গাজায় হামাসের রাজনৈতিক চাল ও নেতানিয়াহুর উভয় সংকট: মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নেপালে অস্থিরতা ও ৫জি ভূ-রাজনীতি
গাজায় হামাসের রাজনৈতিক চাল ও নেতানিয়াহুর উভয় সংকট: মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নেপালে অস্থিরতা ও ৫জি ভূ-রাজনীতি
গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে একের পর এক বিস্ফোরক মোড় নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন সামরিক আগ্রাসন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিলেন, ঠিক তখনই হামাস এক অভাবনীয় কৌশলগত ঘুঁটি চেলে পুরো সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। অস্ত্র সমর্পণের ঘোষণা এবং গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত জুড়ে দিয়ে নেতানিয়াহুকে চরম রাজনৈতিক ও সামরিক 'উভয় সংকটে' ফেলে দিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে, ইরাক ও কুর্দিস্তান অঞ্চলে একের পর এক ইরানি ও প্রক্সি হামলায় অতিষ্ঠ হয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক গুটিয়ে নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়ায় আবার ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন নেপালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উস্কে উঠায় তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। বিশ্ব রাজনীতির এসব বহুমুখী টানাপোড়েন, সামরিক জোট গঠন এবং প্রযুক্তিগত শক্তির মহড়ার একটি সুগভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিয়ে সাজানো হয়েছে Chronicle Point-এর এই বিশেষ প্রতিবেদন।
১. গাজায় হামাসের নতুন রাজনৈতিক গুটি এবং নেতানিয়াহুর উভয় সংকট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠক সেরে ওয়াশিংটন থেকে ফেরা মাত্রই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে এবং গাজায় হামলা আরও তীব্র করে আসন্ন নির্বাচনে জয় সুনিশ্চিত করতে। কিন্তু গাজা থেকে হামাস হঠাৎ এমন একটি যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক শর্ত পেশ করেছে, যা ইসরাইলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। হামাস সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা যুদ্ধবিরতি মানবে এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় অস্ত্র জমা দেবে—তবে শর্ত হলো ইসরাইলকে গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এর জামিনদার বা গ্যারান্টার হতে হবে। এর ফলে নেতানিয়াহু এমন এক ফাঁদে পড়েছেন যেখানে গাজা থেকে সেনা সরালে তার চরমপন্থী ডানপন্থি ভোটব্যাংক তাকে 'পরাজিত' ঘোষণা করবে, আর সেনা না সরালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হবে।
২. অস্ত্র সমর্পণের কৌশলগত প্রস্তাব: হামাসের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ফাঁদ
হামাসের অস্ত্র সমর্পণের প্রস্তাবটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক বন্ধুরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সাথে যৌথ আলোচনার ফল। হামাস জানিয়েছে, তারা ইসরাইলি সেনার কাছে সরাসরি অস্ত্র জমা দেবে না, বরং একটি নবগঠিত ফিলিস্তিনী জাতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তা হস্তান্তর করবে। এর ফলে ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করতে হবে তারা আসলেই শান্তি চায় নাকি শুধুই গাজাকে ধ্বংস করতে চায়। মার্কিন প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে হামাস গ্যারান্টি চেয়েছে—যদি ফিলিস্তিন নিরাপত্তা পায় তবে তারা যুদ্ধ ত্যাগ করবে। এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইসরাইলের বহুদিনের দাবিকে ভেস্তে দিয়েছে।
৩. ইসরাইলি বাহিনীর সেনা প্রত্যাহার ও টাইমস অব ইসরাইলের চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট
ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'টাইমস অব ইসরাইল'-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বার্তা সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) গাজা থেকে কোনো অবস্থাতেই সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি নয়। ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন, গাজায় হামাসের মূল কাঠামো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার রাজনৈতিক ও সামরিক আত্মহত্যা হবে। এর জবাবে হামাসও পরিষ্কার জানিয়েছে, ইসরাইল এক পা পিছু না হঠলে ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ যোদ্ধারাও কোনো অস্ত্র হাতছাড়া করবে না। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন "আগে ডিম নাকি আগে মুরগি" বিতর্কে পর্যবসিত হয়েছে।
