ইসরায়েল-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: শান্তির পথে মূল বাধা কোথায়?
ইসরায়েল-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: শান্তির পথে মূল বাধা কোথায়?
ভূমিকা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত, যুদ্ধবিরতি এবং পুনরায় আক্রমণের চক্র এই অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সামরিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল একটি দূরবর্তী স্বপ্ন মাত্র। এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কেন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইছে না, ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের শেষ সীমারেখা কোথায়, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের চাপ কীভাবে এই যুদ্ধকে প্রভাবিত করছে এবং ইরান কীভাবে নিজেকে যেকোনো সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রেখেছে। ক্রনিকল পয়েন্টের পাঠকদের জন্য এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের নেপথ্য কাহিনী বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১. মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির মূল অন্তরায়
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো ইসরায়েলের বর্তমান নীতি এবং তাদের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমাগত সামরিক অভিযানের প্রবণতা। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল যদি তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর আক্রমণ বন্ধ না করে, তবে এই অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস আশা করা অসম্ভব। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শান্তিতে বসবাস করার অধিকার প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রয়েছে, কিন্তু সেই সীমানা লঙ্ঘন করে যখন অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করা হয়, তখন তা স্থায়ী যুদ্ধের রূপ নেয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও ইসরায়েলের বর্তমান আগ্রাসী নীতি—এই দুটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।
২. যুদ্ধবিরতির ছদ্মবেশে অস্ত্রের পুনঃসরবরাহ
ইতিহাসে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা আসলে কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করেনি। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতিগুলো মূলত ইসরায়েল এবং তার প্রধান মিত্র আমেরিকার জন্য একটি কৌশলগত বিরতি বা 'ব্রেক'। এই সাময়িক বিরতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিজেদের ক্ষয়ে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার আবার নতুন করে পূরণ করা বা রিসাপ্লাই নিশ্চিত করা। পূর্বে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি বা ব্রেকের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ বাড়িয়ে নিয়েছে এবং সুযোগ বুঝে আবার নতুন করে বিধ্বংসী সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্লান্তি
ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করা আমেরিকার পক্ষে আর খুব বেশিদিন চালানো সম্ভব নাও হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে যে ধরনের অত্যাধুনিক এবং শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, সেগুলির উৎপাদন এবং ব্যবহারের ব্যয় অত্যাধিক। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এই ধরনের ব্যয়বহুল প্রযুক্তির নিয়মিত ব্যবহার মার্কিন অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। আমেরিকানরা যখন এই ধরনের এক্সপেন্সিভ ওয়েপন বা অস্ত্র ব্যবহার করে, তখন যুদ্ধের সামগ্রিক খরচ সাধারণ হিসাবের বাইরে চলে যায়। এই ব্যয়বহুল যুদ্ধ কৌশলের কারণে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে একটি সামরিক ক্লান্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
৪. ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা
আমেরিকা ও ইসরায়েলের তুলনায় ইরান বর্তমান সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক ধরনের কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে (Advantage) রয়েছে। ইরানের সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা অনেকটাই দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান নিজেদের অভ্যন্তরীণ সামরিক সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তুলেছে যা তাদের কম খরচে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। এই অর্থনৈতিক সাশ্রয়ী সামরিক ব্যবস্থার কারণে ইরান এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
৫. আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমতের নাটকীয় পরিবর্তন
বর্তমান সময়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে এক অভূতপূর্ব জনমতের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকার জনগণের মাত্র ৭ শতাংশ এখন সেখানে কোনো ধরনের স্থলযুদ্ধ বা গ্রাউন্ড অ্যাটাক সমর্থন করে। অর্থাৎ, অতীতে যেভাবে মার্কিন সৈন্যরা ইরাকে বা আফগানিস্তানে নেমে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে বা মধ্যপ্রাচ্যে তেমন কোনো সামরিক অভিযানে মার্কিন সাধারণ মানুষের কোনো সমর্থন নেই। উল্টো, সেদেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকার এই যুদ্ধংদেহী নীতিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
৬. মার্কিন ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন
আমেরিকার সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ইসরায়েলকে ঢালাওভাবে অর্থ সাহায্য দেওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলকে আর অন্ধভাবে সমর্থন করতে রাজি নয়। মার্কিন ট্যাক্সপেয়ার বা করদাতারা মনে করছেন, তাদের কষ্টার্জিত রক্ত-ঘামের পয়সা দিয়ে ইসরায়েলের যুদ্ধবিগ্রহকে টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এখন বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে এবং প্রকাশ্য প্রতিবাদের মাধ্যমে পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে, তারা তাদের ট্যাক্সের টাকা নিজেদের দেশের কল্যাণমূলক কাজে না লাগিয়ে ইসরায়েলের পেছনে ব্যয় করা বন্ধ দেখতে চায়।
৭. ইসরায়েলের কাঁচামাল ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক নির্ভরতা
যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রায়শই জোর গলায় দাবি করেন যে, ইসরায়েল এখন তাদের যুদ্ধের ব্যয় নিজেরাই চালাতে সক্ষম এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি তারা নিজেরাই তৈরি করতে পারে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ইসরায়েলের অস্ত্র তৈরির প্ল্যান্ট বা কারখানাগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান কাঁচামাল, অত্যাধুনিক টেকনোলজি, গান সিস্টেম এবং ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটলে ইসরায়েলের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
৮. ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর অবস্থান ও জার্মানির ভেটো
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে এক বিশাল কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রায় ২৬টি দেশ ইসরায়েলের সাথে সকল ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য একটি যৌথ রেজল্যুশন বা প্রস্তাব এনেছিল। ইউরোপের সিংহভাগ দেশই ইসরায়েলের লাগামহীন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে। তবে শুধুমাত্র জার্মানির বিরোধিতার কারণে এই সর্বসম্মত রেজল্যুশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হতে পারেনি। তা সত্ত্বেও ইউরোপের বেশ কিছু দেশ এককভাবে বা ইউনিলেটারিলি ইসরায়েলের সাথে সমস্ত রকমের অস্ত্র ব্যবসা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
৯. হিজবুল্লাহর উত্থান ও লেবাননের বাস্তবতা
লেবাননে চলমান সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। যখন ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণের মুখে দক্ষিণ লেবানন সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল, তখন লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। এই চরম নিরাপত্তা সংকটের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় হিজবুল্লাহ। বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ কোনো আকাশ থেকে পড়া সংগঠন নয়, বরং এটি 'বর্ন আউট অব সাউথ লেবানিস পিপল'—অর্থাৎ দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ মানুষের নিজেদের সুরক্ষার তাগিদে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন। সাধারণ মানুষ হিজবুল্লাহকে তাদের একমাত্র রক্ষাকর্তা মনে করে বলেই লেবাননে তাদের ভিত্তি এত মজবুত।
১০. আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও সিকিউরিটি জোনের অজুহাত
বিশ্ব দরবারে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি আজ চরম সংকটের মুখে, কারণ তারা আন্তর্জাতিক কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করছে না। যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরে জোরপূর্বক ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে সেখানকার বসতি ও মাটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং পরবর্তীতে সেটাকে নিজেদের 'সিকিউরিটি জোন' বা নিরাপত্তা বলয় হিসেবে দাবি করা ইসরায়েলের একটি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি যুদ্ধাপরাধের (War Crimes) শামিল। পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থাই বর্তমানে ইসরায়েলকে এই ধ্বংসাত্মক নীতি থেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না।
১১. মার্কিন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের সমর্থন হ্রাস
আমেরিকার শিকাগো শহরের প্রাক্তন মেয়র জর্জ ইমানুয়েল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় শক্তি—আমেরিকার তরুণ প্রজন্মের সমর্থন—সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে ৫০ বছরের নিচে থাকা সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের সিংহভাগই ইসরায়েলের ঘোর বিরোধী। এই তরুণ প্রজন্ম জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে যে, প্রতি বছর আমেরিকার বাজেট থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার ইসরায়েলকে সরাসরি সামরিক অনুদান দেওয়া হয় এবং বছরের শেষে বিশেষ বরাদ্দের নামে আরও ২২ থেকে ২৩ বিলিয়ন ডলার পাঠানো হয়। অথচ আমেরিকার নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক কল্যাণমূলক খাতগুলো ফান্ডের অভাবে ভুগছে।
১২. কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ইসরায়েল দিন দিন একাকী হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'সোমালি ল্যান্ড' নামক বিতর্কিত অঞ্চল ছাড়া নতুন কোনো বন্ধু বা স্বীকৃতি পায় নাই। এমনকি তথাকথিত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস' বা শান্তি চুক্তির পর যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, তারাও এই বর্বর যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় তেল আবিব থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত (Ambassador) প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে মরক্কো বা বাহরাইনের মতো কিছু দেশ তাদের পুরনো ইহুদি ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে এখনও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখলেও, মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষের চাপ তাদের ওপরও ক্রমাগত বাড়ছে।
১৩. পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পারস্য উপসাগরীয় (Gulf) আরব দেশগুলো কোনোভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযানে অংশ নিতে রাজি নয়। জর্ডান, বাহরাইন বা কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলেও, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এমনকি কিছু আরব দেশ ইরানের কাছ থেকে এই মর্মে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা (Assurance) নিচ্ছে যে, তারা আমেরিকার কোনো আগ্রাসনে তাদের ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না। ইরানের পক্ষ থেকেও পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো আরব দেশের মাটি ব্যবহার করে যদি ইরানের ওপর হামলা হয়, তবে সেই আরব দেশও ইরানের পাল্টা আক্রমণের শিকার হবে।
১৪. ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা ও পার্বত্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
সামরিক দিক থেকে ইরানকে পরাস্ত করা কেন প্রায় অসম্ভব, তার মূল কারণ লুকিয়ে আছে দেশটির অনন্য ভূগোল ও পার্বত্য গঠনে। ঐতিহাসিকভাবে, প্রাচীন 'ইলম' সভ্যতার সময় থেকেই ইরানের বিশাল ও দুর্ভেদ্য মাউন্টেন সিস্টেম বা পর্বতমালা দেশটিকে যেকোনো বিদেশী আক্রমণ থেকে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে রক্ষা করে আসছে। ইরাক বা অন্যান্য সমতল ভূমির দেশের মতো ইরান নয়। ইরানের এই প্রাকৃতিক ঘাতসহ ক্ষমতা (Resilience) এবং জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত সুদৃঢ়। স্থলযুদ্ধে ইরানকে পরাজিত করার চিন্তা আধুনিক সামরিক জেনারেলদের কাছে একটি অলীক স্বপ্ন বা অবাস্তব কল্পনা মাত্র।
১৫. ট্যাক্টিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন ও উইন্ড ডিরেকশনের ঝুঁকি
আমেরিকার সামরিক নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য 'ট্যাক্টিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন' বা সীমিত মাত্রার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছেন। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির গভীরে তৈরি করায় এই ধরনের হামলায় অনেক বেশি সুরক্ষিত। উল্টো, পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তার যে বায়ুপ্রবাহ বা 'ডিরেকশন অব উইন্ড' (Wind Direction), তা পার্শ্ববর্তী কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দূষিত করবে, যা আমেরিকার নিজের জন্যই এক মহা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
Chronicle Point Analysis:
- ১. স্থায়ী শান্তির শর্ত: ইসরায়েলকে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে তাদের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
- ২. যুদ্ধবিরতির অন্তরালে কৌশল: পশ্চিমা শক্তির যুদ্ধবিরতির আহ্বান মূলত কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনের একটি সময়োপযোগী কৌশল।
- ৩. মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: আমেরিকার অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায়, দীর্ঘমেয়াদী কোনো যুদ্ধে জড়ানো মার্কিন অর্থনীতি ও সামরিক বাজেটের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।
- ৪. ইরানের ভূ-রাজনৈতিক শক্তি: দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সহনশীলতা ইরানকে এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুরক্ষিত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
- ৫. মার্কিন জনমতের চাপ: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন যুদ্ধবিরোধী জনমত প্রবল, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যেকোনো বড় সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
- ৬. মার্কিন করদাতাদের অসন্তোষ: আমেরিকার নাগরিকরা এখন নিজেদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের চেয়ে ইসরায়েলের সামরিক খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অনুদান দেওয়াকে চরম অন্যায় বলে মনে করছেন।
- ৭. ইসরায়েলের উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা: ইসরায়েল স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করলেও তাদের সামরিক কাঁচামাল ও প্রযুক্তির জন্য ইউরোপীয় সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়।
- ৮. ইউরোপীয় কূটনৈতিক ফাটল: ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশ ইসরায়েলের ওপর সামরিক নিষেধাজ্ঞা চায়, কিন্তু জার্মানির মতো একক দেশের ভেটোর কারণে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে না।
- ৯. হিজবুল্লাহর সামাজিক বৈধতা: হিজবুল্লাহ কোনো কৃত্রিম মিলিশিয়া নয়, বরং দক্ষিণ লেবাননের জনগণের আত্মরক্ষার তাগিদ থেকে জন্ম নেওয়া একটি হোম-গ্রোন সামাজিক ও সামরিক শক্তি।
- ১০. আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন: ইসরায়েল যেভাবে অন্য দেশের ভেতরে ঢুকে 'সিকিউরিটি জোন' তৈরি করছে, তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
- ১১. মার্কিন প্রজন্মের পরিবর্তন: আমেরিকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েল-পন্থী রাজনীতির আবেদন ফুরিয়ে আসছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কে ফাটল ধরাবে।
- ১২. আরব বিশ্বের কূটনৈতিক কৌশল: সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার প্রমাণ করে যে, আরব শাসকরাও এখন নিজেদের জনগণের ক্ষোভের মুখে ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
- ১৩. উপসাগরীয় অঞ্চলের নতুন নিরাপত্তা বলয়: পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো আমেরিকার যুদ্ধের অংশীদার হওয়ার চেয়ে ইরানের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেওয়াকে বেশি লাভজনক মনে করছে।
- ১৪. ইরানের প্রাকৃতিক পার্বত্য ঢাল: ইরানের দুর্ভেদ্য পার্বত্য ভূগোল যেকোনো বহিঃশত্রুর জন্য স্থলপথে আক্রমণ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এক প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধ দেয়াল।
- ১৫. পারমাণবিক বিপর্যয়ের বৈশ্বিক ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যেকোনো ধরনের ট্যাক্টিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা হুমকি পুরো গালফ অঞ্চলের পরিবেশ ও মিত্র রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে।