মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের নজিরবিহীন হামলা: সিরিয়া ও আরব আমিরাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, এদিকে ভারতের সফর বাতিল করলেন তারেক রহমান
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সিরিয়া রণক্ষেত্র; গঙ্গা চুক্তি ও অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনে ভারতের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলেন তারেক রহমান
ঢাকা ও তেহরান: বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এক নতুন যুদ্ধ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একের পর এক মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালাচ্ছে ইরান। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও বড় ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তাঁর পূর্বনির্ধারিত অত্যন্ত আলোচিত ভারত সফর বাতিল করে দিয়েছেন। নয়া দিল্লির পক্ষ থেকে ক্রমাগত বৈরি আচরণ, গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার কারণে বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই কঠোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং ঢাকা-নয়া দিল্লি সম্পর্কের এই নতুন টানাপড়েনের অন্তরালের গল্প বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. মধ্যপ্রাচ্যে ষষ্ঠ রাতের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বিমান হামলা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং ভূ-রাজনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে এক বিশাল এবং ভয়াবহ বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে যে, এই হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং আক্রমণাত্মক নেটওয়ার্ককে দুর্বল করে দেওয়া। তবে এবারের মার্কিন হামলার ধরন ভিন্ন ছিল এবং এটি ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর চেয়ে বেশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে জড়িত অবকাঠামোগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমেরিকার এই বোমাবর্ষণে ইরানের বেশ কয়েকটি প্রধান শহর কেঁপে ওঠে এবং পুরো অঞ্চলে যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
২. ইরানের বেসামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রেল স্টেশন লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ
ইরানের দক্ষিণ অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর শহর 'বন্দর আব্বাস' এর স্থানীয় প্রশাসন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো মূলত বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন মিসাইল সরাসরি আঘাত হেনেছে একটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে, যার ফলে বন্দর আব্বাস এবং তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদ সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি একটি বড় রেলওয়ে স্টেশন এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ভারী বোমাবর্ষণ করা হয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বেসামরিক এই হামলায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
৩. মার্কিন হামলায় ইরানে ৮ জনের শাহাদাত ও ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুসারে, গত রাতের এই বর্বরোচিত মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ৮ জন বেসামরিক ইরানি নাগরিক শহীদ হয়েছেন এবং ২০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার কারণে জরুরি পরিষেবাগুলো ব্যাহত হচ্ছে, তবে প্রকৌশলীরা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আংশিক পুনরুদ্ধার করার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করে যাচ্ছেন।
৪. কৌশলগত ৬টি সেতু উড়িয়ে দিয়ে ইরানের সামরিক সাপ্লাই লাইন কাটার চেষ্টা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এই নিখুঁত ও পরিকল্পিত হামলার একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের দক্ষিণ অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। ইরানি গণমাধ্যমগুলো সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছে যে, মার্কিন মিসাইল হামলায় ইরান জুড়ে অন্তত ছয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সেতু সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে বন্দর আব্বাস, খেমির এবং লার শহরকে সংযুক্তকারী প্রধান অর্থনৈতিক মহাসড়কের উপর অবস্থিত সেতুটি রয়েছে। এছাড়াও লাতিদান গ্রামের কাছের একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং কাউরেস্তান-লার রুটের দুটি প্রধান সেতু ধ্বংস করা হয়েছে। এই রুটগুলো মূলত ইরানি সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্র ও লজিস্টিকস আদান-প্রদানের জন্য জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ছিল।
৫. সুইজারল্যান্ডে শান্তি বৈঠকের পর মার্কিন হামলায় ৩৮ ইরানির মৃত্যু: শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন
বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে যে, গত ২২শে জুন সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি দীর্ঘ ৬০ দিনের শান্তি আলোচনার পর্যায় শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে আমেরিকা একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির একটি বিশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৮ জন ইরানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইরান সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, আমেরিকা বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দিতে শান্তির নাটক করছে, অথচ বাস্তবে তারা ইরানের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে শান্তি চুক্তি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেছে।
৬. সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত
আমেরিকার এই ক্রমাগত আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরান এবার এক নজিরবিহীন ও অবিশ্বাস্য কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এতদিন ধরে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান কখনো সিরিয়ার অভ্যন্তরে সরাসরি মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায়নি। কিন্তু গত রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) সিরিয়ায় অবস্থানরত একটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক মিসাইল ও কামিকাজে ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে সিরিয়াতে তাদের কোনো যুদ্ধরত সেনা নেই, কিন্তু ইরানের ইন্টেলিজেন্স তথ্যে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গালফ অঞ্চলে আমেরিকান অপারেশনের মূল মাস্টারমাইন্ড এবং সামরিক কর্তারা সিরিয়ার এই গোপন ঘাঁটিতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই হামলায় মার্কিন ঘাঁটিটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৭. সিরিয়ার ঘাঁটিতে বহু মার্কিন সেনার মৃত্যুর দাবি: গালফ অঞ্চলের বৃহত্তম বিপর্যয়
সিরিয়ার ঘাঁটিতে চালানো ইরানের এই ম্যাসিভ কাউন্টার-অ্যাটাকের পর ইরানের সামরিক মুখপাত্র এবং স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে, সেখানে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ জানিয়েছে, আমেরিকার বিমান হামলাগুলো যারা মনিটর এবং পরিচালনা করছিল, সেই অপারেশনাল প্রধানদের একটি বড় অংশ এই নিখুঁত ইরানি হামলায় সরাসরি 'ওপারে চলে গেছে'। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ইরানি দাবি পুরোপুরি সত্য হয়, তবে এটি হবে চলতি বছরে গালফ এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ মানবিক ও কৌশলগত বিপর্যয়। এই ঘটনার পর ওয়াশিংটনে পেন্টাগনের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
৮. আরব আমিরাত ও কুয়েতে মার্কিন ড্রোন ও মিসাইল স্টোরেজ ধ্বংস করল ইরান
ইরানের পাল্টা আঘাত কেবল সিরিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আইআরজিসি তাদের 'অপারেশন নাসর-২' এর ২৯তম ধাপে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পারস্য উপসাগরীয় দেশ আরব আমিরাত (UAE) এবং কুয়েতের অভ্যন্তরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে একসাথে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটির একটি বিশাল ড্রোন এবং মিসাইল স্টোরেজ বা অস্ত্রের গুদাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে, কুয়েত এবং আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে আগুনের বিশাল লেলিহান শিখা আকাশে উড়ছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে যে, তারা গত রাতে আকাশসীমা রক্ষায় একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে।
৯. বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরে হামলা এবং কাতার ঘাঁটির স্যাটেলাইট ইমেজে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র
ইরানের সামরিক বাহিনী বাহরাইনের একটি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পঞ্চম নৌবহরের (Fifth Fleet) বিমান ও নৌ লজিস্টিক সেন্টারে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। অন্যদিকে, কাতারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটি 'আল উদাইদ' (Al Udeid Air Base) এর ওপর চালানো ইরানি ড্রোন হামলার কিছু অতি সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ইমেজ বা উপগ্রহ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। সেই স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানের প্রধান হ্যাঙ্গার, মেইন্টেন্যান্স সেন্টার এবং রাডার কন্ট্রোল স্টেশনগুলো ইরানের নিখুঁত কামিকাজে ড্রোনের আঘাতে পুরোপুরি তামাতামা বা ধ্বংস হয়ে গেছে। আমেরিকা এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমের কার্যকারিতা নিয়েই চরম সন্দিহান।
১০. সৌদি আরব ও বাহরাইনের একমাত্র সংযোগকারী মহাসড়ক সেতু উড়িয়ে দিল ইরান
ইরানের পক্ষ থেকে গতকাল ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, যদি তাদের দেশের বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত করা হয়, তবে তারাও সমপরিমাণ এবং একই ধরনের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত করবে। সেই ঘোষণা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ইরান গত রাতে সৌদি আরব এবং বাহরাইনের মধ্যে একমাত্র স্থল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত বিশাল সমুদ্র সেতু বা সংযোগকারী মহাসড়কটি মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। এই হামলার ফলে সৌদি আরব ও বাহরাইনের মধ্যে সমস্ত স্থল যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সাপ্লাই লাইন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই ঘটনা পুরো আরব বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং আরব নেতারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
১১. হরমোজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা ইরানের: বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম স্থবিরতার আশঙ্কা
যুদ্ধ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ মুখপাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কৌশলগত 'হরমোজ প্রণালী' (Strait of Hormuz) অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলো। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং পূর্ণ অধিকার স্বীকার করে সেখান থেকে তাদের নৌবাহিনী প্রত্যাহার না করবে, ততক্ষণ এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারের কোনো তেলবাহী বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। আমেরিকার মদদপুষ্ট কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল্প রুট দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ইরানের সিরিজ হামলার ভয়ে সেগুলো এখন সাগরে অলস দাঁড়িয়ে আছে। এই অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১২. ভারতের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক 'না' এবং সফর বাতিল
আন্তর্জাতিক এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল বোমাবিলোপ ঘটেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিল্লি সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দিয়েছেন এবং ভারতকে সরাসরি 'না' বলে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হয়েছিল যে, তারেক রহমান চীনের সফল সফর শেষ করার পর হয়তো ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত সফরে যাবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপস না করার নীতি থেকেই তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আপাতত তিনি কোনো অবস্থাতেই ভারতে যাচ্ছেন না।
১৩. গঙ্গা চুক্তি পুনর্নবীকরণ নিয়ে নয়া দিল্লির টালবাহানা ও বাংলাদেশের কড়া অবস্থান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ভারত সফর বাতিলের অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত যৌক্তিক কারণ হলো আগামী বছর শেষ হতে যাওয়া ঐতিহাসিক 'গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি'। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে বারবার কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে স্পষ্ট জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, এই চুক্তি শেষ হওয়ার পর পূর্বের শর্তানুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করা হবে কি না। কিন্তু নয়া দিল্লি এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জীবন-মরণ ইস্যুটিকে সম্পূর্ণ ঝুলিয়ে রেখেছে এবং ঢাকাকে কোনো ইতিবাচক বা স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট মনে করেন, দেশের নদী ও কৃষকদের পানির অধিকার নিশ্চিত না করে ভারতের সাথে কোনো লোকদেখানো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বা সফর হতে পারে না।
১৪. সীমান্তে পুশিং ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঢাকার প্রতিরোধ
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন আমল থেকেই ভারত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছে না এবং ক্রমাগত বৈরি আচরণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) কর্তৃক সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি করা, জোরপূর্বক পুশিং করার চেষ্টা এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটছে। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের আদালতে একাধিক হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক অপরাধী সাবেক স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনাকে ভারত তাদের দেশে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ সরকার বারবার হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরের অনুরোধ করলেও ভারত তা তো করছেই না, বরং সরাসরি ভারত সরকারের আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের এই দ্বিমুখী ও অনৈতিক আচরণকে প্রশ্রয় না দিতেই তারেক রহমান এই কড়া কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
১৫. বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন মোড়: সৌদি আরব ও জাপান সফরের প্রস্তুতি
