াদী সৌদি-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির আদ্যোপান্ত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্প্রতি একটি দীর্ঘমেয়াদী ৩০ বছর মেয়াদী পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তায় সৌদি আরবে বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি ও বেসামরিক নিউক্লিয়ার প্রকল্প নির্মাণ করা হবে। মার্কিন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের কোম্পানিগুলো এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করবে। তবে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি ধাপে ওয়াশিংটনের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনোভাবেই এটি সামরিক পারমাণবিক অস্ত্রের রূপ নিতে না পারে।
২. ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া বার্তা ও 'আব্রাহাম একর্ড' শর্তের পেছনের ফাঁদ
পরমাণু চুক্তির সবুজ সংকেত দেওয়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এক বিস্ফোরক শর্ত উপস্থাপন করেছেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবকে যদি মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তির চূড়ান্ত সুবিধা ভোগ করতে হয় এবং মার্কিন কংগ্রেসে এই চুক্তি অনুমোদন করাতে হয়, তবে রিয়াদকে অবশ্যই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে এবং ঐতিহ্যবাহী 'আব্রাহাম একর্ড'-এ স্বাক্ষর করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলতঃ সৌদি আরবকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করার একটি সুচতুর মার্কিন চাল।
৩. ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উচ্ছ্বাস ও তেল আবিবের হিসাব-নিকাশ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই অত্যন্ত উৎফুল্ল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, সৌদি আরব যদি তেল আবিবকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করে, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত 'শান্তি প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত'। কিন্তু বাস্তবে গাজায় ক্রমাগত গণহত্যা ও দখলাভিযান চালিয়েই যাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিন ইস্যুকে চিরতরে ধামাচাপা দিয়ে সমগ্র আরব বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে সৌদি আরবকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবি পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়বে।
৪. বায়তুল মোকাদ্দাসে উস্কানি ও বেন গাভীরের বায়তুল মোকাদ্দাস প্রাঙ্গণে অবৈধ প্রবেশ
একদিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বুলি আওড়ানো হচ্ছে, ঠিক অন্যদিকে বায়তুল মোকাদ্দাসের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে উসকানিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভীর একদল সশস্ত্র পুলিশ প্রহরা ও অনুসারী নিয়ে আল-আকসা প্রাঙ্গণে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ধর্মীয় উৎসবের বাহানায় চরম উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের তোয়াক্কা না করে পবিত্র স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসরাইলি উগ্রবাদ কোনো কূটনৈতিক চুক্তি বা শান্তির শর্তকে পরোয়া করে না।
৫. গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয় ও ভূমির দখলদারিত্ব বৃদ্ধি
গাজা উপত্যকায় সাধারণ মানুষের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। প্রায় ২০ লক্ষাধিক গাজাবাসী বর্তমানে অনাহার, খাদ্যাভাব ও মৌলিক চিকিৎসার অভাবে চরম ভয়াবহ দিন অতিবাহিত করছে। পুনর্নির্মাণ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের ওপর ইসরাইল কঠোর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গাজার মোট ভূখণ্ডের ৫৩ শতাংশ সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখা থেকে বাড়িয়ে তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এই রকম এক সংকটময় মুহূর্তে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা বাদ দিয়ে সৌদি আরবের ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
৬. আল আরাবিয়ায় ইসরাইলি রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার ও মিডিয়া ডিপ্লোমেসি
মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ মাধ্যমেও অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সৌদি সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'আল আরাবিয়া'-তে সম্প্রতি ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং দ্রুত আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সামরিক সমন্বয় ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান। এটিকে ইসরাইলের সুচিন্তিত 'মিডিয়া ডিপ্লোমেসি' বা মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদরা।
৭. আমিরাতের মধ্যস্থতা ও সৌদি ইউ-টার্নের পেছনের অনুঘটক
ইরান-আমেরিকা ও ইরান-ইসরাইল সাম্প্রতিক প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের শুরুতে সৌদি আরব নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করেছিল। ফলে ইরানও আঞ্চলিক অন্য দেশে আঘাত হানলেও সৌদি ভূমিতে কোনো হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবের এই নিরপেক্ষ নীতি থেকে সরে আসার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদ বিন নাহিয়ানের প্ররোচনা ও কূটনৈতিক ভূমিকা প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আমিরাত সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদে ইরানের হুমকি মোকাবিলা করতে হলে আমেরিকার সার্বিক সামরিক ছাতার তলে যাওয়া এবং ইসরাইলি অক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোই রিয়াদের জন্য একমাত্র বিকল্প।
৮. সানা বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ ও ইয়েমেন-সৌদি নতুন সংঘাতের সূত্রপাত
আমেরিকান নীতি ও আমিরাতের প্ররোচনায় অনভিজ্ঞ কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের জেরে সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তীব্র বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি উচ্চপর্যায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও শোকসভা শেষে ফেরার পথে ইরানি এয়ারলাইন্স 'মাহান এয়ার'-এর বিমান যাতে সানায় অবতরণ করতে না পারে, সেজন্যই সৌদি এই বোমাবর্ষণ করে। এই বিনা উসকানিমূলক হামলার জবাবে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথি বাহিনী তাত্ক্ষণিকভাবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি কৌশলগত বিমানবন্দরে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালায়।
৯. ইয়েমেন সীমান্তে স্থলযুদ্ধ ও বাব-এল-মানদেব প্রণালীতে হুথি নিষেধাজ্ঞা
সৌদি-ইয়েমেন উত্তেজনার পারদ আরও উঁচুতে উঠে যায় যখন ইয়েমেন সীমান্তে সৌদি সমর্থিত প্রক্সি বাহিনীর সঙ্গে হুথি যোদ্ধাদের সরাসরি স্থলযুদ্ধ শুরু হয়। এতে সৌদির পক্ষের বেশ কিছু সৈন্য নিহত হয় এবং হুথিদের পক্ষ থেকেও ২৩ জন যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বাব-এল-মানদেব প্রণালীতে সৌদি আরবের মালিকানাধীন সকল প্রকার তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যেই হুথিদের ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল হামলায় সৌদির দুটি বিশাল জ্বালানিবাহী জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
১০. মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ও ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক ফাঁদ
সৌদি আরবের সাথে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা বললেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বাস্তবে রিয়াদকে একটি কৌশলগত গোলকধাঁধায় আটকে ফেলেছেন। মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেকোনো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে পাস হতে হয়। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইল লবি (AIPAC) অত্যন্ত শক্তিশালী। ট্রাম্প রিয়াদকে শর্ত দিয়েছেন—আগে ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দাও, তারপর কংগ্রেসে এটি অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে সৌদি আরব যদি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েও ফেলে, তবুও মার্কিন কংগ্রেস রাজনৈতিক অজুহাতে এই পরমাণু প্রযুক্তি হস্তান্তর আটকে রাখতে পারে, যা সৌদিকে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক ফাঁদে ফেলবে।
১১. বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ তুরস্ক সফর ও নতুন সামরিক অক্ষ
দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আঙ্কারায় তুরস্কের সেনাবাহিনী সদর দপ্তর সফর করেছেন। সেখানে তুর্কি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে বর্ণাঢ্য গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, আধুনিক অস্ত্র সংগৃহীতকরণ, কৌশলগত সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের উদীয়মান সামরিক ও অর্থনৈতিক অক্ষের সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন মাত্রায় উন্নীত করছে।
১২. ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার আন্দোলন
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তীব্র গণআন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে নয়া দিল্লির রাজপথে ছাত্র-জনতা নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু করেছে। পুলিশি ক্র্যাকডাউন উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা উল্টো পুলিশ ও মোদির অনুগত ক্যাডার বাহিনীকে (গেরুয়া বাহিনীকে) পিছু হটতে বাধ্য করেছে। বিজেপি সমর্থিত প্রচার মাধ্যমগুলো এই আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্রের 'ডিপ স্টেট' ও বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে ঢাকার চেষ্টা করলেও আন্দোলন দ্রুত দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।
১৩. ভারতের শহরগুলোতে বিক্ষোভের বিস্তার ও 'মোদি চোর' স্লোগান
