হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের অদ্ভুত ঘোষণা ও বাংলাদেশে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট: নেপথ্যে কি বহুজাতিক মাফিয়া ও নীতিগত ব্যর্থতা?

📅 আগষ্ট, ২০২৬

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের অদ্ভুত ঘোষণা ও বাংলাদেশে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট: নেপথ্যে কি বহুজাতিক মাফিয়া ও নীতিগত ব্যর্থতা?

📅 ১৫ আগষ্ট, ২০২৬ | ✍️ বিশেষ প্রতিনিধি, Chronicle Point

Chronicle Point বিশেষ বিশ্ব ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি রিপোর্ট: মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধ নতুন চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত ৬০ দিনের সাময়িক সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চললেও দুই দেশের মধ্যস্থতায় কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বরঞ্চ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈপ্লবিক ও বিতর্কিত ঘোষণা অনুযায়ী পুরো হরমুজ প্রণালীকে আমেরিকার ভূখণ্ড হিসেবে একতরফাভাবে দাবি করার নীতি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চরম সীমায় ঠেলে দিয়েছে। এই বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো— আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকে বাহানা বানিয়ে বাংলাদেশে যে তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি করা হয়েছে, তার আসল নেপথ্য কারণ কি শুধুই হরমুজ প্রণালী, নাকি দেশীয় নীতিগত অব্যবস্থাপনা ও বহুজাতিক মাফিয়া সিন্ডিকেটের কৃত্রিম নীলচক্রান্ত? অনুসন্ধানী তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের আলোকে তৈরি ক্রোনিকল পয়েন্টের এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন।

১. হরমুজ প্রণালীতে ইরান-আমেরিকা অচল অবস্থা ও ৬০ দিনের চুক্তির ব্যর্থতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাময়িক ৬০ দিনের সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও দুই দেশের diplomatic টেবিলে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা সমঝোতার আলো দেখা যাচ্ছে না। প্রায় দুই মাস পূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক এই চুক্তিকে প্রকাশ্যে কার্যকরহীন ও বিকল ঘোষণা করার পর থেকেই অঞ্চলে একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। কৌশলগত কারণে উভয়েই প্রত্যক্ষ সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকলেও হরমুজ প্রণালীর জলপথে দুই দেশের নৌ-অবরোধ ও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে। ইরান সমুদ্রপথে মার্কিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি জাহাজ চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে জলপথকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এই চরম ভূ-রাজনৈতিক সামরিক অচল অবস্থাই বর্তমান বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের মূল অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

২. ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজিরবিহীন ঘোষণা: হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড দাবির বাস্তবতা

বিশ্বকে তাজ্জব বানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, খুব শীঘ্রই হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিক্লেয়ার করা হবে। ট্রাম্পের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি রুট নিরাপদ করার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এটিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম একতরফা ও তুগলকী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে কোনো সার্বভৌম আন্তর্জাতিক জলসীমাকে এককভাবে কোনো দূরবর্তী রাষ্ট্রের সার্বভৌম এলাকা ঘোষণা করা কতটা বাস্তবসম্মত এবং জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তিগুলো আদৌ এই ঘোষণা মেনে নেবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। শুধু ভৌগোলিক সীমানা আইনত নিজের দাবি করলেই তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়, যদি না বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক সমাধান আসে।

৩. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌশক্তি বৃদ্ধি এবং ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতার সমীকরণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ইতিমধ্যেই বিশাল সৈন্য বহর ও নৌবহর মোতায়েন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে পাঁচ হাজারের বেশি স্থায়ী মার্কিন সৈন্যের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' এবং নতুন যুক্ত হওয়া শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন'। তা সত্ত্বেও, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা ও উপকূলীয় সাবমেরিন প্রতিরোধ ব্যূহকে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, কেবল বিশাল সামরিক শক্তি ও যুদ্ধজাহাজের মহড়া চালিয়ে ইরানের নৌ-প্রতিরোধ ও কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা হরমুজ প্রণালীর বাস্তব সংকটের কোনো সুদূরপ্রসারী সমাধান বয়ে আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

৪. বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি

হরমুজ প্রণালী হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যা দিয়ে দৈনিক বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই নৌ-অবরোধের কারণে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম। বিশ্বের উদীয়মান ও আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো এই নজিরবিহীন দরবৃদ্ধির ফলে মারাত্মক মন্দার মুখে পড়ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় বিশ্বই এখন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ঢেউ অত্যন্ত মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যার আঁচ এসে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও।

৫. বাংলাদেশে উদ্ভূত তীব্র বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট

আন্তর্জাতিক বাজারের উত্তাপের অজুহাতে বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অভূতপূর্ব সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠছে। তদুপরি, সিএনজি স্টেশনগুলোতে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দৃশ্য জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাইপলাইনে প্রয়োজনীয় প্রেসার না থাকায় দেশের রান্নাঘরের চুলা জ্বলছে না, যা দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনকে এক চরম দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত করেছে। একই সাথে কারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে জাতীয় উৎপাদনব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

৬. বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর প্রকৃত দূরত্বের হিসাব

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনাকে প্রধান কারণ হিসেবে বারবার তুলে ধরা হলেও বাস্তব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করে। জাতীয় স্তরের নীতি বিশ্লেষক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে কয়লা ব্যবহার করে তা মূলত ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে আমদানি করা হয়। একইভাবে, ঝাড়খণ্ড থেকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ আসে এবং নুমানীগড় থেকে পাইপলাইনে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ডিজেলের একটি বড় অংশ নিজস্ব শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করে। এই সমস্ত আমদানিকৃত জ্বালানির কোনোটিই কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পার হয়ে বাংলাদেশে আসে না। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীকে দায়ী করা একটি বস্তুগত বিভ্রান্তি বৈ কিছুই নয়।

৭. দেশীয় জ্বালানি সংকটের আসল নেপথ্য: মিসম্যানেজমেন্ট ও বকেয়া পরিশোধের ব্যর্থতা

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান ভয়াবহ দৈনুদশায় যুদ্ধের ভূমিকা যতখানি, তারচেয়ে বহু গুণ বেশি দায়ী সরকারের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বা মিসম্যানেজমেন্ট। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি ক্রয়ের সঠিক শিডিউল না রাখা, ফুয়েল ক্রয়ের জন্য সময়মতো আর্থিক প্ল্যান বা তহবিল না থাকা এবং বিদেশী সরবরাহকারী ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধে ধারাবাহিক ব্যর্থতাই এই সংকটকে তীব্র করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভুল ভর্তুকি কাঠামোর কারণে বিদেশি আমদানিকারকরা জ্বালানি সরবরাহ ধীর করে দিয়েছে। সরকার নিজের এই চরম পরিচালনগত অদক্ষতা ও আর্থিক পরিকল্পনার অভাবকে আড়াল করতেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বলির পাঠা বানাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা।

৮. বিএনপি বনাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: বকেয়া ঋণ ও দায় চাপানোর রাজনীতি

জ্বালানি সংকট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৈন্যদশা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি দায় চাপানোর নোংরা খেলা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্তব্য করেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝায় রাষ্ট্র এমন দেউলিয়া হওয়ার পথে যে, অতি শীঘ্রই সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সীমিত সম্পদের মধ্যেও কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে পেরে থাকে, তবে বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনেরা কেন নিজেদের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও অযোগ্যতাকে ঢাকতে কেবল পূর্ববর্তী হাসিনা সরকারের ওপর সকল দায় চাপাচ্ছে? রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জ্বালানি নীতিতে যুগান্তকারী সংস্কার না এনে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানো কোনো গঠনমূলক সমাধান হতে পারে না।

