মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের দামামা: ট্রাম্পের নতুন ফাঁদ, সৌদি-ইয়েমেন রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ লড়াইয়ে ইরান-আমেরিকা মুখোমুখি।
মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের দামামা: ট্রাম্পের নতুন ফাঁদ, সৌদি-ইয়েমেন রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ লড়াইয়ে ইরান-আমেরিকা মুখোমুখি
ক্রনিকল পয়েন্ট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক চরম ও অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন, সৌদি আরব, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে কেন্দ্র করে এক নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার আড়ালে বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর সরাসরি সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যের গল্প, ট্রাম্পের পাতা কূটনৈতিক ফাঁদ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা বলয়ের অন্ধকার দিকগুলো।
১. ট্রাম্পের নতুন যুদ্ধের ব্লু-প্রিন্ট ও মার্কিন কংগ্রেসের কাছে অনুমতি প্রার্থনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুমতি চেয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে একটি ভোটাভুটি হয়েছিল, যেখানে ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতার ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করা হয়। যদিও সেই বিলটি চূড়ান্ত আকারে পাস হতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন, তার আগেই ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে তারা ইরানে একটি "বড় ফ্রেমের যুদ্ধ" করতে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই যুদ্ধে তিনি ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করতে চান। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো মাঝপথে থমকে যাওয়া বা পরাজিত হয়ে ফিরে আসার কোনো ইচ্ছা তার নেই। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইতিপূর্বে হওয়া সমস্ত শান্তিচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MoU) ছিল কেবলই একটি সাময়িক কৌশল ও ধোঁকা।
২. নেতানিয়াহুর ট্র্যাপ: ট্রাম্পের অনমনীয় আচরণের নেপথ্য কারণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অনমনীয় এবং যুদ্ধংদেহী আচরণের নেপথ্যে রয়েছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাদের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অদৃশ্য সুতা। বিশ্লেষকদের মতে, মোসাদ দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য 'হানি ট্র্যাপ' এবং ব্লাকমেইলের মতো নানা অপকৌশল ব্যবহার করে আসছে। ট্রাম্পের অতীতে করা বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত অপরাধের চরম স্পর্শকাতর নথিপত্র এখন ইসরাইলি গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন আইনি মামলা ও কেলেঙ্কারির নেপথ্যের গোপন তথ্যগুলো ইসরাইল তাদের নিজস্ব মিডিয়া ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছে। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার্থে ট্রাম্প কার্যত নেতানিয়াহুর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন এবং ইসরাইলের স্বার্থ হাসিল করতেই ইরানের বিরুদ্ধে এই ভয়াবহ যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছেন।
৩. আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা শেষে ফেরা হুতি নেতাদের বিমানে সৌদি হামলা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা এবং রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরানের তেহরানে গিয়েছিলেন ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। শোক প্রকাশ শেষে তারা যখন ইরানের একটি বিশেষ বিমানে করে ইয়েমেনের রাজধানী সানার উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন, তখনই ঘটে এক চরম উত্তেজনাকর ঘটনা। বিমানটি যখন সানা বিমানবন্দরের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানগুলো বিমানটিকে টার্গেট করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। ইরানের পতাকাবাহী এবং বেসামরিক হুতি নেতাদের বহনকারী এই বিমানে সৌদি আরবের এই সরাসরি বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি নতুন করে যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪. সানা বিমানবন্দর অবরোধ ও হুতি বিমানবাহিনীর কৌশলগত ল্যান্ডিং
