গাজা গণহত্যায় ইসরাইলকে অস্ত্র জোগান দিয়েছে ৫১ দেশ: আন্তর্জাতিক আদালতের রায় তোয়াক্কা না করে মার্কিন-ভারতীয় অস্ত্র চালানের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস।

📅 May 2026

গাজা গণহত্যায় ইসরাইলকে অস্ত্র জোগান দিয়েছে ৫১ দেশ: আইসিজের রায় তোয়াক্কা না করে মার্কিন-ভারতীয় সামরিক চালানের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

📅 ২৫ মে, ২০২৬ | ✍️ বিশেষ প্রতিনিধি, Chronicle Point

ঢাকা, ২৫ মে ২০২৬: গাজা উপত্যকায় চলমান বর্বরোচিত ইসরাইলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের নেপথ্যে থাকা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর এক ভয়ানক সমীকরণ উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICJ) গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট রায় ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরাইলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে বিশ্বরাজনীতির শীর্ষস্থানীয় ৫১টি দেশ। সম্প্রতি কাস্টমস রেকর্ড এবং ইসরাইলি ট্যাক্স অথোরিটির কয়েক বছরের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়াসহ বিশ্বের একাধিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে তেল আবিবের হাতে তুলে দিয়েছে মারণাস্ত্র। এমনকি গত বছরের শেষভাগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও কয়েক কোটি ডলারের অস্ত্রের চালান পৌঁছেছে ইসরাইলে, যা এই গণহত্যায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের এক কুৎসিত রূপ বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

১. গাজা গণহত্যা এবং বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহের নগ্ন বাস্তবতা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা আজ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী। ইসরাইলি আগ্রাসন ও লাগাতার দখলদারিত্বের কারণে পৃথিবীর বুকে গাজা আজ একখণ্ড নরকে পরিণত হয়েছে। তবে এই ধ্বংসলীলা ও কিলিং মিশন ইসরাইলের একার পক্ষে চালানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আন্তর্জাতিক স্তরের ৫১টি দেশ সম্মিলিতভাবে তেল আবিবকে আধুনিক মারণাস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ করে এই গণহত্যাকে ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের চালান প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তিনিদের রক্তে রঞ্জিত এই যুদ্ধের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নীরব সম্মতি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা।

২. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) ঐতিহাসিক রায় ও অবমাননা

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে যখন গাজাজুড়ে ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এক ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন রায় প্রদান করে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করে যে, গাজায় গণহত্যার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে এবং গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী ১৫৩টি দেশকে এটি প্রতিরোধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আইসিজের সেই আইনি আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ৫১টি দেশ ইসরাইলের সামরিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

৩. আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ

বিশ্বজুড়ে চলা এই সামরিক গোপনীয়তার পর্দা ফাঁস করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা। তারা ইসরাইলি ট্যাক্স অথোরিটির ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমদানি সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় কাস্টমস রেকর্ড এবং নথিপত্র সংগ্রহ করে। প্রায় ৬৫ লাখেরও বেশি কাস্টমস এন্ট্রি ধরে ধরে করা এই চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কোন দেশ, কোন সময়ে, কী ধরনের অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য পাঠিয়েছে। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্ব রাজনীতিতে মানবাধিকারের দ্বিচারিতাকে আবারও উলঙ্গ করে দিয়েছে।

৪. ২৬০৩টি অস্ত্রের চালান: যুদ্ধকালীন সামরিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা সংঘাতের ভয়াবহ সূচনা হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র দুই বছরে ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি অস্ত্রের বিশাল চালান প্রবেশ করেছে। এই সময়কালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে ইসরাইলে প্রবেশ করা আমদানিকৃত সামরিক চালানের মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার। এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মারণাস্ত্র গাজার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সরবরাহ চেইন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

৫. আইসিজের রায়ের পর অস্ত্রের ৯১ শতাংশ রপ্তানি

সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ভয়ানক তথ্য হলো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) কর্তৃক গাজা গণহত্যা প্রতিরোধের নির্দেশনা জারির পরই ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানিকৃত মোট অস্ত্রের ৯১ শতাংশই রপ্তানি হয়েছে আইসিজের ওই ঐতিহাসিক রায়ের পর। অর্থাৎ, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে দেশগুলোর উচিত ছিল ইসরাইলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, সেখানে তারা আদালতের রায় আসার পর আরও বেশি তৎপর হয়ে ইসরাইলি অস্ত্রাগার সমৃদ্ধ করেছে।

৬. মারণাস্ত্র থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ: সরবরাহের বৈচিত্র্য

ইসরাইলে আমদানিকৃত সামরিক সামগ্রীর তালিকায় শুধু বড় বড় বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র বা দূরপাল্লার গ্রেনেডই ছিল না; বরং সামরিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, যুদ্ধবিমানের পার্টস এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আনুষঙ্গিক সামগ্রীও সরবরাহ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মারণাস্ত্রের পাশাপাশি এই খুচরা যন্ত্রাংশগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ইসরাইলের বিমান বাহিনী এবং স্থল বাহিনীকে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ সচল রাখতে এবং আক্রমণ জোরালো করতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

৭. শীর্ষ সরবরাহকারী পরাশক্তি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় সামরিক এবং রাজনৈতিক খুঁটি হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলি ট্যাক্স অথোরিটির তথ্য পরিষ্কারভাবে দেখাচ্ছে যে, মোট অস্ত্র আমদানির ৪২ শতাংশ একাই সরবরাহ করেছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ সত্ত্বেও হোয়াইট হাউস ইসরাইলের জন্য বিলিয়ন ডলারের সামরিক প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যার ফলে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা বজায় রাখা ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়েছে।

৮. দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে ভারত: নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

আমেরিকার পরেই ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি ভারত। মোট সামরিক আমদানির ২৬ শতাংশের জোগান এসেছে ভারতের পক্ষ থেকে। বিগত কয়েক বছরে নয়া দিল্লি এবং তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। গাজা সংকটের সময়ও ভারতের এই বিশাল পরিমাণ সামরিক সরবরাহ প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারত এখন ইসরাইলের অন্যতম প্রধান সহযোগী।

৯. ভারতের গোপন সামরিক নথির গোপনীয়তা উন্মোচন

ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের এই গভীর অস্ত্র বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেতে ২০২৪ সালে ভারতের অস্ত্র রপ্তানি সংক্রান্ত একটি অতি গোপনীয় নথির সন্ধান পায় আল-জাজিরা। সেই নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভারতের একাধিক শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী কোম্পানি সরাসরি ইসরাইলের রাষ্ট্রায়ত্ত সামরিক প্রতিষ্ঠান 'রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস' এবং 'মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজে'র কাছে সরাসরি মারণাস্ত্র তৈরির কাঁচামাল, বিস্ফোরক ও যুদ্ধাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রপ্তানি করেছে।

১০. শীর্ষ পাঁচের অন্য তিন দেশ: রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পাশাপাশি ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালার আড়ালে থেকে ইসরাইলকে যুদ্ধাস্ত্র জুগিয়েছে। অন্যদিকে, পূর্ব এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত তাইওয়ানও নিজের আন্তর্জাতিক অবস্থান সুসংহত করতে তেল আবিবের সামরিক চাহিদাকে সফলভাবে পূরণ করেছে।

১১. জনরোষ উপেক্ষা করে ইউরোপ ও আমেরিকার অন্যান্য দেশের ভূমিকা

বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে গাজা যুদ্ধের নির্মমতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক জনরোষ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, একাধিক পশ্চিমা ও ল্যাটিন আমেরিকান দেশ তাদের অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধ করেনি। এই তালিকায় রয়েছে স্পেন, ফ্রান্স, কানাডা এবং ব্রাজিলের মতো রাষ্ট্রের নাম। যদিও এসব দেশের সরকার প্রকাশ্যে অনেক সময় গাজায় মানবিক সহায়তার কথা বলেছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে তাদের বাণিজ্যিক ও সামরিক চুক্তিগুলো ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে।

১২. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি: সিঙ্গাপুরের সম্পৃক্ততা

এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র সিঙ্গাপুরের নামও ইসরাইলের অস্ত্র সরবরাহকারী দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। সিঙ্গাপুর দীর্ঘকাল ধরেই ইসরাইলি সামরিক প্রযুক্তির একটি বড় ক্রেতা এবং অংশীদার। গাজা যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে উন্নত সামরিক চিপস, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সাপোর্ট ইসরাইলে পাঠানো হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দ্বিচারিতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

১৩. যুদ্ধবিরতির পরেও থামেনি অস্ত্র সরবরাহ: ২০২৫ সালের শেষ দুই মাসের চিত্র

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, গত বছরের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় গাজায় একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও ইসরাইলে অস্ত্রের চালান আসা বন্ধ হয়নি। আল-জাজিরার সংগৃহীত কাস্টমস ডেটা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী মাসগুলোতে অর্থাৎ ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই শেষ দুই মাসেই ইসরাইল বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিপুল অস্ত্র আমদানি করেছে, যা প্রমাণ করে ইসরাইল ভবিষ্যতের আরও বড় কোনো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

১৪. বিশ্লেষকদের অভিমত: মার্কিন নতজানু রাষ্ট্রগুলোর কিলিং মিশন

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইলের একক জনসংখ্যা বা ভৌগোলিক আয়তন বিবেচনায় নিলে, তাদের পক্ষে একাই গাজাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার বা বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা ছিল না। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রতি অনুগত, নতজানু দেশগুলোর অব্যাহত ও নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক ও অস্ত্র সরবরাহের কারণেই গাজাজুড়ে ইসরাইল এই দীর্ঘস্থায়ী কিলিং মিশন সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছে।

১৫. বৈশ্বিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম দেউলিয়াত্ব

৫১টি দেশের এই সম্মিলিত অস্ত্র সরবরাহ বিশ্ববাসীর সামনে একটি নির্মম সত্য উন্মোচন করেছে—তা হলো আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার কনভেনশন এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা আজ পরাশক্তিদের স্বার্থের কাছে সম্পূর্ণ দেউলিয়া। গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেও যেসব দেশ ইসরাইলের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ইতিহাসের পাতায় গাজা গণহত্যার পরোক্ষ অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। এই নগ্ন সত্য বিশ্বব্যাপী শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

Chronicle Point Analysis:

  • ১. বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব: গাজা গণহত্যা কেবল ইসরাইলের একক অপরাধ নয়, বরং বিশ্বের ৫১টি দেশের প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতার ফল।
  • ২. আইসিজের অকার্যকারিতা: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের পর ৯১% অস্ত্র সরবরাহ প্রমাণ করে পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা করে না।
  • ৩. আমেরিকার মূল চালিকাশক্তি: ৪২% অস্ত্র সরবরাহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে যে তারাই এই যুদ্ধের মূল মদদদাতা।
  • ৪. ভারতের কৌশলগত অবস্থান: ২৬% অস্ত্র সরবরাহ করে ভারত মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় এশীয় সামরিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
  • ৫. গোপন নথির সত্যতা: ভারতের সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির মারণাস্ত্রের কাঁচামাল সরবরাহ বিশ্বমঞ্চে তাদের নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে দিয়েছে।
  • ৬. ইউরোপীয় দ্বিচারিতা: রোমানিয়া, স্পেন, ফ্রান্স মুখে শান্তির কথা বললেও গোপনে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রেখে দ্বিমুখী নীতি প্রদর্শন করেছে।
  • ৭. তাইওয়ানের ভূ-রাজনীতি: বৈশ্বিক সমর্থন পাওয়ার আশায় তাইওয়ানও ইসরাইলের এই মানবিক সংকটে অস্ত্রের জোগানদার হয়েছে।
  • ৮. কাস্টমস রেকর্ডের অকাট্য প্রমাণ: ৬৫ লাখ কাস্টমস এন্ট্রি বিশ্লেষণ করে আল-জাজিরা এই শতাব্দীর অন্যতম বড় সামরিক গোপনীয়তা ফাঁস করেছে।
  • ৯. যুদ্ধবিরতির অন্তরালে বাণিজ্য: ২০২৫-এর যুদ্ধবিরতির পরেও ৮৯.৪ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আমদানি ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধপ্রস্তুতির অংশ।
  • ১০. লজিস্টিক চেইনের বৈচিত্র্য: মারণাস্ত্রের পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশের জোগান ইসরাইলি বিমান বাহিনীকে গাজায় সার্বক্ষণিক সচল রেখেছে।
  • ১১. জনমতের অবমাননা: বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ইসরাইল-বিরোধী বিক্ষোভকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে এই ৫১টি দেশের সরকার।
  • ১২. সিঙ্গাপুরের প্রযুক্তিগত ভূমিকা: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে সিঙ্গাপুর উন্নত সামরিক প্রযুক্তির জোগান নিশ্চিত করেছে।
  • ১৩. গণহত্যা কনভেনশনের অবমাননা: স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর এই আচরণ ভবিষ্যতে যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিকে অর্থহীন করে তুলবে।
  • ৪. অর্থনৈতিক স্বার্থের জয়: মানবতা ও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবনের চেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সামরিক বাণিজ্যই প্রধান হয়ে উঠেছে।
  • ১৫. ভবিষ্যতের অন্ধকার সংকেত: এই নজিরবিহীন সামরিক মদদ ভবিষ্যতে অন্যান্য অঞ্চলেও এমন বিচারহীন গণহত্যা চালাতে আগ্রাসী শক্তিগুলোকে উৎসাহিত করবে।

পাঠকদের জিজ্ঞাসিত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. গাজা সংঘাতের সময় ইসরাইলকে কতটি দেশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে? আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বরাজনীতির শীর্ষস্থানীয় ৫১টি দেশ ইসরাইলকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ২. এই তথ্যগুলো কীভাবে এবং কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে? ইসরাইলি ট্যাক্স অথোরিটির ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমদানি সংক্রান্ত প্রায় ৬৫ লাখেরও বেশি কাস্টমস এন্ট্রি এবং অফিশিয়াল রেকর্ড চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য বের করা হয়েছে। ৩. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) রায়ের পর অস্ত্র সরবরাহের হার কেমন ছিল? আইসিজের রায়ের পর অস্ত্র সরবরাহের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে; আমদানিকৃত মোট অস্ত্রের প্রায় ৯১ শতাংশই সরবরাহ করা হয়েছে আদালতের আদেশের পর। ৪. ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ কোনটি? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ, যা মোট আমদানির ৪২ শতাংশ একাই জোগান দিয়েছে। ৫. এই তালিকায় দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে কোন দেশ রয়েছে? দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত ২৬ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করে ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক অংশীদার হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছে। ৬. ভারত কোন ধরনের সামরিক সহযোগিতা ইসরাইলকে দিয়েছে? ভারতের একাধিক প্রতিরক্ষা কোম্পানি সরাসরি ইসরাইলের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস এবং মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে মারণাস্ত্রের কাঁচামাল ও বিস্ফোরক পাঠিয়েছে। ৭. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ছাড়া শীর্ষ পাঁচের অন্য দেশগুলো কী কী? শীর্ষ পাঁচের অন্য তিনটি দেশ হলো রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। ৮. ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট কত মূল্যের অস্ত্র ইসরাইলে আমদানি করা হয়েছে? এই দুই বছরে ইসরাইলে আমদানিকৃত অস্ত্রের মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার। ৯. গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট কতটি অস্ত্রের চালান ইসরাইলে প্রবেশ করেছে? ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি অস্ত্রের সামরিক চালান প্রবেশ করেছে। ১০. এই তালিকায় ইউরোপের কোন কোন উল্লেখযোগ্য দেশের নাম রয়েছে? ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে রোমানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, স্পেন এবং ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। ১১. ল্যাটিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন দেশগুলো এই তালিকায় আছে? ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ব্রাজিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো ইসরাইলে সামরিক জোগান দিয়েছে। ১২. গত বছরের (২০২৫) যুদ্ধবিরতির পরেও কি ইসরাইলে অস্ত্র এসেছে? হ্যাঁ, গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ইসরাইলে অস্ত্র আমদানি অব্যাহত ছিল। ১৩. যুদ্ধবিরতির পরের শেষ দুই মাসে কত টাকার অস্ত্র আমদানি করা হয়েছে? যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ২০২৫ সালের শেষ দুই মাসেই ইসরাইলে ৮৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করা হয়েছে। ১৪. শুধু তৈরি অস্ত্র নাকি অন্য কোনো সামরিক সামগ্রীও পাঠানো হয়েছে? বোমা, গ্রেনেড ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সামরিক যুদ্ধবিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ, চিপস এবং বিভিন্ন লজিস্টিক সামগ্রীও পাঠানো হয়েছে। ১৫. বিশ্লেষকদের মতে এই অস্ত্র সরবরাহের চূড়ান্ত প্রভাব কী হয়েছে? বিশ্লেষকদের মতে, এককভাবে ইসরাইলের পক্ষে গাজাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা না থাকলেও, এই ৫১টি দেশের নিরবচ্ছিন্ন অস্ত্র সরবরাহের কারণেই গাজাজুড়ে কিলিং মিশন চালানো সম্ভব হয়েছে।

SHARE THIS ARTICLE

Website Total View