ইরাক-কুয়েত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও F-35 বিপর্যয়: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা পুনর্গঠন ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষন
ইরাক-কুয়েত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও F-35 বিপর্যয়: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা পুনর্গঠন ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষন
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন বাহিনী গুটিয়ে নেয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইরানের একের পর এক সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি এবং মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেট্রিঅট সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশলকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মাটিতে অত্যাধুনিক F-35 যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এবং হামাসের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক চাল ইসরায়েল ও আমেরিকান শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে। ক্রনিকল পয়েন্টের বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন মেরুকরণ ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১. ইরাকের এরবিল থেকে পেট্রিঅট এয়ার ডিফেন্স অপসারণ ও সেনা গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি
দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতির মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল ঘাঁটি। ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আগ্রাসনের পর থেকে এরবিল ছিল পেন্টাগনের নিরাপত্তার সবচেয়ে মজবুত দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি জোটের একের পর এক সুনির্দিষ্ট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন বাহিনী চরম সংকটে পড়েছে। ওয়াশিংটন তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী পাঁচটি পেট্রিঅট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সবকটি অজানা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়ার পর হেলিকপ্টার ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম সুরক্ষা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ সম্পূর্ণ ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের গোপন ছক বাস্তবায়ন করছে আমেরিকা।
২. কুয়েত থেকে মার্কিন উপস্থিতি হ্রাস ও নতুন অনিশ্চয়তা
শুধু ইরাক নয়, পারস্য উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ মিত্র কুয়েত থেকেও নিজেদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নেয়ার গুরুতর পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। ১৯৯১ সালের গাল্ফ ওয়ার বা উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েতকে মুক্ত করার পর থেকে সেখানে শক্ত ঘাঁটি গেড়েছিল আমেরিকা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের অব্যাহত রকেট ও ড্রোন হামলার পর ওয়াশিংটন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে তারা কুয়েতকে ইরানি আক্রমণ থেকে আর সুরক্ষা দিতে পারছে না। ওয়াশিংটন এখন কুয়েতকে রক্ষা করার চেয়ে নিজেদের সেনাসদস্য ও কৌশলগত ক্ষয়ক্ষতি কমানোকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
৩. নিরাপত্তা রক্ষায় কুয়েত-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা চুক্তি
আমেরিকানদের সম্ভাব্য বিদায় এবং তাদের প্রতিরক্ষার অক্ষমতা বুঝতে পেরে বিকল্প নিরাপত্তার খোঁজে সক্রিয় হয়েছে কুয়েত সরকার। সম্প্রতি কুয়েত পার্লামেন্ট পাকিস্তানের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি অনুমোদন করেছে। ওয়াশিংটন যদি কুয়েত ছাড়ে বা সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে দেয়, তবে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে কাজে লাগাতে চায় কুয়েত। প্রতিরক্ষা খাত পুনর্গঠনে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশটির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করছে তারা, যা মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের নতুন সামরিক উপস্থিতির দ্বার উন্মোচন করছে।
৪. মার্কিন মাটিতে অত্যাধুনিক F-35 যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের চরম বিপর্যয়
মধ্যপ্রাচ্যে যখন মার্কিন বাহিনী চাপের মুখে, ঠিক তখনই ঘরের মাঠে পেন্টাগন বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে পেন্টাগনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের F-35 যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে মাটিতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস দীর্ঘসময় লড়াই করলেও বিলিয়ন ডলারের এই যুদ্ধবিমানটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নাকি মানবীয় ভুল—তা নিয়ে মার্কিন বিমানবাহিনী তদন্ত শুরু করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে।
৫. মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব ঘাটি তুলে নেওয়ার ইরানি হুশিয়ারি ও এর বাস্তব প্রতিফলন
তেহরান বহু আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু এবং অঞ্চল থেকে শেষ মার্কিন সেনাকে বিতাড়ন না করা পর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ থামবে না। বর্তমানে কাতার, ইরাক ও কুয়েতের ঘাঁটিতে ঘটা ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে তেহরানের এই হুমকি কেবল ফাঁকা বুলি ছিল না। একের পর এক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আমেরিকানদের অবস্থানকে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে যে, সামরিক খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাই এখন পাততাড়ি গুটানোর ঘোষণা দিচ্ছে।
