তালেবান শাসনের ৫ বছর ও পরাশক্তি পরবর্তী আফগানিস্তান: নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ সংকটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
তালেবান শাসনের ৫ বছর ও পরাশক্তি পরবর্তী আফগানিস্তান: নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ সংকটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
১৫ আগস্ট ২০২১ — ২০২৬ সালের আগস্ট। দেখতে দেখতে পূর্ণ হলো আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর অপমানজনক প্রত্যাহার এবং তালেবানের পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহাসিক পাঁচ বছর। আজ থেকে পাঁচ বছর পূর্বে রাজধানী কাবুল দখলের পর আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কার পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। একদিকে পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে শঙ্কা ছিল দেশটিতে নতুন করে গৃহযুদ্ধ, চরম সামাজিক পতন ও মৌলবাদী তাণ্ডবের; অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের অনেকের প্রত্যাশা ছিল একটি আদর্শিক ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রের উত্থান। দীর্ঘ অর্ধ-দশক পর আজ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফগানিস্তান আজ এক জটিল বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যেখানে নিরাপত্তা ও মুদ্রা স্থায়িত্বে এসেছে অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা, অন্যদিকে নারী শিক্ষা, ব্যাপক বেকারত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির খরায় দেশটি জর্জরিত। এই বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে পাঁচ বছরের আফগানিস্তানের প্রকৃত অবস্থা, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য ও নতুন উদীয়মান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের আদ্যোপান্ত।
১. মার্কিন প্রত্যাহার ও তালেবান শাসনের পাঁচ বছর: পরাশক্তি পরবর্তী আফগানিস্তানের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর
দুটি দীর্ঘ দশক ধরে চলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক উপস্থিতির পর ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কোন রক্তপাত ছাড়াই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে কাবুল। মার্কিন সেনাদের তড়িঘড়ি প্রস্থান ছিল একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক মোড়। গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে তৈরি হয়েছে দুটো সমান্তরাল গল্প। একদিকে অর্জিত হয়েছে যুদ্ধের সমাপ্তি ও বৈদেশিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক স্বস্তি, অন্যদিকে চেপে বসেছে মারাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থবিরতা এবং সর্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য। বিগত পাঁচ বছর ধরে আফগান জনগণ প্রতিদিনের সামরিক ভয় ও বিমান হামলার আতঙ্ক থেকে মুক্ত হতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাদের জীবনযাত্রায় যুক্ত হয়েছে নতুন স্তরের অর্থনৈতিক সংগ্রাম। তালেবান প্রশাসন দাবি করছে তারা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসন নিশ্চিত করেছে, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত থাকায় পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিকাশ থমকে আছে।
২. নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ: চেকপোস্টের দৌরাত্ম্য অবসান ও একক কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতিষ্ঠা
মার্কিন দখলদারিত্বের সময় কাবুলসহ পুরো আফগানিস্তান ছিল হাজারো সামরিক ও পুলিশি চেকপোস্টে বিভক্ত। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে মার্কিন সৈন্য, আফগান সরকারি বাহিনী এবং আঞ্চলিক ওয়ারলর্ডদের বহুস্তরের চেকপোস্টের মুখোমুখি হতে হতো আফগান নাগরিকদের। সাধারণ পথচারীদের প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখে গুলি চালানো হতো কিংবা বাড়িঘরে নৈশ অভিযান (নাইট রেইড) চালানো হতো। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে আসে। ফলে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়হীন চেকপোস্ট ও আঞ্চলিক ডনদের চাঁদাবাজির রাজত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ব্যবসায়ীরা নিরাপদে পণ্য পরিবহন করতে পারছেন। রাজধানী কাবুলের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছর তারা সামরিক বিস্ফোরণের ভয় ছাড়া শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছেন। যুদ্ধপরবর্তী প্রজন্মের কাছে এটি এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক বিজয়, যদিও এই সার্বিক নিরাপত্তার অন্তরালে রয়েছে তালেবানের কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি।
৩. অর্থনীতিতে আফগানির বিস্ময়কর উত্থান: ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী মুদ্রার রহস্য
সাধারণত যুদ্ধবিদ্ধস্ত কিংবা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা দেশের জাতীয় মুদ্রার মান দ্রুত সংকুচিত হয়, কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক বিপরীত চিত্র। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে আফগান মুদ্রার (আফগানি) মান নেমে গিয়েছিল ১২৭ আফগানিতে। তবে সুসংহত অর্থনীতি নীতি, ডলার পাচার রোধ, কঠোর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নগদ ডলারের বৈদেশিক আগমন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ২০২৬ সালে এসে প্রতি ডলারের বিপরীতে আফগানির মান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৭ আফগানিতে। বাংলাদেশি টাকার হিসেবেও যেখানে ২০২১ সালে ১ আফগানি মিলতো ৮০ পয়সায়, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৮০ পয়সায়। তালেবানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মৌলভী হায়াতুল্লাহ মুজাহিদের মতে, মুদ্রার এই অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব অর্জিত হয়েছে অবৈধ মুদ্রা পাচার রোধ, কঠোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণের মাধ্যমে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ছাড়া কেবল প্রশাসনিক প্রভাবে এই স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে তা দেখার বিষয়।
৪. আফিম চাষে ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা: বিশ্বব্যাপী মাদকবিরোধী আন্দোলনে নজিরবিহীন সাফল্য
গত দুই দশক ধরে মার্কিন উপস্থিতির সমান্তরালে আফগানিস্তান পরিণত হয়েছিল বিশ্বের প্রধান আফিম ও হিরোইন সরবরাহকারী কেন্দ্রে। প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে পপি চাষ হতো, যা পশ্চিমা সিন্ডিকেট ও স্থানীয় চক্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাদকের বাজারে ছড়িয়ে পড়তো। ২০২২ সালে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা পপি বা আফিম চাষ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে ডিক্রি জারি করেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে আফগানিস্তানে আফিম চাষ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে আফিম উচ্ছেদ করে সেখানে খাদ্যশস্য ও প্রথাগত কৃষিজ পণ্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ফিলিপাইনের মতো দেশে মাদক নির্মূলে চরম বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল, সেখানে তালেবান সরকার প্রশাসনিক আদেশে বিশ্বস্ততার সাথে মাদক উৎপাদন বন্ধ করে বিশ্বজুড়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মহলে তালেবানের এই অর্জনকে যেভাবে প্রশংসিত করার কথা ছিল, ভূ-রাজনৈতিক কারণে তা ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
৫. মেগা সেচ প্রকল্প 'কোশ তেপা খালের' বৈপ্লবিক অগ্রগতি: নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতার যুদ্ধ
পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে তালেবান সরকার গ্রহণ করেছে উত্তর আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক 'কোশ তেপা খাল' (Qosh Tepa Canal) প্রকল্প। প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমুদরিয়া নদী থেকে পানি এনে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর শুষ্ক জমিকে সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে এই প্রকল্পে। কোশ তেপা খালকে তালেবান সরকার তাদের জাতীয় গর্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করছে। এটি সম্পন্ন হলে আফগানিস্তান গম উৎপাদনে পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে এবং মধ্য এশিয়ায় খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারবে। তবে উজবেকিস্তান ও তার্কমেনিস্তানের মতো নিম্নাঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলো আমুদরিয়া নদীর পানি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তালেবান প্রশাসন।
৬. খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা: ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ ভাণ্ডার এবং বৈশ্বিক নজর
আফগানিস্তানকে বহু আগে থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদের খনি বলা হয়। আনুমানিক প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ ভূগর্ভে সঞ্চিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহামূল্যবান লিথিয়াম (যার আনুমানিক মূল্য আকাশচুম্বী), ৪২৫ বিলিয়ন ডলারের আকরিক লোহা, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তামা, ১২ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের কয়লা এবং প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রেয়ার আর্থ মেটেরিয়ালস (Rare Earth Materials)। ইভি বা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের যুগে লিথিয়াম এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের কারণে পুরো বিশ্বের নজর এখন আফগান মাটির দিকে। মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ার পর এই অপার সম্পদ আহরণে চীনের শীর্ষ প্রযুক্তিগত ও খনি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেবল খনিজ খাতকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ চিরতরে বদলে যেতে পারে।
৭. চীনা বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব: মেস আই nac ও আমুদরিয়া প্রকল্পের বাস্তব চিত্র
মার্কিন প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের শূন্যস্থান পূরণে সবচেয়ে এগিয়ে এসেছে চীন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন ও আফগানিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের লোগার প্রদেশের 'মেস আই nac' (Mes Aynak) তামা খনি প্রকল্পের কাজ চীনা এনসিএসি কোম্পানির মাধ্যমে ২০২৪ সাল থেকে পুনরায় গতি পেয়েছে। এছাড়া আমুদরিয়া অববাহিকায় চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি (CNPC) তেল উত্তোলন শুরু করেছে, যেখানে ২০২৪ সালের জুন মাসেই ১ লাখ ৩০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। একইসাথে তাখার প্রদেশে ৩০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সোনা উত্তোলন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীন সরকার আফগান পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে লিথিয়াম খাতের একটি ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব কৌশলগত কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান, কারণ তারা এটিকে আরও পরিপক্ব শর্তে চুক্তিবদ্ধ করতে চায়।
৮. আঞ্চলিক বাণিজ্য পুনর্গঠন: ভারত ও রাশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের কৌশলগত অর্থনৈতিক লেনদেন
পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা ও ট্রানজিট ব্লক হওয়ার কারণে আফগানিস্তান তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ভারতের সাথে আফগানিস্তানের বাণিজ্য প্রায় ৯০৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পাকিস্তানমুখী বাণিজ্যের বিকল্প হিসেবে নতুন উন্মোচন ঘটিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্য যেখানে ৫ বিলিয়ন ডলার ছিল, সীমান্ত সংঘাতের কারণে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৬৭ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৯২% পতন)। বিপরীতে, ভারত কাবুলে তার মিশন পুনঃস্থাপন করে ড্রাই ফ্রুটস, ফল ও খনিজ সম্পদ আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ২০২৫ সালে বাণিজ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯০ মিলিয়ন ডলারে। রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, গম ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করছে আফগানিস্তান এবং বিনিময়ে ড্রাই ফ্রুটস রপ্তানি করছে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক এই নতুন অক্ষ কাবুলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর পথ তৈরি করছে।
৯. মেয়েদের শিক্ষা ও নারী অধিকার সংকট: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় সমালোচনার তীর
পাঁচ বছরের অগ্রগতি স্বত্ত্বেও তালেবান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক হলো নারী শিক্ষা ও অধিকারের উপর অব্যাহত নিষেধাজ্ঞা। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ইউনেস্কোর (UNESCO) ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে আরও ২ লাখ বেশি। জাতিসংঘ নারী সংস্থা (UN Women) এই পরিস্থিতিকে 'নারী অধিকার ব্যবস্থার জঘন্যতম সংকট' বলে আখ্যায়িত করেছে। নারীদের পার্ক, জিম এবং পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) ছাড়া দূরপাল্লার ভ্রমণে কড়াকড়ি বলবৎ রয়েছে। যদিও তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং ইসলামী নীতি ও পৃথক অবকাঠামো প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ; কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে না পারায় বিশ্বজুড়ে তালেবানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
১০. চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্য: বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকট ও জাতিসংঘ সহায়তা হ্রাসের প্রভাব
নিরাপত্তা মিললেও সাধারণ আফগানদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বর্তমান বেকারত্বের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের (Multidimensional Poverty) মধ্যে বসবাস করছে। বর্তমানে প্রায় ২৮ মিলিয়ন মানুষের মৌলিক মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। আফগান ব্যাংকিং খাত বৈশ্বিক সুইফট (SWIFT) নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আসাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, অন্যদিকে নগদ অর্থের সংকট সাধারণ পরিবারগুলোকে দৈনিক বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামে ঠেলে দিয়েছে।
১১. ইরান-পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ শরণার্থীর জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন: মানবিক বিপর্যয় ও বাড়তি চাপ
যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাঝেই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ইরান থেকে শুরু হয়েছে আফগান শরণার্থীদের জোরপূর্বক বহিষ্কার। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে কেবল পাকিস্তান ও ইরান থেকেই প্রায় ২৮ লাখেরও বেশি আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক সীমান্তে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ইরান থেকে প্রায় ১০ লাখ এবং পাকিস্তান থেকে সমপরিমাণ আফগান পরিবার গৃহহীন অবস্থায় নিজ দেশে প্রবেশ করেছে। এই বিপুল পরিমাণ বাস্তুচ্যুত মানুষের বাসস্থান, খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা তালেবান প্রশাসনের জন্য এক সুবিশাল মানবিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা একে আফগানিস্তানের জন্য এক 'মাল্টি-লেয়ার প্রসংগ সংকট' বলে অভিহিত করেছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে।
১২. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির খরা: কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কেবল রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও তালেবান সরকার এখনও বৈশ্বিক কূটনৈতিক স্বীকৃতির দিক থেকে চরম পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশের সাথে তালেবানের ব্যবসায়িক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত একমাত্র রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সরকারকে বৈধতা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে তালেবান সরকারকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি প্রদান করে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এছাড়া চীন, ভারত, তুরস্ক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো দূতাবাস চালু রাখলেও বা বাণিজ্য করলেও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ঝুলিয়ে রেখেছে। জাতিসংঘের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন, নারী অধিকার নিশ্চিতকরণ ও মানব অধিকার সুসংহত না হওয়া পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব তাদের স্বীকৃতি প্রদান করবে না।
১৩. পাকিস্তান সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি: আইএস ও বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা
বাইরের বড় পরাশক্তি চলে গেলেও আঞ্চলিক সীমান্তে নতুন সংঘাত আফগানিস্তানের প্রধান মাথাব্যথার কারণ। বিশেষ করে পাকিস্তান সীমান্তে ডুরান্ড লাইন ঘেঁষে প্রতিনিয়ত তালেবান ও পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষীদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই সীমান্ত সংঘর্ষে প্রায় ৩৭০ জন আফগান নিহত হয়েছেন। এছাড়া ২০১৫ সালে আত্মপ্রকাশ করা আইএস-খোরসান (ISIS-K) গ্যাং এবং তালেবান বিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (NRF) এর ছদ্মবেশী হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশজুড়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রায় ৯,৮০০টি বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, টিটিপি (TTP) আফগান মাটিকে ব্যবহার করছে; যা অস্বীকার করেছে কাবুল। এই সীমান্ত অস্থিরতা কাবুলের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
১৪. মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ও শিল্পায়ন: ট্রান্স-আফগান রেলওয়ে, পাশদান বাঁধ ও হেরাত শিল্প পার্ক
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তালেবান প্রশাসন কিছু বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে তাদের দূরদর্শিতা দেখিয়েছে। হেরাতে ১১৭ মিলিয়ন ডলারের 'পাশদান বাঁধ' এবং ফারাহ প্রদেশের 'বাকশাবাদ বাঁধ' নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যা বিদ্যুৎ ও সেচে বিপ্লব আনবে। বিদ্যুৎ খাতের আন্তর্জাতিক প্রকল্প 'CASA-1000' এবং তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত 'TAPI' গ্যাস পাইপলাইনের আফগান অংশের কাজ ফের চালু হয়েছে (হেরাতে ৫২% কাজ শেষ)। একইসাথে উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে যুক্ত করতে গঠিত হয়েছে 'ট্রান্স-আফগান রেলওয়ে' প্রকল্প। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে হেরাত শিল্প পার্কে গুলবাহার ১৪৩ মিলিয়ন ডলারের সিমেন্ট কারখানা ও ৩০ মিলিয়ন ডলারের ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানা চালু হয়েছে, যা ইতিমধ্যে ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
১৫. বাদাকশান ও তাখার স্বর্ণখনি ঘিরে নতুন অসন্তোষ: চীন, স্থানীয় জনগণ ও তালেবানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নতুন সংকট
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাকশান ও তাখার প্রদেশে সোনা ও খনিজ খনি কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। অভিযোগ উঠেছে, চীনা কোম্পানিগুলোকে সোনা উত্তোলনের অনুমতি দেয়ার পর স্থানীয় কৃষি জমি ও সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় আফগান বাসিন্দারা এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু করেছে। এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তালেবানের কেন্দ্রীয় সরকার ও আঞ্চলিক কমান্ডারদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। আঞ্চলিক তালেবান নেতারা রাজস্বের সিংহভাগ স্থানীয় জনগণের ও নিজেদের জন্য দাবি করছেন। একদিকে বৈদেশিক অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের মৌলিক ক্ষোভ ও তালেবান বিরোধী অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গ্রুপগুলোর উস্কানি—সব মিলিয়ে খনিজ সম্পদ কেন্দ্রিক এই অসন্তোষ আফগানিস্তানের নতুন অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করতে পারে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থায়িত্ব: দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধ শেষ করে একক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গড়ে তুলতে না পারা কাবুলের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা।
- ২. প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও নিরাপত্তা: সাধারণ মানুষের জন্য চেকপোস্টমুক্ত নিরাপদ ভ্রমণ অর্জিত হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের অনুপস্থিতি নিরাপত্তার সাফল্যকে আংশিক ফিকে করে দিচ্ছে।
- ৩. মুদ্রা নীতির সাফল্য: মার্কিন ডলারের বিপরীতে আফগানি মুদ্রার মান ধরে রাখা সম্ভব হলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে এই কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
- ৪. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও আফিম নিষেধাজ্ঞা: বিশ্বজুড়ে আফিম সরবরাহ বন্ধ করে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হলেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তালেবানের এই বিশাল অর্জন সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
- ৫. কৃষি কেন্দ্রিক আত্মনির্ভরশীলতা: কোশ তেপা খাল আফগানিস্তানকে খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী করার মাস্টারপ্ল্যান, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে ওয়াটার ডিপ্লোমেসিতে নতুন কৌশল তৈরি করবে।
- ৬. ভূ-রাজনৈতিক খনিজ সম্পদ: ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ বিশ্বশক্তির নজর কাড়লেও আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি ছাড়া এই সম্পদ নিষ্কাশন অত্যন্ত ধীরগতির হতে বাধ্য।
- ৭. চীনের বাণিজ্যিক প্রভাব: চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে আফগানিস্তানকে ঋণের ফাঁদ ও খনিজ সম্পদভিত্তিক সার্বভৌমত্ব সংকটের মুখোমুখি করতে পারে।
- ৮. আঞ্চলিক বিকল্প পথ: পাকিস্তানের সাথে বৈরিতা সত্ত্বেও ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দিকে ধাবিত হওয়া আফগান কূটনীতির এক বড় চতুর চাল।
- ৯. সামাজিক পশ্চাৎপদতা: নারী শিক্ষা স্থগিত রাখা আফগান সমাজকে মানবসম্পদ উন্নয়নে কয়েক দশক পিছিয়ে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা।
- ১০. মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা: বেকারত্ব ও সাহায্য কমে যাওয়ার মধ্যে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাকা দ্রুত সচল না হলে আফগানিস্তানে স্থায়ী দারিদ্র্য সামাজিক বিশৃঙ্খলা আনবে।
- ১১. সীমান্ত ও শরণার্থী চাপ: পাকিস্তান ও ইরান থেকে ফেরত পাঠানো বিপুল শরণার্থী শোষণ করার শক্তি কাবুলের নেই; এটি ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ অপরাধের হার বাড়াতে পারে।
- ১২. রাশিয়ার স্বীকৃতি ও ব্লকের রাজনীতি: রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কাবুলকে একটি অনানুষ্ঠানিক সুরক্ষা প্রদান করেছে।
- ১৩. পাকিস্তান-তালেবান বৈরিতা: টিটিপি ও সীমান্ত ইস্যুতে ইসলামাবাদের সাথে স্থায়ী সংঘাত আফগানিস্তানের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় বাণিজ্য পথকে অচল রাখবে।
- ১৪. মেগা অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক হাব: ট্রান্স-আফগান রেলওয়ে ও TAPI প্রকল্প সফল হলে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার ট্রানজিট গেটওয়ে হবে আফগানিস্তান।
- ১৫. অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের স্পট: বাদাকশানের খনি আন্দোলন প্রমাণ করে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করতে না পারলে তালেবানের ভেতরের ফাটল আরও বড় হতে পারে।