৪. পর্যায়ক্রমিক অস্ত্র জমা ও নতুন ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের দায়িত্বভার
হামাস তাদের প্রস্তাবে একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য ফর্মুলা বা 'স্টেজড প্ল্যান' দিয়েছে। প্রথম ধাপে হামাস হালকা ও ক্ষুদ্রাস্ত্র জমা দেবে এবং বদলে ইসরাইল প্রথম ধাপের সেনা প্রত্যাহার করবে। পরবর্তীতে ভারী অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে তখনই, যখন ইসরাইল গাজার প্রতিটি ইঞ্চি থেকে তাদের ট্যাঙ্ক ও সেনা সরিয়ে নেবে। অধিকন্তু, যে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর হবে, তাতে হামাস সমর্থিত সিভিলিয়ান টেকনোক্র্যাটদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে কাগজপত্রে অস্ত্র হাতবদল হলেও প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনের সার্বভৌম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গাজার মানুষের হাতেই থেকে যাবে।
৫. ইরাক ও কুর্দিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দ্বারপ্রান্তে ওয়াশিংটন
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্র সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পেন্টাগন বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরাক ও কুর্দিস্তানের বিপজ্জনক ঘাঁটিগুলো থেকে তাদের পূর্ণ সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। কয়েক বছরের সংঘাত ও অর্থনৈতিক খরচের পর ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে যে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা তাদের জন্য লাভজনক নয়, যার ফলে পেন্টাগন দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
৬. কুয়েতে ইরানি হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সমীকরণের নতুন প্রতিক্রিয়া
ইরাকের পাশাপাশি কুয়েতেও নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক খবরের ভিত্তিতে জানা যায়, কুয়েতভিত্তিক কিছু মার্কিন কিংবা আঞ্চলিক স্থানকে লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিপূর্বে কুয়েতের আকাশসীমা বা লজিস্টিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে গোপন তৎপরতা চালানোর অভিযোগ তুলেছিল তেহরান। এরই জবাবে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
৭. কুর্দিস্তানে তুর্কি মধ্যস্থতা ও এরদোয়ানের কৌশলগত পিস প্রসেস
ইরাকের কুর্দিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সরে গেলে সেখানকার কুর্দি যোদ্ধারা যাতে সরাসরি ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সে জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক চাল চালছেন। এরদোয়ান ইরানকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা কুর্দি অঞ্চলে সামরিক অভিযান কিছুটা শিথিল করে। একই সাথে আনকারা কুর্দিদের সাথে একটি অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রক্রিয়া বা 'পিস প্রসেস' শুরু করতে চাচ্ছে, যাতে কুর্দিরা অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নেয়। এরদোয়ানের ভয়, মার্কিন শূন্যতায় ইসরাইল কুর্দিস্তানকে তাদের দ্বিতীয় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
৮. লোহিত সাগরে সৌদি আরবের নতুন জোট গঠন ও ৪৩ দেশের সামরিক বৈঠক
লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার অজুহাতে সৌদি আরব একটি নতুন আঞ্চলিক জোট বা কোয়ালিশন গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে। রিয়াদ এ বিষয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৪৩টি দেশের সাথে আলোচনা শুরু করেছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪ থেকে ১৫টি দেশ জোটে যোগ দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, গাজায় যখন ফিলিস্তিনীদের ওপর চরম অত্যাচার চলছিল তখন কোনো সমন্বিত মুসলিম সামরিক জোট গঠিত হয়নি, কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ইয়েমেনকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সৌদি নেতৃত্ব এখন দ্রুত তৎপর হয়ে উঠেছে।
