মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি: ১০ দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ, চরম সংঘাতের মুখোমুখি ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল ত্রিমুখী অক্ষ
মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি: ১০ দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ, চরম সংঘাতের মুখোমুখি ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল ত্রিমুখী অক্ষ
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে সার্বিক আঞ্চলিক যুদ্ধের দাবানল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের নীরব উত্তেজনা রূপ নিয়েছে এক প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি অবস্থানে। সাম্প্রতিক সময়ে পেন্টাগন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি দেশ থেকে তাদের নিজস্ব নাগরিকদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার জরুরি নিরাপত্তা নির্দেশিকা জারি করেছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানগুলো ইরাক ও কুয়েতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি থেকে দ্রুত রসদপত্র গুটিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান ঘোষণা দিয়েছে তারা আগামী দুই বছরের জন্য যেকোনো আকারের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ মোকাবেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালী এবং বাবেল মানদেবে নজিরবিহীন অবরোধ গড়ে ওঠার পাশাপাশি সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানের প্রধান প্রধান জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ, মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরছে 'ক্রনিকল পয়েন্ট' (Chronicle Point)।
১. ১০টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের জরুরি প্রত্যাবাসন নির্দেশিকা
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌছালে একটি পরাশক্তি তার নাগরিকদের গোটা অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার তাগিদ দেয়, তা বর্তমানে পেন্টাগন ও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ওমান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইসরায়েল, জর্ডান, মিসর, সৌদি আরব, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে নিরাপত্তা সতর্কতা মেনে অঞ্চল ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঢালাও প্রত্যাহার বার্তা কেবল তখনই জারি করা হয় যখন একটি বড় আকারের সর্বাত্মক সামরিক যুদ্ধ শুরু হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আঞ্চলিক কূটনৈতিক মিশনগুলো তাদের অপ্রয়োজনীয় স্টাফদের ইতিমধ্যেই সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতে স্পষ্ট যে আমেরিকা সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ড্রোন আক্রমণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরেছে।
২. ইরাক ও কুয়েত ঘাঁটি থেকে মার্কিন সরঞ্জাম ও পেট্রিয়ট ব্যবস্থা অপসারণ
সামরিক গতিবিধির দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, পেন্টাগন কেবল সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক করেই থেমে থাকেনি, বরং তাদের কৌশলগত সামরিক অবস্থানগুলোতেও বড় ধরনের রদবদল ঘটাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এরবিল সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমানগুলো তড়িঘড়ি করে রসদপত্র ও সেনাদল নিয়ে অজানা গন্তব্যে উড়াল দিচ্ছে। একই সাথে, ইরাকে স্থাপিত অন্তত ৫টি শক্তিশালী পেট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কুয়েতের মতো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক ঘাঁটি থেকেও সেনা কমানোর পরিকল্পনা টেবিলে রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি হামলা চালায়, তবে এই অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলো সহজেই ইরানি ব্যালিস্টিক মিজাইলের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হবে। ফলে নিজেদের মূল্যবান এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা রক্ষার্থে আমেরিকা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
৩. ইরানের দুই বছরের কৌশলগত যুদ্ধ প্রস্তুতি ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বার্তা
মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের অপসারণ ও হুমকির মুখে ইরানও তাদের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা সতর্কবার্তা জারি করেছে। ইরানের সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের সম্পূর্ণ সশস্ত্র বাহিনী এখন যেকোনো ধরনের বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করতে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়’ রয়েছে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে ইরান কেবল সাময়িক কোনো সংঘাত নয়, বরং আগামী দুই বছরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক রসদের মজুদ সম্পন্ন করে রেখেছে। এই ঘোষণার মূল বার্তা হলো—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে একটি সীমিত বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করা যাবে, তবে সেটি হবে চরম ভুল। ইরান দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
৪. জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি নীলক নকশা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) যৌথভাবে ইরানের মূল জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের বিমান আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের তেল শোধনাগার, গ্যাস ক্ষেত্র ও পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানার জন্য মার্কিন সমর্থন চেয়ে আসছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ইসরায়েলি বিমান বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনে এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সরাসরি সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে আক্রমণের এই চক্রান্ত সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ আঘাত হানবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
৫. ইরানের পাল্টা চরম হুঁশিয়ারি: মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত মার্কিন জ্বালানি কেন্দ্রে হামলার হুমকি
সিবিএস নিউজের ফাঁশ হওয়া চক্রান্তের পর ইরানের সামরিক কমান্ড বিলম্ব না করে অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার জেনারেল আলী আব্দুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েল যদি ইরানের জ্বালানি ও তেল অবকাঠামোতে একটি আঁচড়ও ফেলে, তবে ইরান এককভাবে থেমে থাকবে না। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত তেল স্থাপনা, রিফাইনারি, জ্বালানি পাইপলাইন এবং মার্কিন মিত্রদের মালিকানাধীন জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। জেনারেল আব্দুল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন যে ইরান আক্রান্ত হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত একযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে এবং যুদ্ধের আগুন কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
৬. হরমুজ প্রণালী ও বাবেল মানদেবে ইরানের পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক অবরোধ
যুদ্ধের আগেই নৌ-যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল প্রায় সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। বহু আন্তর্জাতিক তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে ইরানি নৌ-টহল জাহাজ থেকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক নৌসীমায় থাকা জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে, আদেশ না মানলে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাবেল মানদেব প্রণালীতেও ইয়ামেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) গোষ্ঠী অবরোধ আরো শক্ত করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের অন্তত ছয়টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে না পেরে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বৈশ্বিক শিপিং খরচে বিশাল ধস নামিয়েছে।
৭. পেন্টাগনকে ইউরোপীয় শীর্ষ মার্কিন কমান্ডারের নজিরবিহীন সতর্কবার্তা
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং বাস্তবে তাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ইউরোপে নিযুক্ত শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডার জেনারেল আলেকজাস গ্রিনকিউইচ (Gen. Alexus Grynkewich) পেন্টাগনকে এক গোপন প্রতিবেদনে চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং পারস্য উপসাগরে টানা কয়েক মাস ধরে হুথি ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ডেস্ট্রয়ারগুলোর কার্যক্ষমতা এখন সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। একের পর এক মিসাইল ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর ছোঁড়ার ফলে মার্কিন রণতরীগুলোর গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছে এবং বেশ কয়েকটি প্রধান ডেস্ট্রয়ার জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সার্ভিসের বাইরে চলে গেছে।
৮. ইসরায়েলকে ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল থেকে সুরক্ষায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের ঘাটতি
জেনারেল আলেকজাস গ্রিনকিউইচ স্পষ্ট করে বলেছেন, পেন্টাগনের পক্ষে এখন কোনোভাবেই ইসরায়েলকে শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। ইরানের হাজার হাজার উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক ড্রোন যখন ইসরায়েলের ভূখণ্ডে আছড়ে পড়বে, তখন ইসরায়েলি আইরন ডোম বা এরো-৩ ডিফেন্সের পাশাপাশি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো যে অতিরিক্ত সুরক্ষাবলয় তৈরি করতো, সেই মার্কিন রণতরীর তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত তিনটি সাগরে (ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর) একযোগে মোতায়েন করার মতো পর্যাপ্ত এবং প্রস্তুত যুদ্ধজাহাজ নেই। ইসরায়েলকে বাঁচাতে গিয়ে মার্কিন নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তলানিতে ঠেকেছে।
৯. ভূমধ্যসাগরে মার্কিন জাহাজে রহস্যময় আঘাত ও মিসর উপকূলের ঘটনা
মার্কিন নৌবাহিনীর দুর্বলতার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে ভূমধ্যসাগরে। মিসরের পোর্ট ড্যামিয়েটার (Damietta) কাছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় জাহাজে সম্প্রতি অজ্ঞাত স্থান থেকে হামলা চালিয়ে ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। এই ঘটনার ফলে আমেরিকা উপলব্ধি করতে পারছে যে তাদের নৌঘাঁটি ও সরবরাহ জাহাজগুলো এখন কেবল পারস্য উপসাগরেই নয়, বরং সমগ্র ভূমধ্যসাগর ও উত্তর আফ্রিকা উপকূলেও সুরক্ষিত নয়। ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইলের বিস্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘অপরাজিত নৌ-আধিপত্যের’ অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছে।
১০. গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ ও মেডিকেল ডিপোতে হামলা: চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন
বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রস্তুতির আড়ালে অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্বরতা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যেখানে বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা হামাসের সম্ভাব্য অস্ত্র সমর্পণের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েলি বিমান বাহিনী গাজার প্রধান প্রধান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর ফের নৃশংস হামলা চালিয়েছে। সম্প্রতি গাজার কেন্দ্রীয় সরকারি মেডিকেল সাপ্লাই ডিপো (ওষুধ ও সেলাইন গোডাউন)-এর ওপর সরাসরি বোমাবর্ষণ করে তা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আহত ও মুমূর্ষু গাজাবাসীদের জন্য রক্ষিত জরুরি সেলাইন ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধপত্র পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে ইসরায়েল আবারও প্রমাণ করেছে যে তাদের মূল উদ্দেশ্য সামরিক বিজয় নয়, বরং একটি পুরো জাতিকে মানবেতর সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া।
১১. কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলা ও আরব দেশগুলোর নিরাপত্তার ভঙ্গুরতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়ার মাশুল গুনতে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট ছোট আরব রাষ্ট্রগুলো। সম্প্রতি কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরান থেকে একঝাঁক আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। যদিও কুয়েতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দাবি করেছে যে তারা বেশ কিছু ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি জটিল ড্রোন কুয়েতের কৌশলগত ও অবকাঠামোগত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিখুঁত আঘাত হেনেছে। কুয়েত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অতীতে জোরালো অবস্থান নিলেও নিজেদের ভূখণ্ড মার্কিন আগ্রাসনের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে এখন তারা নিজস্ব নিরাপত্তা সংকটে পতিত হয়েছে।
১২. আরব রাজতন্ত্রের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও মার্কিন পদাঙ্ক অনুসরণ
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ভূমিকা পালন করছে অঞ্চলটির একনায়কতান্ত্রিক ও রাজতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী। কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাধারণ জনগণ মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিকভাবে ফিলিস্তিন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করলেও, এই দেশগুলোর শাসনকর্তারা নিজেদের পারিবারিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল। কুয়েতের পার্লামেন্ট বাতিল করে সংবিধানে হস্তক্ষেপের ঘটনা থেকে শুরু করে সৌদি বিমান বাহিনীকে ইরাক ও ইয়ামেনে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বজায় রাখতে ব্যবহারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আরব রাজারা নিজেদের ক্ষমতা রক্ষায় মুসলিম বিশ্বের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
১৩. মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের অভাব ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার গণআকাঙ্ক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। মিশর, কুয়েত বা সৌদি আরবে যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো, তবে সাধারণ আরবরা কখনোই নিজেদের দেশে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করতে দিত না। মিশরে চার হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির আমলেই ফিলিস্তিনপন্থী নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। আরব বিশ্বের জনগণ মূলত ইসলামী নীতি ও শরীয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এবং স্থানীয় রাজতন্ত্রগুলো ভালো করেই জানে যে, গণতন্ত্র এলে এই অঞ্চলে তাদের পদলেহনকারী শাসকরা উৎখাত হবে এবং স্বাধীন-সার্বভৌম মার্কিনবিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
১৪. বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপর্যয়কর প্রভাব
ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধ যদি পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে, তবে তার সরাসরি ভুক্তভোগী হবে সমগ্র বিশ্ব। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) সরবরাহ এক ধাক্কায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। এর ফলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইউরোপ ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো চরম মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটে পড়বে। সামুদ্রিক পরিবহন পথ পরিবর্তিত হওয়ার দরুন আন্তর্জাতিক পণ্যের ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে পড়বে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও মারাত্মকভাবে অনুভূত হবে।
১৫. সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মার্কিন-ইরান দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এর সাথে যুক্ত রয়েছে রাশিয়া, চীন ও বৈশ্বিক ব্লকগুলোর স্বার্থ। ইরান যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের শিকার হয়, তবে মস্কো ও বেইজিং নিষ্ক্রিয় থাকবে না বলে ইঙ্গিত রয়েছে। রাশিয়া ইরানের সাথে সামরিক তথ্য আদান-প্রদান বাড়িয়েছে এবং চীন পারস্য উপসাগরে তাদের তেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল সাজাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই বেপরোয়া যুদ্ধংদেহী মনোভাব কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র হয়তো আগামী কয়েক বছরে চিরতরে বদলে যেতে চলেছে, যেখানে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন ঘটাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. মার্কিন ব্যাকফুট নীতি: ১০টি দেশ থেকে ঢালাওভাবে নাগরিক অপসারণ প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষাহীন মনে করছে।
- ২. পেন্টাগনের কৌশলগত পিছু হঠন: ইরাক থেকে পেট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স ও কুয়েত থেকে সৈন্য কমানোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন ইরানি মিসাইলের সহজ লক্ষ্যবস্তু।
- ৩. দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা: ইরানের ২ বছরের রসদ ও অস্ত্র মজুদ রাখার ঘোষণা পশ্চিমাদের দ্রুত বিজয়ের কল্পনার ওপর বড় আঘাত।
- ৪. জ্বালানি ব্ল্যাকমেইল: সিবিএস নিউজের তথ্যমতে জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা হলে সমগ্র পারস্য উপসাগরের তেল ক্ষেত্র ধ্বংস করার ইরানের কৌশল একটি সফল ‘ডিটারেন্স’ (Deterrence) নীতি।
- ৫. শিপিং লেনের নিয়ন্ত্রণ হারানো: হরমুজ ও বাবেল মানদেব প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় প্রমাণ হয় যে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য পথের চাবি এখন প্রতিরোধ অক্ষের হাতে।
- ৬. পেন্টাগন ও ইউরোপীয় কমান্ডের দ্বন্দ্ব: মার্কিন জেনারেল আলেকজাস গ্রিনকিউইচের সতর্কবার্তা পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সামরিক সরঞ্জামের চরম সংকটকে উন্মোচিত করেছে।
- ৭. ইসরায়েলি প্রতিরক্ষায় ফাঁটল: মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ঘাটতির কারণে ইসরায়েলকে ইরানি ব্যালিস্টিক আক্রমণ থেকে পুরোপুরি রক্ষা করার সুযোগ পেন্টাগনের হাতে আর নেই।
- ৮. মার্কিন সামুদ্রিক আধিপত্যে ধস: ভূমধ্যসাগরে মিসর উপকূলে মার্কিন জাহাজে আক্রমণ বিশ্বজুড়ে মার্কিন নৌবাহিনীর একচ্ছত্র ক্ষমতার পতন নির্দেশ করে।
- ৯. গাজায় ইসরায়েলি হতাশা: গাজার মেডিকেল গোডাউনে হামলা ইসরায়েলের সামরিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের নির্লজ্জ বহিপ্রকাশ।
- ১০. আরব ভূখণ্ডের ব্যবহার ও মাশুল: কুয়েতে ড্রোন আক্রমণ প্রমাণ করে মার্কিন ঘাঁটি আঁকড়ে ধরে রেখে কোনো আরব দেশই চূড়ান্ত নিরাপদ থাকতে পারবে না।
- ১১. রাজতন্ত্রের দোমুখী নীতি: জনগণের ফিলিস্তিনপন্থী মনোভাব দমন করে আরব শাসকদের মার্কিন আনুগত্য তাদের শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
- ১২. গণতন্ত্র ভীতি: পশ্চিমা বিশ্ব ও আরব শাসকরা মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে কারণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে কেবল স্বাধীন ইসলামী ভাবধারার সরকারই ক্ষমতায় আসবে।
- ১৩. বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস: তেলের দাম আকাশচুম্বী হলে পশ্চিমের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- ১৪. ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি যুদ্ধ: দীর্ঘদিনের প্রক্সি যুদ্ধ এখন সরাসরি মার্কিন-ইরান সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে যা আঞ্চলিক পরাশক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
- ১৫. বহুমুখী বিশ্বের উত্থান: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই সামরিক সংকট বিশ্বমঞ্চে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করবে এবং একমেরু বিশ্বব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটাবে।