মার্কিন সামরিক বাহিনীর চরম বিপর্যয় ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় রূপবদল: টেক্সাসে অ্যাপাচি ধ্বংস থেকে ইরাকের সেনা প্রত্যাহারের আদেশ
মার্কিন সামরিক বাহিনীর চরম বিপর্যয় ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় রূপবদল: টেক্সাসে অ্যাপাচি ধ্বংস থেকে ইরাকের সেনা প্রত্যাহারের আদেশ
বিশ্ব ভূ-রাজনীতি ও সামরিক মেরুকরণে ঘটে চলেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক কৌশলগত ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব ও সামরিক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি টেক্সাস স্টেটে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী অ্যাপাচি আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও দাবানলের সৃষ্টি করেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন দুই অভিজ্ঞ পাইলট। একই সময়ে পারস্য উপসাগরে ২৫০ দিন ধরে একটানা দায়িত্ব পালনরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন'-এর সেনাদের গভীর মানবিক, শারীরিক ও মানসিক সংকটের খবর সামনে এসেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষায় একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনাদের মনোবল এখন তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে, ইরাক সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের মাটি থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো বহিরাগত বা প্যারা-সামরিক গোষ্ঠীকে সশস্ত্র থাকতে দেওয়া হবে না। কৌশলগতভাবে ইরানও হরমুজ প্রণালী চুক্তিতে সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক এই জটিল সামরিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক রাজনীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ নিয়ে Chronicle Point-এর বিশেষ বিশদ প্রতিবেদন।
১. টেক্সাসে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত ও ভয়াবহ দাবানল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি (AH-64 Apache) আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনায় হেলিকপ্টারে থাকা দুইজন অভিজ্ঞ সামরিক পাইলট ঘটনাস্থলেই নিহত হন। হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর এর জ্বালানি ট্যাংকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেখান থেকে বিস্তৃত শুকনো মাঠে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে দেখতে এই অগ্নিকাণ্ড টেক্সাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এক নিয়ন্ত্রণহীন ও ভয়াবহ দাবানলে রূপ নেয়। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে এখন দেশের ভেতরেই তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক প্রশিক্ষণ মহড়া ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের চরম দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে।
২. রণতরী 'আব্রাহাম লিংকন'-এর ২৫০ দিনের দীর্ঘ যাত্রা ও সেনাসংকট
পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর এলাকায় কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' (USS Abraham Lincoln) প্রায় ২৫০ দিন ধরে সমুদ্রে একটানা মোতায়েন রয়েছে। দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে খোলা সমুদ্রে অবস্থান করায় যুদ্ধজাহাজটিতে চরম খাদ্যাভাব, অস্বাস্থ্যকর নিম্নমানের খাদ্য পরিবেশন এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদের এই মানসিক চাপ ও চরম অনিশ্চয়তার কারণে নাবিক ও নৌ সেনাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও চরম মানসিক স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চরম হতাশায় ভুগে কিছু সৈন্য সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ও উদ্বেগের বিষয়।
৩. মার্কিন সিনেটে রিচার্ডসনের তোপ ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা
মার্কিন সেনাদের এই করুণ পরিস্থিতি এবং সমুদ্র সীমান্তে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘ মেয়াদী সংকটের বিষয়টি নিয়ে এখন মার্কিন সিনেটে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর রিচার্ডসন পেন্টাগন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক নীতি ও পেন্টাগনের কার্যকারিতা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছেন। সিনেট অধিবেশনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কিসের স্বার্থে এবং কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এভাবে বন্দি অবস্থায় ও অনাহারে রাখা হয়েছে? সিনেটর রিচার্ডসন মার্কিন সেনাদের পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ না করা এবং তাদের মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক গাফিলতিকে দায়ী করেন এবং এই বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহিতা দাবি করেন।