ভারতকে সফলভাবে এড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশ এখন তার পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন এবং স্বাধীনভাবে সাজাচ্ছে। চীনের সাথে সফল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি এশিয়ান পরাশক্তি দেশ সফর করতে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগেই, সম্ভবত আগস্ট মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি আরব এবং জাপান সফরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রেমিট্যান্স ফাইন্যান্সিং এবং ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষায় সৌদি আরব ও জাপানকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদার মনে করছে ঢাকা। এই নতুন কূটনৈতিক চাল নয়া দিল্লিকে এক চরম আন্তর্জাতিক একাকীত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. মার্কিন নীতির পরাজয়: সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনার ভান করে ইরানের ওপর হামলা চালানো আমেরিকার চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একাধিপত্য ধরে রাখার শেষ মরিয়া চেষ্টা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
- ২. কৌশলগত ফাঁদে আমেরিকা: সিরিয়ার গোপন ঘাঁটিতে ইরানের নজিরবিহীন মিসাইল হামলা প্রমাণ করে যে, আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নিখুঁত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের চেয়েও ইরানের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।
- ৩. সাপ্লাই চেইন লজিস্টিকস ধ্বংস: ইরানের ৬টি প্রধান সড়ক সেতু উড়িয়ে দিয়ে আমেরিকা ভেবেছিল ইরানের সামরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে, কিন্তু ইরান তার আগেই আরব উপদ্বীপে মার্কিন রসদ সরবরাহের পথগুলো ড্রোন দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।
- ৪. হরমোজ প্রণালীর অবরুদ্ধকরণ: হরমোজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করার মাধ্যমে ইরান বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকে জিম্মি করে ফেলেছে, যা ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ব্যাকফুটে ঠেলে দেবে।
- ৫. আরব মিত্রদের চরম আতঙ্ক: সৌদি আরব এবং বাহরাইনের একমাত্র সংযোগকারী মহাসড়ক সেতুটি ধ্বংস হওয়ার পর কুয়েত, কাতার ও ওমান বুঝতে পেরেছে যে মার্কিন ঘাঁটিকে আশ্রয় দিলে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
- ৬. পঞ্চম নৌবহরের নিরাপত্তা ঝুঁকি: বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান লজিস্টিকস সেন্টারে ইরানের আঘাত প্রমাণ করে যে পারস্য উপসাগরে এখন আর কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজই নিরাপদ নয়।
- ৭. আল উদাইদ ঘাঁটির বিপর্যয়: কাতারের মার্কিন বিমান ঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও মেইন্টেন্যান্স সেন্টার ধ্বংস হওয়া পেন্টাগনের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষার এক বিশাল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা।
- ৮. সিরিয়া সংঘাতের নতুন মোড়: এতদিন সিরিয়াকে সেফ জোন মনে করলেও, সেখানে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
- ৯. বাংলাদেশের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি: তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিল করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর নয়া দিল্লির কোনো বাধ্যগত প্রতিবেশী নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থে যেকোনো পরাশক্তিকে 'না' বলার ক্ষমতা রাখে।
- ১০. গঙ্গা চুক্তির মোক্ষম জবাব: পানির ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাওয়া ভারতের পুরনো কূটনীতিকে এবার ঢাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করার সাহসী বার্তা দিয়েছে।
- ১১. হাসিনা কার্ডের অকার্যকারিতা: শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বসিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার ভারতীয় কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে; বিএনপি ও বর্তমান সরকার ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে হাসিনা এখন একটি রাজনৈতিক 'ডেড কেস'।
- ১২. সীমান্তে পুশিংয়ের পাল্টা চাপ: সীমান্তে বিএসএফের আগ্রাসনের জবাবে ভারতের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছে।
- ১৩. লুক ইস্ট পলিসির সাফল্য: চীনের পর জাপান এবং সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একক কোনো দেশের (যেমন ভারতের) ওপর নির্ভরশীলতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করার পথে হাঁটছেন।
- ১৪. সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ লক্ষ্যমাত্রা: সৌদি আরব ও জাপান সফর শেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে যখন তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন, তখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান থাকবে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও স্বাধীন।
- ১৫. নতুন বিশ্বব্যবস্থার উদয়: একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পতন এবং অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় হেজিমনি বা দাদাগিরির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই প্রতিরোধ স্পষ্ট করছে যে ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ বা বিশ্বব্যবস্থার উদয় হচ্ছে।