৬. কাতারের আল উবাইদ ঘাঁটির কার্যক্রম সীমিতকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ বিমান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কাতারের আল উবাইদ এয়ার বেস। এই ঘাঁটিটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে পেন্টাগনের মূল সামরিক অপারেশন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতো। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ইরানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় চলে আসায় কাতার ঘাঁটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন বন্ধ ঘোষণা ও স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কাতার, কুয়েত এবং ইরাক—তিনটি প্রধান রাষ্ট্রেই আমেরিকান সামরিক প্রভাব নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
৭. সৌদি আরবে মার্কিন সেনার দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি ও আঞ্চলিক ক্ষোভ
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে সৌদি আরবে মার্কিন সেনার উপস্থিতি আঞ্চলিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণ। চুক্তি অনুযায়ী সৌদি ভূমিতে অবস্থানরত মার্কিন সৈন্যদের বিশাল বেতন-ভাতা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও জোগাতে হয় রিয়াদকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরণের অর্থনৈতিক ও সামরিক বলয় জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সমৃদ্ধ দেশগুলোতেও বিদ্যমান। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সৌদি নিরাপত্তা কাঠামো মার্কিন নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসবে কিনা তা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
৮. পবিত্র মক্কা-মদিনার নিরাপত্তায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক প্রস্তাব
সৌদি আরব থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে তাদের বিকল্প হিসেবে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তিগুলোকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রকাশ্যে জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকে যদি মার্কিন সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়, তবে পবিত্র মক্কা ও মদিনাসহ সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তায় নিজস্ব সেনাবাহিনী পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ। এর ফলে অমুসলিম সামরিক শক্তির ওপর মধ্যপ্রাচ্যের নির্ভরতা কমিয়ে এক নতুন আঞ্চলিক ইসলামী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
৯. বাব-এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-সংকট এবং সৌদি তেল ট্যাংকার হঠানো
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান দুটি পথ—হরমুজ প্রণালী ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে পশ্চিমা ও তাদের মিত্রদের প্রবেশাধিকার মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। আনসারুল্লাহ হুথি বাহিনী লাল সাগরে নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সৌদি আরবের একাধিক বিশ্বমানের অয়েল ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালীতে ইরানি নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, যা পশ্চিমা অর্থনীতিকে অচল করে দেয়ার সামর্থ্য রাখে।
১০. ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার নতুন ছক
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একের পর এক পরাজয় ও সেনা অপসারণের খবর ধামাচাপা দিতে এবং কৌশলগত অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের ওপর পাল্টা হামলার ষড়যন্ত্র করছে। সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, ইরানের প্রধান প্রধান তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য এক বড় আকারের বিমান হামলার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। এই হামলা বাস্তবায়নে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে নীতিগত আলোচনা চলছে।
১১. তেহরানের কঠোর হুঁশিয়ারি: হামলার সমতুল্য ভয়াবহ প্রতিআক্রমণ
আমেরিকান গণমাধ্যমের ফাঁশ করা যৌথ হামলার পরিকল্পনার কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের অবকাঠামোতে হামলা করার বোকামি করে, তবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক সমস্ত সম্পদ ও স্বার্থ ছাইয়ে পরিণত করা হবে। ইরান সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে তারা এবার কেবল প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, বরং সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ঘাঁটিতে আঘাত হানতে তাদের মিসাইল ডিফেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
১২. নেতানিয়াহুর নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও যুদ্ধের ভয়াবহতা
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চরম ব্যাকফুটে রয়েছেন। আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনে কট্টরপন্থীদের ভোট ব্যাংক রক্ষা ও নিজের পিঠ বাঁচাতে তিনি ইরান ও গাজায় ক্রমাগত রক্তক্ষয়ী সংঘাত জিইয়ে রাখতে চান। আঞ্চলিক যুদ্ধের উত্তেজনা সৃষ্টি করে জনগণের ভয়কে কাজে লাগিয়ে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার দেউলিয়া কৌশল গ্রহণ করেছেন তিনি। কিন্তু ইরানি ভূখণ্ডে হামলার পরিণতি ইসরায়েলকে এক অবর্ণনীয় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
১৩. হামাসের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাল ও নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা নস্যাৎ
অক্টোবর নির্বাচনের আগে গাজায় নতুন করে বিশাল সামরিক অভিযান চালিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার শেষ দান চালছিলেন নেতানিয়াহু। তবে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস একটি ঐতিহাসিক ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেতানিয়াহুর সেই চাল নস্যাৎ করে দিয়েছে। হামাস প্রস্তাব দিয়েছে, গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলে এবং ইসরায়েল পুরোপুরি সেনা সরিয়ে নিলে তারা ফিলিস্তিনের একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন নতুন টেকনোক্র্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি। এই কূটনৈতিক চালে পুরো বিশ্বজুড়ে নেতানিয়াহুর আগ্রাসী নীতি নগ্ন হয়ে পড়েছে।
১৪. আন্তর্জাতিক চাপ ও ট্রাম্পের ওপর গাজা সংঘাত কমানোর বাধ্যবাধকতা
হামাসের অস্ত্র ত্যাগের কূটনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে তুরস্ক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরব ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ট্রাম্পকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, শর্ত অনুযায়ী হামাস যখন একটি ফিলিস্তিনি শাসনকাঠামোর অধীনে অস্ত্র হস্তান্তরে রাজি, তখন নেতানিয়াহুকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করা উচিত। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের পক্ষে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে গাজায় গণহত্যা চালানোর অব্যাহত সবুজ সংকেত দেয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
১৫. বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিরতা ও মার্কিন রাজনীতির চরম সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের তেল শোধনাগারে হামলা হলে তেলের ব্যারেল প্রতি দাম আকাশচুম্বী হবে, যা সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে তরান্বিত করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের ক্ষমতার মেয়াদের জন্যই তেল সংকট এক ভয়াবহ রাজনৈতিক দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। এর ফলে মার্কিন প্রশাসন এখন সামরিক অভিযান বাড়ানো নাকি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার মধ্যে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. এরবিল ঘাঁটি খালি: মার্কিন পেট্রিঅট সিস্টেম অপসারণের মাধ্যমে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ২৩ বছরের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পতন সূচিত হলো।
- ২. কুয়েতের নিরাপত্তা সংকট: ওয়াশিংটন কুয়েতকে ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে না পারায় উপসাগরীয় মিত্রদের মার্কিন প্রতিরক্ষার ওপর দীর্ঘদিনের আস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
- ৩. এশীয় বিকল্প সুরক্ষা: কুয়েত-পাকিস্তান সামরিক চুক্তি প্রমাণ করে যে আরব বিশ্ব এখন ওয়াশিংটনের বদলে এশীয় পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
- ৪. F-35 বিপর্যয়: ক্যালিফোর্নিয়ার F-35 দুর্ঘটনা মার্কিন বিমানবাহিনীর আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতিকে নগ্ন করে তুলেছে।
- ৫. ইরানি কৌশলের জয়: সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধে ইরান সাফল্য পেয়ে আমেরিকানদের সেনা সরিয়ে নিতে বাধ্য করছে।
- ৬. আল উবাইদের পতন: কাতারের ঘাঁটির অপারেশন গুটিয়ে নেওয়া প্রমাণ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও বিমান শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোও এখন নিরাপদ নয়।
- ৭. রাজকীয় অর্থনীতির ক্ষতি: সৌদিতে মার্কিন বাহিনীর বেতন বহন করার মডেলটি আঞ্চলিক মুসলিম জনমনে অসন্তোষ বাড়াচ্ছিল যা এখন পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
- ৮. আঞ্চলিক মুসলিম অক্ষ: তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা-মদিনা সুরক্ষার প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য সমন্বিত ইসলামী ন্যাটো গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর হতে পারে।
- ৯. নৌ পথ অবরোধ: হুথি ও ইরানের নৌ ব্লকেড সৌদি তেল বাণিজ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে, যা পশ্চিমা অর্থনীতিতে ধাক্কা দিচ্ছে।
- ১০. অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি: ইরানের তেলের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েল হামলা চালালে পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ চেইন স্থবির হয়ে পড়বে।
- ১১. তেহরানের আত্মবিশ্বাস: যেকোনো মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ড বা ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার ইরানি সক্ষমতা এখন বাস্তব হুমকি।
- ১২. নেতানিয়াহুর টিকে থাকার রাজনীতি: আঞ্চলিক যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কেবল নিজের ক্ষমতা রক্ষার শেষ চেষ্টা করছেন।
- ১৩. হামাসের মাস্টারস্ট্রোক: অস্ত্র সমর্পণের নমনীয় কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে হামাস ইসরায়েলের গাজা আগ্রাসনের অজুহাত পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।
- ১৪. ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ: আরব ও এশীয় মিত্রদের হস্তক্ষেপে ট্রাম্প প্রশাসন এখন নেতানিয়াহুকে থামানো কিংবা নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।
- ১৫. বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা: তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মার্কিন মূল্যস্ফীতি ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দেবে, যা মধ্যপ্রাচ্য নীতি বদলাতে বাধ্য করবে।