৯. ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হুথিদের ভূমিকা ও বাংলাদেশ-তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) বাহিনী গাজা আক্রমণের শুরু থেকেই ইসরাইল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে রেড সিতে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। জুমার নামাজ শেষে রাজধানী সানায় লাখ লাখ ইয়েমেনি ফিলিস্তিনের সমর্থনে রাজপথে নেমে এসেছে। সৌদি আরবের নতুন জোটে তুরস্ক শর্তসাপেক্ষে বাণিজ্য জাহাজের সুরক্ষার ব্যাপারে নীতিগত রাজি হলেও কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশকেও এই জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঢাকার উচিত হবে কোনো পরোক্ষ রাজনৈতিক বা সামরিক ফাঁদে পা না দিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা।
১০. নেপালে হঠাৎ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা: জয় শ্রীরাম স্লোগান ও সীমান্তে সহিংসতা
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ শান্ত হলেও ভারতের সীমান্তবর্তী নেপালের এলাকাগুলোতে হঠাৎ করেই উগ্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র হলেও নেপালে ঐতিহাসিকভাবে চমৎকার ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন নেপালী জেলাগুলোতে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান দিয়ে রথযাত্রা ও উস্কানিমূলক মিছিল বের করা হয়, যা স্থানীয় মসজিদগুলোর সামনে দীর্ঘক্ষণ ধরে বাদ্য বাজিয়ে তাণ্ডব চালায়। এর ফলে সংঘর্ষ ছড়ায়, যাতে ইতোমধ্যে তিনজন নিরীহ মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেক দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
১১. বালেন্দ্র শাহের নতুন রাজনীতি ও কাঠমান্ডুর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি
কাঠমান্ডুর বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তর ভারতের ক্ষমতাসীন মোদি সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। নেপালের তরুণ প্রজন্ম (Gen-Z) ও জনপ্রিয় নেতা বালেন্দ্র শাহের প্রভাবে কাঠমান্ডু এখন নয়াদিল্লির আজ্ঞাবহ করদ রাজ্য হিসেবে থাকতে নারাজ। নেপাল তার ভূ-বেষ্টিত (Landlocked) অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ভারত কর্তৃক শোষণের প্রতিবাদ করছে এবং চীন ও অন্যান্য দেশের সাথে স্বাধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে অস্থিতিশীল করতেই ভারতীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সীমান্তে সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছে।
১২. ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রভাব বিস্তার ও হায়দ্রাবাদের 'অপারেশন পোলো'র ঐতিহাসিক শিক্ষা
নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতার কৌশলটি ভারতের ১৯৪৭ পরবর্তী হায়দ্রাবাদ দখলের 'অপারেশন পোলো'র কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় হায়দ্রাবাদের নিজামের স্বাধীন সত্ত্বা ধ্বংস করতে সেখানে আরএসএস ও উগ্রবাদী প্রচারকদের পাঠানো হয়েছিল, মিথ্যা নির্যাতনের খবর রটানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে শান্তির অজুহাতে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হায়দ্রাবাদ দখল করা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, মোদি সরকারের কৌশলবিদরা নেপালেও অখণ্ড ভারতের এজেন্ডা চাপাতে একই ধরনের সামাজিক অস্থিরতার ছক কষছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।
১৩. ১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন: শুভেন্দু অধিকারীর আমন্ত্রণ ও নতুন বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিতাড়িত ও আলোচিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় ফিরিয়ে এনেছেন বিজেপির বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৭ সালে কলকাতায় ইসলাম বিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়ার কারণে তোপের মুখে পড়ে শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তসলিমা। এবার তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপান্তরে নিয়ে আসা হয়েছে; ধর্মীয় সনাতনী পোশাক পরিধান করে তিনি কলকাতায় পদার্পণ করেছেন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লোকসভা ও স্থানীয় নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্র করার অপচেষ্টা।
১৪. সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ
একদিকে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি সন্দেহে সাধারণ বাংলাভাষী মানুষদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং তাদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বিতর্কিত লেখিকাকে এনে অতিথি সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই দ্বিচারিতা নিয়ে সুশীল সমাজ ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল মহল মনে করছে, বিজেপির এই উস্কানিমূলক রাজনীতি বাংলাভাষী অঞ্চলে অস্থিরতা আরও বাড়াবে।
১৫. তুরস্কের ক্যান (KAAN) ৫ম প্রজন্মের ফাইটার জেটের নতুন প্রোটোটাইপ পরীক্ষা
সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বিশাল বড় সাফল্য নিয়ে এসেছে তুরস্ক। তুর্কি এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (TAI) নির্মিত ৫ম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেট 'ক্যান' (KAAN)-এর P1 প্রোটোটাইপের সফল গ্রাউন্ড ট্যাক্সি টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি পৃথক মডেল প্রোটোটাইপের মধ্যে এই সফল পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, ২০২৮ সালের মধ্যেই তুর্কি বিমান বাহিনীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে এই চালকবিহীন ও চালকসহ স্টিলথ সুপার-জেট। এটি এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দেবে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. নেতানিয়াহুর কৌশলগত ফাঁদ: হামাস যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে নেতানিয়াহুর সামরিক বিজয় দেখানোর শেষ সুযোগটি কেড়ে নিয়েছে।
- ২. আন্তর্জাতিক কূটনীতির রূপান্তর: হামাস গ্যারান্টার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে এনে প্রমাণ করেছে তারা রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
- ৩. ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ফাটল: সেনা প্রত্যাহারে আইডিএফ-এর অসম্মতি প্রমাণ করে ইসরাইলি রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা চরম আকার ধারণ করেছে।
- ৪. কৌশলগত অস্ত্র সমর্পণ: ফিলিস্তিনী টেকনোক্র্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের শর্ত মূলত গাজার সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার ছক।
- ৫. মার্কিন পতন ও মধ্যপ্রাচ্য খালি করা: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী সেনা উপস্থিতির যুগ শেষ হতে চলেছে, যা ইরানকে বিশাল রাজনৈতিক সুবিধা দেবে।
- ৬. তেহরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা: কুয়েত ও ইরাকে প্রতিরোধ তৈরি করে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে যেকোনো আগ্রাসনের মূল্য তাৎক্ষণিক দিতে হবে।
- ৭. এরদোয়ানের কুর্দি কার্ড: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ইসরাইলি প্রক্সি তৈরি বন্ধ করতে আনকারা দ্রুত কুর্দিদের সাথে রাজনৈতিক রফা করতে চাইছে।
- ৮. রিয়াদের বিপরীতমুখী জোট: ফিলিস্তিনের বিপদে নীরব থাকা সৌদি আরব এখন নিজের বাণিজ্যিক পথ রক্ষায় ৪৩ দেশের জোট তৈরিতে মরিয়া।
- ৯. বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: ঢাকা কোনোভাবেই সৌদি নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বা বাণিজ্যিক ফাঁদে জড়ানো উচিত নয়, বরং নিরপেক্ষ থাকা শ্রেয়।
- ১০. নেপালে ভারতীয় প্রক্সি উত্তেজনা: সীমান্ত ঘেঁষে উগ্র ধর্মীয় স্লোগান ও রথযাত্রা রপ্তানি করে নেপালের সম্প্রীতি নষ্টের ষড়যন্ত্র স্পষ্ট।
- ১১. জেন-জি নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ: কাঠমান্ডুর বালেন্দ্র শাহের স্বাধীন কূটনীতি নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক 'দাদাগিরি'র জন্য প্রধান হুমকি।
- ১২. অখণ্ড ভারতের নতুন ছক: হায়দ্রাবাদের মতোই সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে কাঠমান্ডুকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
- ১৩. তসলিমা নাসরিনের রাজনৈতিক ব্যবহার: কলকাতায় তসলিমা নাসরিনকে ফিরিয়ে এনে বিজেপি বাংলায় ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়াতে চাইছে।
- ১৪. বাংলাভাষী রাজনীতির দ্বিমুখী নীতি: একদিকে সাধারণ মুসলিমদের 'বাংলাদেশি' আখ্যা দিয়ে নিপীড়ন, অন্যদিকে তসলিমাকে তোয়াজ করা বিজেপির দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে।
- ১৫. তুর্কি সামরিক বিপ্লব: KAAN ফাইটার জেটের সফলতা বিশ্ব সামরিক বাজারে পশ্চিমা ও মার্কিন একচেটিয়া আধিপত্যের পতন ঘটাবে।