মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সংঘাত ও হরমুজ সংকট, সিরিয়া-রাশিয়া চুক্তি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক-জ্বালানি সমীকরণ: একটি সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সংঘাত ও হরমুজ সংকট, সিরিয়া-রাশিয়া চুক্তি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক-জ্বালানি সমীকরণ: একটি সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একতরফা সামরিক নীতি, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর অবস্থান এবং ইয়েমেন-জিবুতি বেল্টে অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৮ মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করছে। এর উত্তাপ এড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রসিডেন্ট নির্বাচন ও জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। ক্রনিকল পয়েন্ট-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে সমগ্র পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অর্থনৈতিক অবরোধ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক বেকায়দা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের কঠোর অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে তছনছ করে দিয়েছে। ওয়াশিংটন নতুন করে কোনো পারমাণবিক চুক্তির পূর্বশর্ত ছাড়াই কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইরানের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী হলেও তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—অতীতে আমেরিকা কর্তৃক একতরফা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু সম্ভব নয়। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের নির্বিঘ্ন সরবরাহ বজায় রাখা এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কেবল সমুদ্রপথটি সচল করার ন্যূনতম নিশ্চয়তা খুঁজছেন। ইরানের এই কৌশলগত সুবিধা আদায়ের সক্ষমতা মার্কিন নেতৃত্বকে বৈশ্বিক মঞ্চে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে।
২. ট্রাম্পের ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান ও নেতানিয়াহুর একতরফা সামরিক অবস্থান
মার্কিন কূটনীতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তার নিকটতম মিত্র দেশ ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি রূপরেখা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। আন্তর্জাতিক চাপ ও মার্কিন প্রশাসনের পরামর্শ উপেক্ষা করে নেতানিয়াহু স্পষ্ট বার্তায় জানিয়েছেন, ইসরায়েলের তথাকথিত নিরাপত্তা স্বার্থের প্রয়োজনে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা করবে না। রাফাহ সীমান্ত অঞ্চল, ফিলাডেলফিয়া করিডোর, লেবাননে আক্রমণ পরিচালনা কিংবা ইরানে হামলা চালানো—প্রতিটি ক্ষেত্রে মিত্রদের বারণ অমান্য করে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অতীত রেকর্ড তুলে ধরে নেতানিয়াহু প্রমাণ করেছেন যে, হোয়াইট হাউসের বর্তমান কৌশলকে তারা সম্পূর্ণ উপেক্ষার চোখে দেখছেন।
৩. হামাসের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ এবং ইসরায়েলি উগ্রপন্থার অচল অবস্থা
ইসরায়েলের এই আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গির ঠিক বিপরীত অবস্থানে অবস্থান নিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। তারা মার্কিন প্রসিডেন্টের প্রস্তাবিত ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়ে এবং অস্ত্র সংবরণের প্রতি নীতিগত সমর্থন জানিয়ে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ও 'বোর্ড অফ পিস'-এর ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে কূটনৈতিক ময়দানে ইসরায়েল একা হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে হামাস অস্ত্র ত্যাগ করলেও বা কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ উন্মুক্ত হলেও তারা সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না। এর ফলে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনিশ্চয়তা বজায় রাখছে।
৪. ইয়েমেনে আনসারুল্লাহ হুতি বাহিনীর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও টাইজ প্রদেশের সংঘাত
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্র নতুন করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। ইরান সমর্থিত আনসারুল্লাহ হুতি বাহিনী এবং সৌদি আরব সমর্থিত জোট বাহিনীর মধ্যে টাইজ প্রদেশ ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি লোহিত সাগরের কৌশলগত মোখা (Al-Mocha) বন্দরে সৌদি সমর্থিত শক্তির জন্য আসা একটি রসদবাহী জাহাজে হুতিরা একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একদিনেই প্রায় ৩০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বেশ কিছু ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে তারা। যদিও বিপরীত পক্ষ একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে, তবে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে হুতিদের এমন সমন্বিত আক্রমণ প্রমাণ করে যে তাদের সামরিক সক্ষমতা বহাল রয়েছে।