সৌদি আরবের অতর্কিত ও তীব্র বিমান হামলার কারণে ইরানের সেই বিমানটি সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে ব্যর্থ হয়। পুরো বিমানবন্দর এলাকা বোমাবর্ষণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং রানওয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তবে বিমানের দক্ষ পাইলট ও হুতিদের সামরিক কমান্ডের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বিমানটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। বিমানটি সানায় অবতরণ করতে না পেরে দিক পরিবর্তন করে ইয়েমেনের একটি সুরক্ষিত ও গোপন সামরিক বিমানঘাঁটিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ল্যান্ড করে। হুতি নেতাদের সেখানে নিরাপদে নামিয়ে দেওয়ার পর ইরানের বিমানটি দ্রুত তার নিজের দেশের উদ্দেশ্যে আকাশে উড়াল দেয়। এই ঘটনার পর ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ ও হুতি সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রাজপথে নেমে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
৫. কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি আরবে হুতিদের সিরিজ ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা
সৌদি আরবের এই নগ্ন হামলার জবাব দিতে ইয়েমেনের হুতি বাহিনী এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। বিমান হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তারা সৌদি আরবের একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অবস্থান লক্ষ্য করে সিরিজ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায়। হুতিদের ছোড়া ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো সৌদি আরবের সীমান্ত পার হয়ে অভ্যন্তরের একাধিক বিমানঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে। এই পাল্টা হামলায় সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। হুতিদের এই দ্রুত এবং বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, তারা সৌদি আরবের সাথে যেকোনো স্তরের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং বিমান হামলার জবাব তারা মাঠেই দেবে।
৬. বাব-আল-মান্দাব প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধের নতুন হুঁশিয়ারি
সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উস্কানির জবাবে ইয়েমেনের সামরিক কমান্ড এক চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। হুতিদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের অবৈধ দাদাগিরি বা সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারখ্যাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'বাব-আল-মান্দাব' প্রণালী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবে। এই প্রণালীটি বন্ধ হয়ে গেলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাতায়াতকারী বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের ট্যাংকারগুলোর যাতায়াত পুরোপুরি থমকে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ ধস নামবে, তার সম্পূর্ণ দায় মার্কিন জোটকে নিতে হবে বলে হুতি মুখপাত্র সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
৭. ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আরও তীব্র করে মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে একযোগে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন দাবি করেছে যে, তারা ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলা পরিচালনা করেছে। ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সূত্র অনুযায়ী, ইরানের বিখ্যাত কেশম দ্বীপ (Qeshm Island), বুশেহর বন্দর (Bushehr Port) এবং আব্বাস বন্দরে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের বিকট শব্দ পাওয়া গেছে। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।
৮. উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও আরব আমিরাতের যৌথ ট্যাংকারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ইরান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) দাবি করে যে, আক্রান্ত জাহাজটি কোনো যুদ্ধজাহাজ ছিল না, বরং এটি ছিল আমেরিকা ও আরব আমিরাতের যৌথ মালিকানাধীন একটি বিশাল সুপার ট্যাংকার। ইরানের অত্যাধুনিক ক্রুজ মিসাইলের সরাসরি আঘাতে জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়ে। এই হামলায় জাহাজে থাকা একজন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে আমিরাত কর্তৃপক্ষ।
৯. কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ড্রোন হামলা
ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একযোগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। বিশেষ করে কুয়েত, বাহরাইন এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটিগুলোতে ইরানের তৈরি বিপুল সংখ্যক কামিকাজে ড্রোন আঘাত হেনেছে। মার্কিন প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও বেশিরভাগ ড্রোন সরাসরি ঘাঁটির ভেতরে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এর ফলে মার্কিন সেনাদের থাকার জায়গা ও যুদ্ধাস্ত্রের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