দিল্লির বিক্ষোভ কেবল ভারতের রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বাণিজ্য নগরী মুম্বাই, কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গেও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মুম্বাইয়ের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মোদি সরকারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছে। ভারতের জনমত এখন বিজেপি সরকারের চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ভারতের আদালত ও আমলাতন্ত্রের ভেতরেও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত নিয়ে চরম অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
১৪. তারেক রহমানকে ব্রিঙ্কস সম্মেলনে ভারতের আমন্ত্রণ ও রাজনৈতিক কূটনীতি
ভারতে মোদি সরকার যখন নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম বেকায়দায় রয়েছে, ঠিক তখনই কূটনৈতিক চাল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নয়া দিল্লিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে মোদি প্রশাসন। বাংলাদেশের নতুন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঢাকার উদীয়মান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যেই নয়া দিল্লি এই আগাম কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৫. বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ গুঞ্জন ও নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের হিসাব-নিকাশ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে। বিগত জুলাই বিপ্লবের সময় থেকেই ছাত্র-জনতা এই পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবিধান রক্ষা নিশ্চিত করে একজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, বিচক্ষণ ও সম্মানিত নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বকে নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ আলাপ-আলোচনা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. পরমাণু চুক্তির আড়াল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পূর্ণ স্বাধীনতা না দিয়ে নিজেদের প্রযুক্তির ওপর চিরস্থায়ীভাবে নির্ভরশীল রাখতে চায়।
- ২. ট্রাম্পের আব্রাহাম কৌশল: ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য পরমাণু চুক্তির লোভ দেখিয়ে সৌদি আরবকে দিয়ে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ানো, যা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামকে চিরতরে দুর্বল করবে।
- ৩. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক রক্ষা: অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও গাজা যুদ্ধের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে নেতানিয়াহু সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে নিজের প্রধান রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছেন।
- ৪. আল-আকসায় চরমপন্থা: ইসরাইলি মন্ত্রীদের আল-আকসা প্রাঙ্গণে অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রমাণ করে যে, তেল আবিব কখনোই মুসলিম বিশ্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।
- ৫. গাজার ভূখণ্ড দখল: গাজার ৭০% এলাকা দখল করার ইসরাইলি পরিকল্পনা নির্দেশ করে যে, আব্রাহাম চুক্তি শুধুই একপাক্ষিক ইসরাইলি আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার।
- ৬. তথ্যযুদ্ধের ময়দান: আল আরাবিয়ার মতো মিডিয়ায় ইসরাইলি সভাপতির সাক্ষাৎকার প্রচারের মাধ্যমে আরব জনমতকে ইসরাইলমুখী করার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানো হচ্ছে।
- ৭. আমিরাতের চতুরতা: ইউএই নিজের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থে সৌদি আরবকে মার্কিন-ইসরাইলি বলয়ে টেনে এনে মধ্যপ্রাচ্যে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করছে।
- ৮. সানায় বিমান হামলার ভুল: ইয়েমেনের বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে সৌদি আরব আবার নিজেকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
- ৯. লোহিত সাগরের অর্থনৈতিক সংকট: বাব-এল-মানদেব প্রণালীতে হুথি হামলা এবং তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছানো বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
- ১০. কংগ্রেসের ক্ষমতার খেলা: আমেরিকান কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া চুক্তি কার্যকর হবে না জেনেও ট্রাম্প রিয়াদ থেকে আগাম কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন।
- ১১. বাংলাদেশ-তুরস্ক অক্ষ: সেনাপ্রধানের তুরস্ক সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে একক রাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য আনছে।
- ১২. দিল্লিতে মোদির সংকট: বিজেপি বিরোধী এই ছাত্র আন্দোলন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে নড়বড়ে করে তুলবে।
- ১৩. জনরোষের বৈশ্বিক বার্তা: মুম্বাই ও অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, অতি-জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষ আর চেপে রাখা সম্ভব নয়।
- ১৪. মোদির আগাম ডিপ্লোমেসি: বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের বাস্তবতায় বিএনপি নেতৃত্বের কাছে মোদির ব্রিকস দাওয়াত ভারতের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার বহিঃপ্রকাশ।
- ১৫. বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান: রাষ্ট্রপতির বিদায় ও নতুন গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনে অত্যন্ত জরুরি।