৫. জিবুতিতে মার্কিন MQ-9 রিপার ড্রোন ভূপাতিত ও লোহিত সাগরের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ইয়েমেন সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে লোহিত সাগরের অপর তীরে জিবুতির আকাশসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক MQ-9 রিপার (MQ-9 Reaper) ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কৌশলগতভাবে জিবুতিতে আমেরিকা, চীন ও অন্যান্য দেশের প্রধান সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত। মার্কিন ড্রোনটি কী ধরনের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলো অথবা কোনো আঞ্চলিক শক্তি এতে সরাসরি যুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে লোহিত সাগর ও বাব-এল-মানদেব প্রণালী কেন্দ্রিক সংঘাত অঞ্চল কেবল স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আকাশসীমার সামগ্রিক নিরাপত্তাকেও চরম হুমকিতে ফেলেছে।
৬. বাংলাদেশের প্রসিডেন্ট নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ও কর্নেল (অব:) অলি আহমেদের লড়াই
আন্তর্জাতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বাংলাদেশে প্রসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে নতুন নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর পক্ষ থেকে সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটের পক্ষ থেকে সাবেক মন্ত্রী ও বীর বিক্রম কর্নেল (অব:) অলি আহমেদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দুই বিশিষ্ট প্রার্থীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন রয়েছে, যার ফলে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটাভুটি এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নে এটি এক নতুন মাত্র যুক্ত করেছে।
৭. সংসদীয় ব্যবস্থার অনুচ্ছেদ ৭০ ও জুলাই সনদের আইনি ফাঁদে প্রেসিডেন্সিয়াল ভোট
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের কোনো সদস্য নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না; দিলে তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ হয়ে যায়। জুলাই বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় 'জুলাই সনদ'-এর আওতায় এই ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আইনি রূপ লাভ করেনি। এর ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের মালিক হিসেবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় লাভ গাণিতিকভাবে নিশ্চিত। তবে এই নির্বাচনী কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটাধিকারের অনুপস্থিতি নিয়ে রাজপথ ও সুশীল সমাজে নতুন করে গণতান্ত্রিক কাঠামোর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
৮. মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পারিবারিক পটভূমি ও আপসমুখী রাজনীতির মূল্যায়ন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ইতিহাস ও নীতি নিয়ে বিরোধী বলয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সাবেক এই মহাসচিবকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিএনপির আপসমুখী ও মৃদু রাজনৈতিক কৌশলের স্থপতি বলা হয়ে থাকে। তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে বাবা মুসলিম লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ছিলেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো সমালোচনা করে থাকে। একই সাথে, মহান মুক্তিযুদ্ধে তার নির্দিষ্ট সেক্টর বা সরাসরি অংশগ্রহণের তথ্য নিয়ে বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উত্থাপন করা হলেও তিনি বাংলাদেশপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেই তার ভিত্তি হিসেবে দাবি করেন। তার ভারত সংক্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি ও ইসলামি অনুশাসনের প্রশ্নে উদারনৈতিক অবস্থানও দলের ভেতরে-বাইরে চর্বিতচর্বণ হচ্ছে।
৯. কর্নেল অলি আহমেদের সামরিক ঐতিহ্য, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও জাতীয়তাবাদী প্রভাব
