মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজের গর্জন: ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘জাহান্নামের দরজা’ খোলার হুঁশিয়ারি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজের গর্জন: ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘জাহান্নামের দরজা’ খোলার হুঁশিয়ারি
ক্রনিকল পয়েন্ট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পটভূমি তৈরি হয়েছে। জর্ডানে ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত এখন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ইরানের মূল ভূখণ্ড ও তার কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে স্মরণকালের ভয়াবহতম বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, আমেরিকার ওপর আঘাতের জবাব দিতে ইরানের বিরুদ্ধে ‘জাহান্নামের দরজা’ খুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুস্তফা খামেনেই মার্কিন এই আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বের সমস্ত সমঝোতা স্মারক বাতিল ঘোষণা করেছেন। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর পাল্টাপাল্টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পুরো বিশ্ব আজ এক নজিরবিহীন বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রনিকল পয়েন্টের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা এই সর্বাত্মক সংকটের প্রতিটি পর্যায় বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব।
১. মার্কিন সেন্টকমের টানা অষ্টম রাতের বিমান হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সূত্রমতে, এই হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের (IRGC) কৌশলগত কমান্ড সেন্টারগুলো। মার্কিন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বি-২ স্পিরিট এবং এফ-৩৫ লাইটনিং দ্বারা এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন বিমান বাহিনীর এই আগ্রাসী অভিযান ইরানের হরমজগান, হাজিবাদ এবং কৌশলগত বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। রাতভর চলা এই হামলায় সমগ্র আকাশ যুদ্ধবিমানের গর্জনে কেঁপে ওঠে এবং ইরানের প্রতিরক্ষা লাইন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করেছে।
২. ইরানের হরমজগান ও বন্দর আব্বাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত হরমজগান প্রদেশ এবং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্দর ‘বন্দর আব্বাস’ মার্কিন বিমান হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সময় মধ্যরাতে বন্দর আব্বাসের নৌঘাঁটি এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলোর ওপর একের পর এক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হাজিবাদ এবং বন্দর আব্বাসের আকাশে বিশাল আগুনের কুন্ডলী দেখা গেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, এই অঞ্চল থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ওপর নজরদারি এবং ড্রোন হামলা পরিচালনা করত। মার্কিন হামলায় বন্দর আব্বাসের লজিস্টিক সাপোর্ট ও রাডার স্টেশন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যা ইরানের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
৩. জজিরা কেশ, সারিক এবং কেশম দ্বীপে যুদ্ধবিমানের মহড়া
বন্দর আব্বাসের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের কৌশলগত দ্বীপ জজিরা কেশ, সারিক শহর এবং কেশম দ্বীপের আকাশসীমায় মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো এক অভূতপূর্ব ও আগ্রাসী মহড়া পরিচালনা করেছে। সারিক শহরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র পতনের পর ইরানি কর্তৃপক্ষ সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এই দ্বীপগুলো ইরানের নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস হিসেবে কাজ করে। মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, এই দ্বীপগুলোতে ইরানের ড্রোন তৈরির কারখানা এবং গোপন অস্ত্রাগার ছিল, যা এই হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আকাশের এই যুদ্ধাবস্থা সমগ্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
৪. প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘জাহান্নামের দরজা’ খোলার নির্দেশ
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজ থেকে এক জরুরি ও নাটকীয় ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ইরানের জন্য ‘জাহান্নামের দরজা’ (Gates of Hell) খুলে দেওয়া হোক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কড়া বক্তব্যের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ এক বিবৃতিতে জানান, আমেরিকার স্বার্থ ও সেনাদের ওপর কোনো আঘাত বরদাশত করা হবে না। ওয়াশিংটনে বর্তমানে চরম রাজনৈতিক তৎপরতা চলছে এবং প্রেসিডেন্ট তার অন্য সব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত করে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক বৈঠক করছেন। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট করে দেয় যে, মার্কিন প্রশাসন এবার ইরানকে সামরিকভাবে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে বদ্ধপরিকর।
৫. জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহতের পর মার্কিন প্রতিশোধের আগুন
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের তাত্ক্ষণিক সূত্রপাত হয়েছিল জর্ডানের সীমান্তে অবস্থিত একটি গোপন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের মদদপুষ্ট প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায়। ওই হামলায় দুই মার্কিন সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে সেন্টকম এবং একজন মার্কিন সেনা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই একক ড্রোন হামলায় ২৯ জন মার্কিন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ঘাঁটিতে থাকা বেশ কয়েকটি সামরিক হেলিকপ্টার ও লজিস্টিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। নিজেদের সেনাদের এই ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন সামরিক এস্টাবলিশমেন্টকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে এবং এর প্রতিশোধ হিসেবেই মার্কিন প্রশাসন ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি হামলার এই বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
৬. ইরাকের এরবিল এবং কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ইরানি ড্রোন হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। ইরানের বিপ্লবী গার্ডস এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ইরাকের এরবিলে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের ওপর একযোগে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সি-র্যাম (C-RAM) বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও কনস্যুলেটের নিকটবর্তী এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটেছে। একই সময়ে কুয়েতে অবস্থিত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের এই লজিস্টিক কেন্দ্র এবং এয়ারবেসের রাডার সিস্টেম সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে বলে ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অগ্রযাত্রাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
৭. বাহরাইনের শেখ ঈসা এয়ারবেস এবং আল-আহমদি বন্দরে তীব্র আঘাত
মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সদর দফতর বাহরাইনে হওয়া ইরানি হামলা এই যুদ্ধের পরিধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাহরাইনের কৌশলগত ‘শেখ ঈসা এয়ারবেস’ লক্ষ্য করে ইরান বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই হামলায় মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘাঁটির ভেতরে অবস্থিত একটি অতি গোপনীয় ইন্টেলিজেন্স ডাটা সেন্টার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি কুয়েতের আল-আহমদি বন্দরে নোঙর করে রাখা মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বহরকে লক্ষ্য করেও ইরান গাইডেড মিসাইল ছুড়েছে। বাহরাইন ও কুয়েতের মতো শান্ত দেশে এই ধরনের সরাসরি হামলা প্রমাণ করে যে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল এখন যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে।
৮. মার্কিন সমঝোতা স্মারক (MOU) বাতিল করলেন আয়াতুল্লাহ খামেনেই
মার্কিন বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুস্তফা খামেনেই এক জরুরি লিখিত বার্তা প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা বারবার আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে এবং ইতিপূর্বে হওয়া সমস্ত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MOU) ইরান এখন থেকে সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য করছে। খামেনেই তার বিবৃতিতে বলেন, "ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা যেকোনো কাগজের এখন আর কোনো মূল্য বা কার্যকারিতা নেই। মার্কিন প্রশাসন প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল জুলুম, মিথ্যা এবং একনায়কতন্ত্রের ভাষায় কথা বলতে পারে।" এই ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার সব পথ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
৯. ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির হুঁশিয়ারি: "রক্ত বৃথা যাবে না"
ইরানের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজিম গারিবাদি ওয়াশিংটনের এই সামরিক আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আব্বাস আরাগচি বলেন, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো কেবল সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং ইরানের সাধারণ নাগরিকদের আবাসন ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, "আমেরিকার এই কাপুরুষোচিত হামলায় আমাদের যে সমস্ত নাগরিক ও বীর সেনারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পবিত্র রক্ত কখনো বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। এর উপযুক্ত ও চূড়ান্ত জবাব মার্কিন প্রশাসনকে তাদের নিজেদের ঘাঁটিতেই পেতে হবে।"
১০. ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস
মার্কিন সেন্টকমের এই নির্বিচার বিমান হামলায় ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। হরমজগান প্রদেশে মার্কিন বোমাবর্ষণে সাতজন সাধারণ নাগরিক শহীদ হয়েছেন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া ইয়াস শহর, আহওয়াজ এবং লার অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় ইরানের তিনটি প্রধান মহাসড়কের সংযোগকারী সেতু এবং পাহাড়ি টানেল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ১০,০০০ মানুষ তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন।
১১. হরমুজ প্রণালীতে ট্রানজিট ফি ও সার্বভৌমত্বের লড়াই
এই যুদ্ধের অন্যতম মূল অর্থনৈতিক কারণ হলো বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত ‘হরমুজ প্রণালী’র নিয়ন্ত্রণ। ইরান সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে তাদের জলসীমা ব্যবহারকারী প্রতিটি আন্তর্জাতিক জাহাজকে বিশেষ ‘ট্রানজিট ফি’ প্রদান করতে হবে এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো (GCC) একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তারা ইরানের এই দাবিকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের পরিপন্থী বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, হরমুজ প্রণালীতে মুক্ত জাহাজ চলাচল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য এবং ইরান এখানে কোনো ধরনের একক কর্তৃত্ব বা শুল্ক আরোপ করতে পারে না।
১২. বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে রেকর্ড লাফ: ক্রুড অয়েল ৮৮ ডলার পার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সরাসরি সামরিক সংঘাতের তাত্ক্ষণিক ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডনের বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলার অতিক্রম করেছে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধ যদি আরও কয়েকদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করবে।
১৩. সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং কূটনৈতিক তৎপরতা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক বিবৃতিতে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুবাইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি আঞ্চলিক শান্তিকে স্থায়ীভাবে বিনষ্ট করবে। আমিরাত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান ও কাতারের সাথে মিলে একটি জরুরি কূটনৈতিক চ্যানেল খোলার চেষ্টা করছে যাতে করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা সম্ভব হয়।
১৪. পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগ: ইসহাক দারের কুয়েতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ
এই আঞ্চলিক সংকটের আঁচ এসে লেগেছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এক দীর্ঘ টেলিফোনিক আলাপচারিতা করেছেন। ইসহাক দার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের যুদ্ধ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হবে। পাকিস্তান কোনো পক্ষের যুদ্ধকে সমর্থন করে না, বরং এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই ইসলামাবাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি কুয়েতের মাধ্যমে ওআইসি (OIC) এর একটি জরুরি বৈঠক ডাকার ওপর জোর দেন যাতে করে এই উত্তেজনা দ্রুত প্রশমন করা যায়।
১৫. গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন বর্বরতা: ১০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ
যখন বিশ্বের সমস্ত নজর মার্কিন-ইরান সংঘাতের দিকে নিবদ্ধ, ঠিক সেই সুযোগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় নতুন করে তীব্র বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে। গাজার আল-জাইতুন মহল্লায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের নির্বিচার বোমাবর্ষণে ৩টি নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নির্মমভাবে শহীদ হয়েছেন। স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ চাপা পড়ে আছেন। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল মূলত মার্কিন-ইরান যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে গাজায় তাদের জাতিগত নিধনযজ্ঞ আরও ত্বরান্বিত করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্য: ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে সামরিক শক্তির জোরে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
- ২. ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা: মার্কিন বিমান হামলার পরেও কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের সফল পাল্টা আঘাত প্রমাণ করে যে তেহরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি অত্যন্ত আধুনিক।
- ৩. ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং বীরত্বের ভাবমূর্তি তুলে ধরতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘জাহান্নামের দরজা’র মতো কড়া ভাষা ব্যবহার করছেন।
- ৪. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়: তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলার হওয়া কেবল শুরু; হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হলে এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ও পরিবহন খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।
- ৫. প্রক্সি যুদ্ধের অবসান: এতদিন ধরে চলে আসা ছায়া যুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যা বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
- ৬. আরব বিশ্বের দ্বিধাদ্বন্দ্ব: কুয়েত, বাহরাইন ও আমিরাত মার্কিন সামরিক সুবিধা দিলেও তারা ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে থাকায় চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ভুগছে।
- ৭. কূটনৈতিক অচলাবস্থা: আয়াতুল্লাহ খামেনেই কর্তৃক সমস্ত এমওইউ (MOU) বাতিল করার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে যে অদূর ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সম্ভাবনা নেই।
- ৮. চীনের নীরব ভূমিকা: ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল চীন এই সংকটে মার্কিন একতরফা আধিপত্য খর্ব করতে ইরানকে পরোক্ষ অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা সুবিধা দিতে পারে।
- ৯. বেসামরিক ক্ষতি ও মানবাধিকার: ইরানের বিদ্যুৎ, পানি ও সেতু ধ্বংসের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী মূলত সাধারণ ইরানি নাগরিকদের ওপর যৌথ শাস্তি (Collective Punishment) আরোপ করছে।
- ১০. বৈশ্বিক সিকিউরিটি অ্যালার্ট: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গ্লোবাল অ্যালার্ট প্রমাণ করে যে বিশ্বজুড়ে থাকা মার্কিন নাগরিক ও দূতাবাসগুলো এখন ইরানি আত্মঘাতী স্কোয়াডের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
- ১১. হরমুজ প্রণালীর আইনি বিতর্ক: সমুদ্রসীমা নিয়ে ইরানের নিজস্ব আইন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের (UNCLOS) মধ্যকার দ্বন্দ্বই এই নৌ-সংঘাতের মূল আইনি কারণ।
- ১২. গাজা সংকটের সুযোগ: ইসরায়েল অত্যন্ত চতুরতার সাথে বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি মার্কিন-ইরান যুদ্ধের দিকে থাকার সুযোগ নিয়ে গাজায় তাদের সামরিক অভিযান তীব্রতর করছে।
- ১৩. পাকিস্তানের নিরপেক্ষতার নীতি: পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে মধ্যস্থতাকারী ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে।
- ১৪. সেন্টকমের গোয়েন্দা ব্যর্থতা: জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ২৯ জন সেনা আহত হওয়া এবং রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়া মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় লুপহোল বা ত্রুটি নির্দেশ করে।
- ১৫. দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কা: এই সংঘাত কোনো স্বল্পমেয়াদি বিমান হামলা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এবং বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সূচনা।