৪. ইসরায়েলি যুদ্ধনীতি ও মার্কিন সেনাদের চরম দুর্ভোগ
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক স্বার্থ এবং তাদের পরিকল্পিত যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫,০০০ সৈন্য মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল আবিবের নীতি নির্ধারকরা যখন নিজেদের দেশে সুরক্ষিত আবহে পিজ্জা পার্টি ও ভোজসভার আয়োজন করছে, তখন মার্কিন সেনাদের মরুভূমির চরম প্রতিকূল পরিবেশে শুকনো রুটি ও সামান্য বিস্কুট খেয়ে জীবনধারণ করতে হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইসরায়েলি সরকারের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণে মার্কিন জাতীয় সম্পদ ও সেনাদের বলি দিচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
৫. ন্যাটো সম্মেলন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা আতঙ্ক
সম্প্রতি তুরস্কে আয়োজিত ন্যাটো (NATO) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সম্মেলন শেষে তার ভ্রমণের মুহূর্তে এক নাটকীয় ও আশঙ্কাজনক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট ও মোসাদের পক্ষ থেকে একটি চরম সতর্কবার্তা বা গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয় যে, তুর্কি আকাশসীমা বা বিমানবন্দর সংলগ্ন অঞ্চল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিমান লক্ষ্য করে কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (MANPADS) হামলা চালানো হতে পারে। এই আতঙ্কে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজের বিশেষ বিমান 'এয়ারফোর্স ওয়ান' (Air Force One)-এ আরোহণ করতে সাহস পাননি, যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবলয়ের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির।
৬. খাবারের ট্রলিতে ট্রাম্প: গোয়েন্দা তথ্যের বিভ্রান্তি ও বিতর্ক
ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরের তীব্র আতঙ্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত কঠোর ও অস্বস্তিকর উপায়ে বিমানবন্দর অতিক্রম করতে হয়। শত শত অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প হেঁটে বিমানে না গিয়ে একটি বন্ধ ক্যাটারিং ট্রলি বা খাবারের লরির ভেতরে শুয়ে ছদ্মবেশে সামরিক কার্গো বিমানে পৌঁছান। তবে পরবর্তীতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) বিশদ তদন্ত করে নিশ্চিত করেছে যে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দেওয়া সেই হামলার তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মনগড়া ছিল। বিতর্ক উঠছে যে, ইসরায়েল ইচ্ছা করেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই ধরনের বিভ্রান্তিকর গোয়েন্দা নাটক সাজিয়েছিল।
৭. পারস্য উপসাগরে কৌশলগত অবস্থান: ইরানের কঠোর চুক্তি নীতি
কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz) নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরে কোনো তাড়াহুড়ো করছে না তেহরান। ইরান খুব সুসংহতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে এবং নিজেদের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, হাইপারসনিক মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সামরিক নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা হলো—তেহরানের দেয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের পূর্বশর্ত পুরোপুরি পূরণ না করা পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সমঝোতা বা সাময়িক চুক্তি করা হবে না। মার্কিন চাপ সত্ত্বেও ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রভাবকে একদম কোণঠাসা করে ফেলেছে।
৮. ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক সময়সীমা
ইরাকের রাজনৈতিক ও সামরিক সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি (জায়েদী) এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকের ভূখণ্ডে অবস্থানরত সকল মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাতাড়ি গোটাতে হবে। ইরাক সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বছরের পর বছর ধরে বিদেশী সেনাদের উপস্থিতি ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি। ৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইরাকে কোনো বিদেশী ঘাঁটির আইনি বা সামরিক অস্তিত্ব থাকবে না বলে বাগদাদ কঠোর ঘোষণা জারি করেছে।
৯. ইরাকে একক সশস্ত্র বাহিনী নীতি ও সশস্ত্র মিলিশিয়াদের লাগাম টানার উদ্যোগ