১০. হরমুজ প্রণালী থেকে ২০% টোল আদায়ের ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ঘোষণা
এই সামগ্রিক যুদ্ধাবস্থার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অদ্ভুত ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার নতুন ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাংকার থেকে ২০% টোল বা মাশুল আদায় করবে। ট্রাম্পের যুক্তি হলো, আমেরিকা এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা, জলপথের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, তাই এই বিশাল মাশুল বা 'সার্ভিস চার্জ' দেওয়ার দায়িত্ব জাহাজগুলোর মালিক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর। এই ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্পের আসল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী চেহারা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
১১. রক্ষণাবেক্ষণ ফি বনাম মার্কিন বিকল্প রুট কূটনীতি
হরমুজ প্রণালীটি সম্পূর্ণভাবে ইরানের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক জলসীমার অন্তর্গত হওয়ায় ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এই জলপথের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। ইরান দাবি করেছিল, যেহেতু আইআরজিসি নৌবাহিনী এখানে পরিবেশ দূষণ রোধ, মাইন অপসারণ এবং জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজগুলোকে পাহারা দেয়, সেহেতু চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নামমাত্র একটি 'মেইনটেন্যান্স ফি' দিতে হবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলো ইরানের এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিবর্তে মার্কিন উস্কানিতে জাহাজগুলো ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ রুট এড়িয়ে বিকল্প ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে শুরু করে। এই অবাধ্যতার কারণেই ইরান প্রতিদিন ওইসব বিকল্প রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আটকে দিচ্ছে বা আক্রমণ করছে।
১২. আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি: মাইন পাতা ও জলপথের লাইফলাইন বন্ধের হুমকি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসি (IRGC) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পশ্চিমা বিশ্বকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাতা ধোঁকার ফাঁদে পা দিয়ে দুটি বেপরোয়া সুপার ট্যাংকার তাদের জিপিএস ও নেভিগেশন সিস্টেম ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল। আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা পাঠানো সত্ত্বেও জাহাজ দুটি তা উপেক্ষা করে মাইন ও বিস্ফোরক সমৃদ্ধ একটি সংরক্ষিত নিষিদ্ধ জলপথে প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা ভঙ্গ করে। এর ফলেই জাহাজ দুটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েছে। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিনীদের সাথে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা অবাধ্যতা এই অঞ্চলের বিশ্বজুড়ে মারাত্মক জ্বালানি সংকট ও তেলের দামের আকাশচুম্বী বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো ফল বয়ে আনবে না।
১৩. ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলন ও ট্রাম্পের আগ্রাসী রণকৌশল পরিবর্তন
সম্প্রতি তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ন্যাটোর (NATO) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন সম্মেলন। এই সম্মেলন থেকে ফিরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে এক রাতারাতি ও নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি অনমনীয় ও ধ্বংসাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, আঙ্কারা বৈঠকে ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন চালানোর ব্যাপারে সবুজ সংকেত পেয়েছেন। ন্যাটোর পরোক্ষ সমর্থন পকেটে পুরে ট্রাম্প এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একক মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, যার প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করার খেলায় মেতে উঠেছেন।
১৪. পেট্রো-ডলারের অপচয় এবং আরব শাসকদের দাসত্বমূলক নীতি