৯. সৌদি আরামকোর কার্গো জাহাজ ও এলএনজি টার্মিনালের রহস্যজনক অচল অবস্থা

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায়, বিশ্বখ্যাত জ্বালানি পরাশক্তি 'সৌদি আরামকো' থেকে আমদানিকৃত বিশাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় এসে অলসভাবে বসে রয়েছে। অথচ দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার থাকা সত্ত্বেও টার্মিনালগুলো থেকে এলএনজি খালাস করা হচ্ছে না। বাংলাদেশের দুটি প্রধান ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (FSRU) মধ্যে একটিকে কারিগরি দুর্ঘটনাকবলিত ও অচল বলে ঘোষণা করা হয়েছে, আর অন্যটি সামিট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রতিকূল আবহাওয়া বা যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে টার্মিনালে জাহাজ থেকে গ্যাস খালাসের কাজ দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, একই আবহাওয়ার মধ্যে অন্য পণ্যের জাহাজগুলো অনায়াসে খালাস হচ্ছে, যা কোনো সাধারণ অদক্ষতা নয় বরং একটি গভীর রহস্যময় শুভঙ্করের ফাঁকি ও কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

১০. কৃতিমভাবে সংকট দীর্ঘায়িত করার চক্রান্ত ও চ্যানেল ২৪-এর এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধান

বাংলাদেশের জনপ্রিয় গণমাধ্যম 'চ্যানেল ২৪'-এর একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশে চলমান প্রাকৃতিক গ্যাসের এই নজিরবিহীন সংকট কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক বা বৈশ্বিক দুর্ঘটনা নয়, বরং কৃত্রিমভাবে পরিকল্পিত উপায়ে তৈরি ও দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। জাতীয় ও বহুজাতিক মাফিয়া সিন্ডিকেটের প্রেসারে অত্যন্ত চতুরতার সাথে কৃত্রিম সংকট জিইয়ে রাখা হচ্ছে। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হলো— দেশের জনগণকে চরম দুর্ভোগে ফেলে তাদের মানসিকভাবে বাধ্য করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের মতো আত্মঘাতী সরকারি সিদ্ধান্তগুলোকে নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা লুটপাট এবং দেশীয় রিজার্ভকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করার নজিরবিহীন নীলকশার পাঁয়তারা চলছে।

১১. ঐতিহাসিক আমদানিনির্ভরতার ক্রোনোলোজি: নসরুল হামিদ বিপু ও কমিশন বাণিজ্যের সিন্ডিকেট

বাংলাদেশে নিজের খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন না করে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির এই মরণঘাতী চক্রান্তের গোড়াপত্তন হয়েছিল এক দশক আগেই। শেখ হাসিনা সরকারের বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর আমলে তার নিজস্ব ও স্বজনদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানির একচ্ছত্র চুক্তি করা হতো। সেখান থেকে প্রাপ্ত কোটি কোটি ডলারের অবৈধ কমিশন বাণিজ্যের লোভে দেশীয় ২৫টি আবিষ্কৃত গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি কিংবা নতুন গভীর সমুদ্রের গ্যাসব্লক অনুসন্ধানের সমস্ত সরকারি উদ্যোগকে ইচ্ছাকৃতভাবে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন করলে মন্ত্রী ও আমলাদের পকেটে কোনো মোটা অঙ্কের কমিশন আসত না, কিন্তু বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করলে কোটি কোটি টাকা কমিশন পাওয়া যেত— যা আজও ভিন্নরূপে বিদ্যমান।

১২. দেশের খনি ও সমুদ্রের বিশাল গ্যাস সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উত্তোলনে অবহেলা

ভূ-তাত্ত্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২৯টি প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস ফিল্ডের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২০টি থেকে সীমিত আকারে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আবিষ্কৃত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে সঠিকভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপ সংস্কার (Workover) ও নতুন ড্রিলিং করলে আগামী অন্তত ১২ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশ পরিচালিত হতে পারে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশ যে দুটি বিশাল অফশোর গ্যাসব্লক জয় করেছে, সেখানে ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে ভূতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান 'পেট্রোবাংলা'র পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও ইঞ্জিনিয়ার থাকার পরও তাদেরকে সমুদ্রে কিংবা স্থলে নতুন গ্যাস উত্তোলনের জোরালো বাজেট ও দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পেট্রোবংলার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক ও মাফিয়া চক্রের কারণে দেশের গ্যাস মাটির নিচেই পড়ে রয়েছে।

১৩. নতুন ৪টি ব্যয়বহুল এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প ও অশুভ কমিশন বাণিজ্য

দেশীয় সম্ভাবনাকে তোয়াক্কা না করে সরকার ও পেট্রোবাংলা বর্তমানে মংলা, রূপসা এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রায় চারটি নতুন বিশালাকার এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদী মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার তোড়জোড় করছে। ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া এই মেগা প্রকল্পগুলোতে খরচ হবে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভ যখন চরম চাপের মুখে, তখন দেশীয় খনি অনুসন্ধান না করে হাজার কোটি টাকার আমদানিনির্ভর কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার আসল রহস্য হলো বিশাল অংকের পিসি বা কমিশন বাণিজ্য। সামিট গ্রুপ, বসুন্ধরা, মেঘনা কিংবা টি কে গ্রুপের মতো প্রভাবশালী কর্পোরেট মাফিয়া ও তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা এই আমদানিনির্ভরতা বজায় রেখে পুরো দেশকে একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক ঋণের জালে আবদ্ধ করার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে।

১৪. চট্টগ্রাম ও নরসিংদীসহ দেশের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে মারাত্মক ধস

কৃত্রিম গ্যাস সংকটের নজিরবিহীন ও প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে। দেশের প্রধান অর্থনৈতিক হাব চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপের চরম স্বল্পতার কারণে তৈরি পোশাক শিল্প, ইস্পাত কারখানা, স্টিল স্ট্রাকচার ও জাহাজ ভাঙা শিল্পে সার্বিক উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অধিকাংশ ভারী শিল্পকারখানা নিজেদের পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকে কাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারখানা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। একইভাবে নরসিংদী ও শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে প্রায় ৮ লক্ষ শ্রমিক ও সাধারণ পরিবহন চালক সরাসরি এই গ্যাস সংকটের শিকার হয়েছেন। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় একদিকে রফতানি আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন স্থবির হয়ে সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে।

১৫. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থে স্থায়ী জ্বালানি নীতি প্রণয়নের তাগিদ

যেসব সত্যসন্ধানী সাংবাদিক ও সত্যানুসন্ধানী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান— যেমন চ্যানেল ২৪ বা চ্যানেল আই— দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশা ও জ্বালানি মাফিয়াদের কারসাজি উন্মোচন করতে বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান চালাচ্ছেন, তাদের ওপর নেমে আসছে চরম মানসিক ও অদৃশ্য রাজনৈতিক চাপ। অতীত সরকারের আমলেই কেবল 'ট্যাগিং' ও নিপীড়ন চলত তা নয়, সত্য কথা বললেই বর্তমানেও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল সংবাদমাধ্যমগুলোকে কোনোরূপ বিচার-বিবেচনা ছাড়াই আক্রমণ করছে। তবে বাংলাদেশকে একটি ইনসাফভিত্তিক ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অবিলম্বে মাফিয়াদের হাতে বন্দি আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পেট্রোবাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিয়ে নিজস্ব খনি ও সমুদ্রে ইমার্জেন্সি ড্রিলিং চালুর মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে এই কৃত্রিম জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

Chronicle Point Analysis:

  • ১. ভূ-রাজনৈতিক ভণ্ডামি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফাভাবে হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং বাস্তব সমাধানহীন এক ভূ-রাজনৈতিক স্টান্টবাজি।
  • ২. সামরিক সীমাবদ্ধতা: পারস্য উপসাগরে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার আব্রাহাম লিংকন বা জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েন করেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ও স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানকে নিষ্ক্রিয় করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা।
  • ৩. কৃত্রিম অজুহাত উন্মোচন: বাংলাদেশে বিদ্যুতের জন্য ব্যবহৃত কয়লা ও ডিজেল আসে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে, যার সাথে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক বা কৌশলগত কোনো সম্পর্ক নেই।
  • ৪. আমলাতান্ত্রিক মিসম্যানেজমেন্ট: বাংলাদেশ সরকারের বকেয়া বিল পরিশোধে ব্যর্থতা এবং সঠিক ফুয়েল ক্রয় পরিকল্পনার অভাবই বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান অভ্যন্তরীণ কারণ।
  • ৫. রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সংস্কৃতি: নিজেদের নীতিগত ও পরিচালনগত অযোগ্যতা ঢাকতে অতীত সরকারের ঋণ ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বলির পাঠা বানিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।
  • ৬. আরামকো কার্গোর রহস্য: সৌদি আরামকোর গ্যাসবাহী জাহাজ বাংলাদেশের বন্দরে অবস্থান করা সত্ত্বেও টার্মিনাল অচল থাকার অজুহাতে গ্যাস খালাস না করা গভীর রাজনৈতিক ও সিন্ডিকেট চক্রান্তের স্পষ্ট আলামত।
  • ৭. বহুজাতিক মাফিয়ার দৌরাত্ম্য: দেশের জনগণকে কৃত্রিমভাবে দুর্ভোগে ফেলে চরম ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে চড়া দামের এলএনজি আমদানি ও ব্যয়বহুল টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প সহজে পাস করানো যায়।
  • ৮. আমদানিতে বিপুল ভর্তুকি: গত বছর যেখানে ৪৭ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি ও ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা আমদানি ও ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিতে ঠেকেছে।
  • ৯. নসরুল হামিদ বিপুর উত্তরাধিকার: বিগত আওয়ামী লীগ আমলে শুরু হওয়া এলএনজি কমিশন বাণিজ্যের যে মরণঘাতী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতা পরিবর্তনের পরও সেই নীতিগত ধারা বহাল রয়েছে।
  • ১০. দেশীয় খনির অবহেলা: বাংলাদেশের আবিষ্কৃত ২০টির বেশি চালু গ্যাস ক্ষেত্র এবং সমুদ্রে অফশোর গ্যাসব্লক থাকা সত্ত্বেও সেগুলোতে নতুন অনুসন্ধান ও ড্রিলিং কার্যক্রমে রহস্যজনক স্থবিরতা বজায় রাখা হয়েছে।
  • ১১. পেট্রোবাংলার হাত-পা বাঁধা: সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার পর্যাপ্ত দক্ষ প্রকৌশলী ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে পর্যাপ্ত অর্থ ও চূড়ান্ত নীতিগত সবুজ সংকেত দেওয়া হচ্ছে না।
  • ১২. মেগা প্রজেক্টের লোভ: মংলা, রূপসা ও মহেশখালীতে নতুন ৪টি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার কনস্ট্রাকশন কমিশন হাতানোর চক্রান্ত চলছে, যা দেশীয় রিজার্ভ খালি করবে।
  • ১৩. শিল্পখাতে মহাবিপর্যয়: চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে শিল্প উৎপাদন ৪০% কমে যাওয়ার ফলে দেশের কোটি কোটি ডলারের রফতানি পোশাক ও ভারী শিল্প রুগ্ন হয়ে রফতানি আয় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
  • ১৪. গণমাধ্যমের ওপর অদৃশ্য চাপ: জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও কৃত্রিম সংকট নিয়ে চ্যানেল ২৪-এর মতো সাহসী সংবাদমাধ্যম রিপোর্ট করলে তাদের ওপর অদৃশ্য হামলা ও ট্যাগিংয়ের হুমকি তৈরি হচ্ছে।
  • ১৫. স্বাবলম্বী নীতিই একমাত্র পথ: বিদেশ থেকে অতি-উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির আত্মঘাতী পথ ছেড়ে পেট্রোবাংলাকে শক্তিশালী করে দেশীয় গ্যাস দ্রুত উত্তোলনেই রয়েছে স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তি।

পাঠকদের জিজ্ঞাসিত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. হরমুজ প্রণালী নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি কী নজিরবিহীন ঘোষণা দিয়েছেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীকে খুব শীঘ্রই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিক্লেয়ার করা হবে। ২. ইরান ও আমেরিকার ৬০ দিনের সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তির বর্তমান অবস্থা কী? ইরান ও আমেরিকার মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও আলোচনায় চরম অচল অবস্থা বিরাজ করছে এবং কোনো নতুন অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। ৩. হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কী ধরনের সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে? যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ৫ হাজার মার্কিন সৈন্যের পাশাপাশি শক্তিশালী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' এবং নতুন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' মোতায়েন করেছে। ৪. বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি মূলত কোন কোন দেশ থেকে আমদানি করা হয়? বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে আনে, এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড থেকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ ও নুমানীগড় থেকে ডিজেল আসে। ৫. বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সাথে কি হরমুজ প্রণালীর সরাসরি কোনো ভৌগোলিক সম্পর্ক আছে? না, বাংলাদেশের অধিকাংশ কয়লা, ডিজেল ও বিদ্যুৎ আমদানির রুট হরমুজ প্রণালী পার হয়ে আসে না; ফলে এর সাথে সরাসরি কোনো বড় ভৌগোলিক যোগসূত্র নেই। ৬. হাসনাত আব্দুল্লাহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট সৃষ্টির পেছনে কী মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন? তিনি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ নয় বরং সরকারের বকেয়া বিল পরিশোধ না করা, ফুয়েল ক্রয়ের সঠিক পরিকল্পনা না থাকা এবং ভুল ভর্তুকি নীতির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ৭. বাংলাদেশে বর্তমান এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের পেছনে সরকারি প্রধান মিসম্যানেজমেন্টগুলো কী কী? বিদেশি কোম্পানির বকেয়া অর্থ পরিশোধে বিলম্ব, আমদানির শিডিউল মিস করা এবং দেশীয় খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনে স্থায়ী বাজেটের অভাবই প্রধান পরিচালনগত ব্যর্থতা। ৮. সৌদি আরামকোর গ্যাসের জাহাজ বাংলাদেশে আসার পরও কেন গ্যাস সংকট সমাধান হচ্ছে না? সৌদি আরামকোর বিশাল এলএনজি জাহাজ বন্দরে এসে পৌঁছালেও স্থানীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি ও অজুহাত দেখিয়ে গ্যাস খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। ৯. চ্যানেল ২৪-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গ্যাস সংকট নিয়ে কী চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে? চ্যানেল ২৪ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণের অশুভ চক্রান্তকে বৈধতা দিতে কৃত্রিমভাবে দেশীয় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। ১০. শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া এলএনজি আমদানির কমিশন বাণিজ্য কীভাবে চলত? সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও তার ঘনিষ্ঠ চক্র নিজস্ব কোম্পানির মাধ্যমে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে বিশাল অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করত, যা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখেছিল। ১১. বর্তমানে বাংলাদেশে মোট কয়টি গ্যাস ফিল্ড রয়েছে এবং কতটি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে? বাংলাদেশে মোট ২৯টি আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ফিল্ড রয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে ২০টি ফিল্ড থেকে সীমিত আকারে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১২. পেট্রোবাংলা নিজস্ব সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন দেশে নতুন গ্যাস খনি অনুসন্ধান ও ড্রিলিং বাড়াতে পারছে না? পেট্রোবাংলার কারিগরি টিম ও ইঞ্জিনিয়ার থাকলেও বহুজাতিক আমদানিকারক মাফিয়া ও সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাদেরকে প্রয়োজনীয় বাজেট ও অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ১৩. সরকার বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন কয়টি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে? সরকার মংলা, রূপসা ও মহেশখালীতে প্রায় ৪টি নতুন বিশাল ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ১৪. চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ফলে শিল্প কারখানা ও উৎপাদনে কী প্রভাব পড়েছে? চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক, ইস্পাত ও জাহাজ ভাঙা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের শিল্প উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক কারখানা বন্ধের মুখে পড়েছে। ১৫. দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে স্থায়ী জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত করার একমাত্র বৈজ্ঞানিক উপায় কী? আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে পেট্রোবাংলাকে শক্তিশালী করা, নিজস্ব স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের অফশোর গ্যাসব্লক থেকে জরুরি ভিত্তিতে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে স্বাবলম্বী হওয়া।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এলো? প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিন

Website Total View