১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রসিডেন্ট প্রার্থী কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ দেশের রাজনীতিতে এক আপসহীন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য এবং প্রয়াত প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ট এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা (বীর বিক্রম)। ছায়াসংসদ ও রাজনৈতিক মঞ্চে ভারতের একচেটিয়া প্রভাবের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের সোচ্চার ভূমিকা ও দৃঢ় অবস্থান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ভোটারদের মাঝে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সংসদীয় হিসাবের কারণে জয় অসম্ভব জেনেও ১১ দলীয় জোট অলি আহমেদকে প্রার্থী করে মূলত প্রসিডেন্ট পদের জন্য একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা ও সার্বভৌমত্বকামী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চেয়েছে।
১০. বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংগ্রাম: মহাসচিব পদে রিজভী আহমেদ বনাম সালাউদ্দিন আহমেদ
প্রসিডেন্ট পদে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য উত্তরণের পাশাপাশি বিএনপির নতুন মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরে তীব্র মেরুকরণ ও গ্রুপিং দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন কঠিন সময়ে দলের কার্যালয় আগলে রেখে রাজপথের আন্দোলন ও মামলা-হামলার মুখোমুখি হওয়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে সাধারণ কর্মীরা মহাসচিব হিসেবে দেখতে চান। অপরদিকে, দীর্ঘ গুম ও নির্বাসন শেষে ফিরে আসা সাবেক মন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদও এই গুরুত্বপূর্ণ পদের শক্ত দাবিদার। ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতৃত্ব বনাম অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কাঠামোর এই লড়াই দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করবে।
১১. সিরিয়া-রাশিয়া কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তি: আহমেদ আল-শারার ভূ-রাজনৈতিক চাল
মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে সিরিয়ার নতুন শাসক আহমেদ আল-শারা (আবু মোহাম্মদ আল-জুলানি) এবং রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সামরিক-বেসামরিক চুক্তির মাধ্যমে। দীর্ঘ ১৮ মাসের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর সিরিয়ার ভূখণ্ডে থাকা রুশ নৌঘাঁটি ও বিমানঘাঁটির ওপর দামেস্কের সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পূর্ববর্তী আসাদ সরকারের মতো একক হস্তক্ষেপর সুযোগ না রেখে নতুন চুক্তির অধীনে রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামোকে সিরীয় সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও যৌথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে সিরিয়া কেবল কোনো একক ব্লকের (যেমন আমেরিকা বা তুরস্ক) ওপর নির্ভর না করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করছে।
১২. সিরিয়ার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি ও ইসরায়েলি আগ্রাসন প্রতিরোধের নতুন ছক
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব নিজেদের কেবল পশ্চিমা শক্তির অণুগামী হিসেবে উপস্থাপন না করে রাশিয়ার মতো পরাশক্তিকে কৌশলগত দূরত্বে রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসী তৎপরতার মুখে এই নতুন ভারসাম্য দামেস্কের জন্য একটি প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করবে। রাশিয়ার কাছ থেকে বিমান বাহিনীকে আধুনিকায়ন ও সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ অব্যাহত রেখে দামেস্ক একদিকে ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মুদ্রা ছাপানোর কাজের চুক্তি বজায় রেখে জাতীয় স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
১৩. বাংলাদেশের বিপিসি প্রধান অপসারণ বিতর্ক ও বসুন্ধরা গ্রুপের জ্বালানি খাতের ওপর নজর
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা ও সরকারি নীতি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউর রহমানকে তড়িঘড়ি করে অপসারণের পেছনে দেশের একটি অন্যতম শীর্ষ বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের চাপ ছিল বলে নানা আলোচনা রয়েছে। বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) আমদানির একচেটিয়া সুযোগ প্রদানের প্রস্তাব নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করায় এই প্রশাসনিক রদবদল ঘটানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
১৪. জ্বালানি খাতে একচেটিয়া বেসরকারি একাধিপত্য ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি
ইতিপূর্বে বাংলাদেশে এলপিজি গ্যাস খাত বেসরকারি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে দর কমানো সম্ভব হয়নি। এখন ডিজেল ও পেট্রোলের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সম্পদ যদি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চরম আঘাত হানবে। যে বাণিজ্যিক গোষ্ঠী অতীতে রাজনৈতিক ফায়দা তুলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মিডিয়ার অপব্যবহার করেছে, তাদের হাতে কৌশলগত জ্বালানি খাত তুলে দিলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
১৫. ক্রনিকল পয়েন্টের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও ভূ-রাজনৈতিক উপসংহার
পরিশেষে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড় এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরায়েলের নীতিগত বিরোধ আন্তর্জাতিক অস্থিরতাকে দীর্ঘায়িত করছে। অন্যদিকে, সিরিয়া তার জাতীয় স্বার্থে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন পথ উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিদেশি শক্তির অশুভ প্রভাব বা দেশের ভেতরে ক্রোনি-ক্যাপিটালিজম বা তোষামোদমূলক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জাতীয় সম্পদ তুলে না দিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রসিডেন্ট নির্বাচন বা জ্বালানি নীতির মতো জায়গায় জনগণের সরাসরি চাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।
Chronicle Point Analysis:
- ১. হরমুজ প্রণালী কৌশল: ওয়াশিংটনের নিরঙ্কুশ চাপ তৈরি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ও সামরিক পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে ইরানকে পূর্বশর্তহীন আলোচনায় আনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
- ২. ইসরায়েলি একতরফাবাদ: আমেরিকার ১৫ দফার প্রস্তাব নাকচ করে নেতানিয়াহুর একক সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের কূটনৈতিক নেতৃত্বকে খর্ব করেছে।
- ৩. ফিলিস্তিন সংকটের জটিলতা: হামাসের যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের সর্বাত্মক যুদ্ধের নীতি পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
- ৪. লোহিত সাগরের যুদ্ধক্ষেত্র: মোখা বন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইয়েমেনের কৌশলগত জলসীমায় হুতিদের প্রাধান্য বজায় থাকার প্রমাণ মিলেছে।
- ৫. আকাশসীমার নিরাপত্তা ঝুঁকি: জিবুতিতে মার্কিন MQ-9 ড্রোন ভূপাতিত হওয়া প্রমাণ করে আঞ্চলিক মিত্র ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স প্রযুক্তির নাগাল বৃদ্ধি পেয়েছে।
- ৬. প্রসিডেন্ট নির্বাচনের মেরুকরণ: বাংলাদেশে মির্জা ফখরুল বনাম অলি আহমেদের লড়াই কেবল ব্যক্তি নির্বাচন নয়, বরং রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাত।
- ৭. ৭০ অনুচ্ছেদের রাজনৈতিক অচল অবস্থা: জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হলেও গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জুলাই সনদের কার্যকারিতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
- ৮. ফখরুলের রাজনৈতিক কৌশল: দীর্ঘ আন্দোলন ব্যর্থতার দায় এবং সমঝোতামূলক ভাবমূর্তি মির্জা ফখরুলকে ডানপন্থী ও তরুণ শিবিরের কাছে প্রশ্নের মুখে রেখেছে।
- ৯. কর্নেল অলির জাতীয়তাবাদী সমর্থন: খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতবিরোধী স্পষ্ট অবস্থান অলি আহমেদকে জনগণের কাছে বিকল্প অভিভাবকত্ব দিয়েছে।
- ১০. বিএনপির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন: মহাসচিব পদে রিজভী আহমেদ বনাম সালাউদ্দিন আহমেদের লড়াই বিএনপির মূলধারার ত্যাগী রাজনীতি বনাম সুযোগসন্ধানী রাজনীতির পরীক্ষা।
- ১১. সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষা: সিরিয়া-রাশিয়া সামরিক চুক্তি পশ্চিমা বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে যে নতুন দামেস্ক কোনো একক শক্তির পুতুল সরকার হিসেবে কাজ করবে না।
- ১২. দামেস্কের ভারসাম্যমূলক নীতি: বিমানঘাঁটি হস্তান্তরের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রশিক্ষণ লাভ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে সিরিয়া নিজের প্রতিরক্ষা মজবুত করছে।
- ১৩. বিপিসির প্রাতিষ্ঠানিক সংকট: আমলাতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রেসারে জ্বালানি নীতি পরিবর্তন প্রশাসনিক সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
- ১৪. জ্বালানি সিন্ডিকেটের ভয়াবহতা: বসুন্ধরা গ্রুপের মতো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানি তেলের বাজার ছেড়ে দেওয়া দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য আত্মঘাতী।
- ১৫. জাতীয় নিরাপত্তার তাগিদ: বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের চেয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার প্রাধান্য পেতে হবে।