এই যুদ্ধের আরেকটি দুঃখজনক দিক হলো আরব অঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর চরম অনৈক্য ও মেরুদণ্ডহীন নীতি। আরবরা তাদের অবৈধ ক্ষমতা ও রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য বছরের পর বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পা চাটছে। তাদের এই দাসত্বের কারণে পশ্চিমাদের সামরিক অর্থনীতি সচল থাকছে আর মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পেট্রো-ডলার লুট হয়ে চলে যাচ্ছে আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে পৃথিবীতে কোনো মুসলিম দেশ দরিদ্র থাকার কথা ছিল না। অথচ আজ ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের অধিকাংশই চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত। আরব শাসকরা নিজেদের সম্পদ দিয়ে নিজেদের ভাইদের ওপর হামলা করার জন্য পশ্চিমাদের অস্ত্র কিনছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য চরম লজ্জাজনক ও আত্মঘাতী একটি বিষয়।
১৫. বৈশ্বিক জ্বালানি বিপর্যয় ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা
হরমুজ প্রণালী এবং বাব-আল-মান্দাব প্রণালীর এই ত্রিমুখী সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক কোনো যুদ্ধ নয়, এটি খুব দ্রুত একটি বৈশ্বিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ (২০%) যাতায়াত করে। এই জলপথটি যদি যুদ্ধের কারণে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। ফলে উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হাহাকার শুরু হবে, যা বিশ্বকে এক নতুন মহামন্দা ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে। পরাশক্তি চীন ও রাশিয়াও ইরানের পতনের এই খেলায় নীরব থাকবে না, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও ভয়ঙ্কর করে তুলছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. ট্রাম্পের কূটনৈতিক ধোঁকা: ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার নাটক ছিল মূলত মার্কিন বাহিনীকে পুনঃসংগঠিত করার একটি সূক্ষ্ম সামরিক কৌশল।
- ২. ইসরাইলি ব্ল্যাকমেইলের শিকার মার্কিন নীতি: নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ও মোসাদের সংগৃহীত ফাইলের কারণেই ট্রাম্প আমেরিকার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ইসরাইলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।
- ৩. ইয়েমেন-সৌদি প্রক্সি যুদ্ধ পুনরুজ্জীবন: হুতি নেতাদের ফ্লাইটে বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে, সৌদি আরব নিজের ইচ্ছায় নয় বরং মার্কিন ইশারায় পুনরায় যুদ্ধে জড়িয়েছে।
- ৪. হুতিদের অপ্রতিরোধ্য সামরিক সক্ষমতা: মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি আরবের গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হুতিদের আধুনিক যুদ্ধপ্রস্তুতি ও সাহসিকতার প্রমাণ দেয়।
- ৫. বাব-আল-মান্দাবের কৌশলগত গুরুত্ব: হুতিদের লোহিত সাগর অবরুদ্ধ করার হুমকি বিশ্ব বাণিজ্যে পশ্চিমাদের জন্য এক চরম ব্ল্যাকমেইল অস্ত্র।
- ৬. ইরানি সার্বভৌমত্ব বনাম মার্কিন দস্যুতা: হরমুজ প্রণালী ইরানের নিজস্ব জলসীমা হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০% টোল আদায়ের দাবি এক চরম জলদস্যুতা।
- ৭. মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তা ঝুঁকি: কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে হামলা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মার্কিন ঘাঁটি আর নিরাপদ নয়।
- ৮. আইআরজিসির ক্ষুরধার কৌশল: আইআরজিসি নেভিগেশন বন্ধ করা জাহাজগুলোকে মাইনফিল্ডে ঢুকিয়ে দিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে পশ্চিমা জাহাজগুলোকে অচল করছে।
- ৯. ন্যাটোর বিপজ্জনক ভূমিকা: আঙ্কারা সম্মেলনের পরই ট্রাম্পের এই আগ্রাসী রূপ প্রমাণ করে ন্যাটোর হাত এই ধ্বংসাত্মক খেলায় সরাসরি জড়িত।
- ১০. আরব রাজতন্ত্রের পতনোন্মুখ দশা: নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমাদের হাতে নিজেদের পেট্রো-ডলার তুলে দিয়ে আরবরা নিজেদের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনছে।
- ১১. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার ঝুঁকি: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে তেলের দামের অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দেবে।
- ১২. শিয়া-সুন্নি কৃত্রিম বিভাজন: পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শিয়া-সুন্নি কৃত্রিম দেয়াল তৈরি করে তাদের সম্পদ অনায়াসে লুটপাট করছে।
- ১৩. চীনের নীরব নীরবতা ও কৌশল: ইরান আক্রান্ত হলে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিরা চুপ থাকবে না, যা একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি যুদ্ধের পথ তৈরি করছে।
- ১৪. মার্কিন অবরোধের অকার্যকারিতা: দীর্ঘ চার দশক ধরে অবরোধের মধ্যে থাকা ইরান প্রমাণ করেছে যে, নতুন অবরোধ দিয়ে তাদের সামরিক মনোবল ভাঙা সম্ভব নয়।
- ১৫. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: যেভাবে ওসমানীয় ও আব্বাসীয় খেলাফত মুসলিমদের নিজেদের ভেতরের বেঈমানদের কারণে ধ্বংস হয়েছিল, আজ আরব শাসকরা ঠিক একই পথে হাঁটছে।