ইরাকি সরকারের সামরিক পুনর্গঠন নীতি অনুযায়ী, বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে 'এক দেশ, এক সেনাবাহিনী' (One Nation, One Army) নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর থেকে ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর বাইরে কোনো আধা-সামরিক, প্যারা-সামরিক বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে কোনো প্রকার অবৈধ অস্ত্র থাকতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসিত সশস্ত্র তৎপরতা ইরাকের মাটিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে।
১০. পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (PMF) ও শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ
ইরাক সরকারের এই সামরিক নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগের ফলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে স্থানীয় শিয়া মিলিশিয়া জোট বা পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (PMF/আল-হাশদ আল-শাবি)। তেহরানের অনুদান ও সামরিক সহযোগিতায় পরিচালিত এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো এতদিন ধরে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু বাগদাদের নতুন নীতির ফলে এই আঞ্চলিক প্রতিরোধ যোদ্ধা গোষ্ঠীগুলোকে হয় সরকারি সেনাবাহিনীতে সম্পূর্ণ বিলীন হতে হবে, নতুবা নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। এটি তেহরানের আঞ্চলিক অক্ষের (Axis of Resistance) ওপর এক বড় ধরণের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
১১. ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার ও আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা
ইরাক সরকার নতুন নীতিতে এটিও অন্তর্ভুক্ত করেছে যে, ইরাকের আকাশসীমা ও স্থলভাগ ব্যবহার করে কোনো আঞ্চলিক প্রতিবেশীর (যেমন ইরান, সিরিয়া বা সৌদি আরব) ওপর বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। পূর্বে বিভিন্ন সময় মার্কিন বাহিনী কিংবা স্থানীয় আধা-সামরিক গোষ্ঠীগুলো ইরাকের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে অঞ্চলে উত্তাপ বাড়াত। বাগদাদ এখন স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, তারা কোনো আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধে (Proxy War) নিজেদের ব্যবহৃত হতে দেবে না এবং কোনো পক্ষকেই ইরাকি ভূখণ্ডকে সামরিক আখড়া বানাতে দেবে না।
১২. জেনোসাইড ও অন্যায় দখলের নীতিতে অটল ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ, জাতিসংঘ প্রস্তাব এবং শান্তি চুক্তির প্রস্তাবনাগুলোকে সরাসরি তুচ্ছজ্ঞান করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ চরমপন্থী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন, গাজা কিংবা সিরিয়ার কোনো দখলকৃত এলাকা থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ ভূখণ্ড থেকেও পিছু হটবে না। চুক্তির শর্ত ভেঙে গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অবৈধ স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির এই উস্কানিমূলক ঘোষণা প্রমাণ করে যে, তেল আবিব কোনো প্রকার ডিপ্লোমেটিক সমাধান বা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়।
১৩. ফরাসি ভন্ডামির বিরুদ্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির তোপ
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে ইরানকে কূটনৈতিক লেকচার দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ইউরোপীয় পরাশক্তি ফ্রান্স। ফরাসি প্রশাসনের এই ভন্ডামির বিরুদ্ধে কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। আরাকচি বলেন, যে ফ্রান্স গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা, নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন এবং ইরানে পশ্চিমা আগ্রাসনে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে, তাদের মুখে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের কথা মানায় না। ফরাসি পররাষ্ট্রনীতির এই দ্বিচারিতা ও লজ্জাজনক ভন্ডামি পুরো বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে বলে তেহরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
১৪. মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মকর্তা ছাঁটাই ও কূটনৈতিক পিছুটান
ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো থেকে তড়িঘড়ি করে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন ও জর্ডানের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে কমিয়ে আনা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি এভাবে গুঁটিয়ে নেওয়া প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের একক আধিপত্যের অবসান ঘটছে এবং অঞ্চলটি দ্রুত এক নতুন শক্তির মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
১৫. বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব: দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, ওয়াশিংটন নয়—সিদ্ধান্ত হবে ঢাকায়
বিশ্লেষণের শেষ পর্যায়ে বৈশ্বিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ভূ-রাজনীতির চর্চা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজস্ব স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের বিকল্প নেই। ভারতের মোদি সরকারের গত ১৭ বছরের আগ্রাসী ও একপেশে নীতি—যেমন তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন আটকে দিয়ে উত্তরবঙ্গকে মরুভূমি বানানো, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক প্রতিনিয়ত নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা, এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একতরফা হস্তক্ষেপের কারণে দেশের জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ জন্মেছে, তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ কোনো বিদেশী শক্তি—কখনো দিল্লি, কখনো পিন্ডি বা ওয়াশিংটনের হুকুমদারি মানবে না; বরং ১৬ কোটি মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির ভিত্তিতে ঢাকাই সিদ্ধান্ত নেবে দেশের ভাগ্য ও ভবিষ্যতের।
Chronicle Point Analysis:
- ১. প্রযুক্তিগত ও মানসিক ক্ষয়িষ্ণুতা: টেক্সাসে আধুনিক অ্যাপাচি হেলিকাপ্টারের বিপর্যয় এবং রণতরী আব্রাহাম লিংকনের সেনাদের গভীর হতাশা মার্কিন সামরিক কাঠামোর ভেতরের চরম দুর্বলতা ও ক্লান্তি প্রকাশ করে।
- ২. ইসরায়েলি ডিপ-স্টেট নির্ভরতা: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ভুয়া মিসাইল হামলার তথ্য দিয়ে খাবারের লরিতে করে বিমানে যেতে বাধ্য করার ঘটনা মার্কিন নীতিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা চক্রের গভীর ও ক্ষতিকর প্রভাব প্রমাণ করে।
- ৩. পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ চাপ: সিনেটর রিচার্ডসনের তোপ এবং মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষ প্রমাণ করে যে, সাধারণ আমেরিকানরা আর অন্য দেশের যুদ্ধের জন্য নিজেদের ট্যাক্সের টাকা ও সেনাদের জীবন উৎসর্গ করতে রাজি নয়।
- ৪. ইরানের সুদূরপ্রসারী কৌশল: হরমুজ প্রণালীতে তাৎক্ষণিক চুক্তি না করে কালক্ষেপণ করা ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির এক মাস্টারস্ট্রোক ভূ-রাজনৈতিক কৌশল।
- ৫. ইরাকের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার: ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনা সরানোর সুনির্দিষ্ট আল্টিমেটাম বাগদাদের জাতীয়তাবাদী উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের বড় পতন নির্দেশ করে।
- ৬. মিলিশিয়া সংস্কৃতির অবসান: 'এক দেশ, এক সেনা' নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইরাক তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় বহিরাগত বা প্যারা-সামরিক প্রভাব শূন্য করার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
- ৭. প্রক্সি ওয়ার বন্ধের উদ্যোগ: ইরাকের মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রতিবেশীর ওপর হামলা চালাতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে ভূমিকা রাখবে।
- ৮. আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন: ইসরায়েলের দখলকৃত এলাকা না ছাড়ার ঘোষণা বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ ব্যবস্থার প্রতি তাদের চরম অবজ্ঞার নগ্ন বহিপ্রকাশ।
- ৯. ইউরোপীয় ভন্ডামি উন্মোচন: ফরাসি মানবাধিকারের বুলি এবং গাজায় গণহত্যায় তাদের নীরবতা পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিগত দেউলিয়াত্বকে আবারও প্রমাণ করেছে।
- ১০. আমেরিকান পিছুটান: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দূতাবাস থেকে কূটনৈতিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম হয়ে পড়ছে।
- ১১. বিশ্বব্যবস্থার নতুন ভারসাম্য: একমেরু বিশ্ব থেকে বেরিয়ে বহুমেরু বিশ্বের (Multipolar World) সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিচ্ছে।
- ১২. লজিস্টিক ও খাদ্য সংকটের প্রভাব: পর্যাপ্ত খাবার ও মানসিক স্বাস্থ্যের অভাবেই যে কোনো অপরাজেয় সামরিক শক্তি ভেঙে পড়তে পারে, রণতরী আব্রাহাম লিংকন তার বাস্তব উদাহরণ।
- ১৩. গোয়েন্দা যুদ্ধের খেলা: ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার ভূ-রাজনৈতিক গোয়েন্দা কৌশল বিশ্বরাজনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে।
- ১৪. দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতি: বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে প্রতিবেশীদের আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সময়োপযোগী প্রয়োজন।
- ১৫. 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি: ভৌগোলিক গুরুত্ব রক্ষা করে ওয়াশিংটন, দিল্লি বা পিন্ডির তাঁবেদারি না করে স্বাধীন ও সার্বভৌম নীতিই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি।